মাঝি বাঁশের লগি টেনে ছোট কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা নিয়ে চলল হ্রদের বুকে
চুপির চর। নামের সঙ্গে একটা যেন লুকোচুরির সম্পর্ক আছে। প্রতিবছর শীতকালে হাজার হাজার পাখি দূর-দূরান্ত থেকে আসে এই নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে।
কলকাতা থেকে ১২১ কিমি দূরত্বে অবস্থিত পূর্বস্থলী। মূল ভাগীরথী থেকে বিচ্ছিন্ন পূর্বস্থলীয় চুপির চর ছাড়ি গঙ্গা নামেও পরিচিত। গঙ্গা প্রবাহপথ পরিবর্তনের ফলে তৈরি হয়েছিল এই হ্রদ। এর আকৃতি অনেকটা অশ্বক্ষুরের মত। গঙ্গার মূল স্রোতের সঙ্গে এটি যুক্ত। নৌকার মাধ্যমেই প্রবেশ করতে হয় হ্রদে। এক কথায়, পাখিদের স্বর্গরাজ্য।
একসময় চুপি সম্পূর্ণ ভাবে ছিল চোরা পাখিশিকারীদের হাতে। আর তখন বন্দুকবাজরা শিকার করত নিরীহ পাখিদের মনের আনন্দে। এখন ক্যামেরা ও বাইনাকুলার নিয়ে যাই আমরা পাখি দেখতে। স্থানীয় অধিবাসী ও প্রশাসনের নজরদারিতে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। যদিও পরিবেশ ও পাখিদের জন্য জোরে মাইকের বাজানো নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবুও চলে বনভোজনের উৎসব।
পূর্বস্থলী চুপির অন্য নাম। অশ্বক্ষুর আকৃতির এই হ্রদ যা লম্বায় প্রায় দশ কিলোমিটার। গভীরতা খুব বেশি নয়। এই অগভীর জলাশয় বিচিত্র জলজ উদ্ভিদে ভরা যা মাছের বংশবিস্তারের পক্ষে সহায়ক। শ্যাওলা জলে রয়েছে কাঁকড়া, সাপ, নানা রকমের জলক পোকামাকড়। যার টানেই পাখিদের সমাবেশ ঘটে।
শীত পড়তেই এখানে সুদূর হিমালয়, ইউরোপ, মঙ্গোলিয়া থেকে পরিযায়ী পাখি হাজির হয়। এই সময় পাখি প্রেমিক ছাড়াও অনেক মানুষ আসে চুপির চরে বেড়াতে।
আমিও সেই দলেই গা ভাসালাম এক শীতের সকালে চুপির চরের উদ্দেশ্যে। সকাল ৬.৩০ মিনিটের হাওড়া থেকে ট্রেনে প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার মধ্যেই আমরা পৌঁছোলাম পূর্বস্থলী। স্টেশনে নেমে টোটো চেপে পৌঁছোলাম সরকারি রিসোর্ট ‘পরিযায়ী নিবাস’-এ। আমরা সেই রাতটা এখানেই কাটাব। এখান থেকে দশমিনিট দূরত্বেই জলাশয়। সময় নষ্ট না করে ক্যামেরা নিয়ে হাজির হলাম হ্রদের পাশে। এখানে পাখিদের দেখতে হয় ছোট নৌকায় জলে বুকে ভেসে। কাষ্ঠশালী ঘাট ছাড়াও আরও কয়েকটি ঘাট দিয়ে হ্রদে প্রবেশ করা যায়। মাঝিরাই গাইড। মাঝি ও পাখিদের যেন নিবিড় বন্ধুত্ব অনেকদিনের। তেমন এরা সব পাখিদের খবরও রাখে। মাঝি বাঁশের লগি টেনে ছোট কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা নিয়ে চলল হ্রদের বুকে। আমাদের নৌকার সামনে এগিয়ে চলেছে কয়েকটা বার্ন সোয়ালো (Barn swallow)। যাকে বাংলায় বলে আবাবিল। খানিকটা পথ নির্দেশ দেওয়ার মত। লম্বা বাঁশ দিয়ে জল কাটানোর সময় অনেকবারই আটকে যাচ্ছিল জলজ উদ্ভিদে।
হ্রদটির মাঝে মাঝে ঘাস ও কাদার ছোট ছোট দ্বীপের মত রয়েছে। তার মধ্যে উঁকি মেরে দাঁড়াতে দেখলাম গ্রে-হেডেড সোয়ামপেন (Grey-headed swamphen), গ্রে-হিরন (Grey heron), মোরহেন (Moorhen), পার্পেল হিরন (purple heron) এবং ব্রোঞ্জ উইংস জাকানা (Bronze-wings jacana)। আর একটু এগোতেই খানিকটা বড় জলাশয়ে এসে পৌঁছোলাম। দেখতে পেলাম ঝাঁকে ঝাঁকে রাঙামুড়ি(Red-crested pochard)। সংখ্যায় প্রায় কয়েক’শ হবে। এরা দল বেঁধে জলে সাঁতার কাটছে। যারা কিনা পূর্বস্থলীর মূল আকর্ষণ। একটু কাছে পৌঁছে দেখলাম এদের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে