সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যে সোনার পাথরবাটি, তা সর্বত্র প্রমাণিত
সিপিএম এখনও কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়া নিয়ে দোলাচলে রয়েছে। কারণ, তাঁরা কমিউনিস্ট বিশুদ্ধতার পথে থাকবেন, না রাজনীতির সাদামাটা বাস্তবতা মেনে চলবেন, তা নিয়ে নেতারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। স্পষ্টতই, প্রকাশ কারাটের কাছে কমিউনিস্ট বিশুদ্ধতার প্রশ্নটা বড়। তাই ‘বৃহৎ বুর্জোয়া’ দল কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি নন তিনি, যদিও বিজেপিকে প্রধান বিপদ বলে মেনে নিতে তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে আসন–সমঝোতা বা জোটে তাঁর ঘোর আপত্তি। কারণ, তাহলে কমিউনিস্ট পার্টি আর কমিউনিস্ট পার্টি থাকবে না বলেই তাঁর বিশ্বাস। আর সীতারাম ইয়েচুরি কমিউনিস্ট পার্টির সাইনবোর্ডের পেছনে বসে আর পাঁচটা বুর্জোয়া দলের মত করে দল চালাতে চান। কারণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, ওটাই বাঁচার একমাত্র পথ। এই নিয়েই দ্বন্দ্ব।
ঘটনা হল, পৃথিবীর কোথাও কমিউনিস্ট পার্টি আর কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে বাঁচতে পারছে না। কারণ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যে সোনার পাথরবাটি, তা সর্বত্র প্রমাণিত। চীন নামক সমাজতান্ত্রিক দেশটি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরোপুরি পুঁজিবাদী। বলা যেতে পারে, অর্থনৈতিকভাবে তারা কল্যাণমূলক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। রাজনৈতিক দিক থেকে অবশ্য নাগরিকেরা সব অধিকার থেকেই বঞ্চিত। যাই হোক, ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে, কমিউনিস্ট বিশুদ্ধতার বিষয়টার অস্তিত্ব নেই। প্রকাশ কারাট সিপিএমে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নেতা হিসাবে আধিপত্য বজায় রেখে চলেছেন দু দশকেরও বেশি সময় ধরে। তাঁর মূল শক্তি কেরালা, যেখানে সদস্যসংখ্যা এবং জাতীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতিনিধি সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেখানে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় এলে যে নীতি নিয়ে চলে বামেরা তার থেকে খুব কিছু আলাদা পথে চলে না। কারাট গোষ্ঠীর যুক্তির মোদ্দাকথা হল, এদেশের কাঠামোয় আলাদা পথে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য, অর্থাৎ যেদিন কমিউনিস্টরা এদেশে ক্ষমতায় আসবেন(!), সেই দিনের জন্য বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হবে।
আরও পড়ুন
রাজনীতির অঙ্গনে ঈশ্বরের কোনও ভূমিকা নেই
সীতারাম গোষ্ঠী এমন আজগুবি দিনের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি নন। তাঁরা চাইছেন, বর্তমান সময়ে দলের অস্তিত্ব বজায় রাখতে। বাংলা গেছে। এই রাজ্যে ভবিষ্যতে লড়াই চলবে তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে। কেরলে দল একবার ক্ষমতা হারায়, একবার জেতে। অতীতে ত্রিপুরায় একবার হেরেও ফিরে আসতে পেরেছিল বাম শক্তি। আগামী দিনে ত্রিপুরার লড়াই মূলত বিজেপির সঙ্গে বামেদেরই হবে। সীতারাম গোষ্ঠী মনে করছে, এই অবস্থায় কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলালে দল শক্তিশালী হবে। কিন্তু নিজেদের আশু প্রয়োজনটার ওপরে একটা আদর্শগত প্রলেপ দিতে না–পারলে মানুষের মন ভোলানো যায় না। সীতারাম গোষ্ঠী তাই ঢাল করেছে, বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নটাকে। কিন্তু এই যে কংগ্রেসের হাত ধরলেই সমস্যার সমাধান হবে, এই অঙ্কটাতে একটা বড় গলদ আছে। কেরলে বাম–কংগ্রেস ঐক্য সম্ভব নয়। তারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলায় বিজেপির সঙ্গে লড়াই জোরদার হয়ে উঠলে বাম–কংগ্রেসের কর্তব্য হবে তৃণমূলের সঙ্গী হওয়া। কারণ, তার বাইরে কিছু করা আপাতত বামেদের পক্ষে অসম্ভব। আর ত্রিপুরাতেও ভবিষ্যতে কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেস যাতে বিজেপি–বিরোধী ভোট ভাগ না–করে, তার জন্যও উদ্যোগী হওয়া দরকার এখন থেকেই।
অর্থাৎ শুধু কংগ্রেস নয়, বাস্তববাদী হতে হলে তৃণমূল কংগ্রেস সহ সব বিজেপি–বিরোধী শক্তির সঙ্গেই হাত মেলাতে হবে বামেদের। কিন্তু পার্টি কংগ্রেসে এমন প্রস্তাব দেওয়া সীতারামের সাহসে কুলোবে না। ফলে সিপিএম শুধু ধ্বংসের পথেই এগোবে।