কমনকুট(common coot), কটন পিগমি গুজ(Cotton pygmy goose), গার্ডওয়াল (Gadwall), লেজার হুইসলিং ডাক(Lesser whistling duck) ও কিছু টাফটেল ডাক(Tuftail duck)। বিস্তৃত চুপির চরে এরা আনন্দে উপভোগ করছে শান্ত পরিবেশে। এখানেই আমরা দেখা পেয়েছি চার প্রজাতির কিংফিশার। এদের মধ্যে পাইড(Pied kingfisher) ও কমন কিংফিশার আমার খুব প্রিয়। সচরাচর এদের দেখা মেলে না। একে একে ক্যামেরায় ফ্রেম বন্দি করতে থাকলাম প্রতিটা মুহূর্তকে। আবার মাঝে মাঝে গুনগুন করে গেয়ে চললাম ‘বৈঠা জোরে বাওরে বন্ধু বৈঠা জোরে বাও/উজান গাঙ্গে তুফান ভারী টলমল টলমল নাও রে বন্ধু….।’
চুপির টানে বেশ কয়েকবার আমি এসেছি নতুন নতুন পাখিপ্রেমিক বন্ধুদের সঙ্গে। প্রতিবারই সংগ্রহ করেছি নতুন অভিজ্ঞতা। একবার এক বিশেষ ঘটনার সাক্ষী হলাম। দেখি হ্রদের জলের উপর মাছ ধরার জাল ফেলার জন্য পোঁতা বাঁশের উপর চলছে বড় লড়াই। পাইড কিংফিশার (Pied kingfisher) এবং হোয়াইট বেস্টেটেড কিংফিশারের মধ্যে চলছে তুমুল ঝগড়া। কে বাঁশের পোলে উঁচুতে বসে মাছ ধরবে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ক্যামেরা বন্দি করলাম। এক একটা অ্যাকশনের ছবি।
দেখেছি একঝাঁক লেজার হুইসলিং ডাক(Lesser whistling duck) সর্ষের খেতের উপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। তাছাড়া হঠাৎ হঠাৎ এক এক করে পাখিরা জল থেকে ডানা মেলে উড়ে চলার দৃশ্য আকাশকে বদলে দিচ্ছে নীল ক্যানভাসে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। এই জলাভূমির দুদিকে রয়েছে চাষের জমি। চাষিরা লাঙল-বলদ দিয়ে চাষ করতে ব্যস্ত। তাদের পেছন পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছে শামুক খোল, রেড ওয়ালডেট লেপুইং Red-wattled lapwing ও ইগ্রেট(Egret)-এর দল খাবার সংগ্রহের খোঁজে। দেখলাম পাখি ও মানুষের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এবার নৌকা নিয়ে এগিয়ে চললাম নদী মূল স্রোতের দিয়ে মোহনার দিকে। মাঝি সামনের দিকে হাত তুলে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। দেখি সাদা মাথা ও বড়সড় বাদামি শরীরের পাখি যার নাম অসস্প্রে(Osprey) শিকার ধরার জন্য চুপ করে বসে আছে বাঁশের খুটির উপরে। এরা খুব ক্ষিপ্র শিকারি। বড় মাছ ধরে নিয়ে আহার করতে ভালোবাসে। নৌকো দেখার সঙ্গে সঙ্গে দিল এক ছুট।
দেখতে দেখতে সময় যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পেলাম না। ক্রমশ হ্রদের জল লালচে রঙ নিল। সূর্য তখন অস্তাচলে। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। আমরা ফিরে এলাম নিবাসে।
পরের দিন সকাল সকাল আমরা রওনা হলাম জলাশয়ের দিকে। তখনও জলাশয়টি ঢাকা কুয়াশায়। ধীরে ধীরে সূর্যের আলো আম-কাঁঠালের বাগান আর সর্ষে খেতের উপর পড়েছে। দেখি বেনেবউ, বসন্তবৌরি, বাঁশপাতির চেস্টনাট টেইল স্টারলিং(Chestnut-tailed starling) আর পাইড স্টারলিং(Pied starling)-এর দল আপনে মনে গান গাইছে। তাদের কিচিমিচির শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। বাদিকে সর্ষে খেতের বুকেই সামনাসামনি হলাম একটি গ্রে লাঙ্গুরের (Gray langur) পরিবারের সঙ্গে। শ্রীমতির কোলে একটি ছোট বাচ্চা নিয়ে। আমাদের দেখেই সাবধানে ঢুকে গেল জঙ্গলে। ততক্ষণে আমার ক্যামেরার ফ্রেমেবন্দি হয়ে গেছে তাদের ফ্যামিলি ফটো।
সঠিক ভাবে গাইড না হলে পথ হারানোর সমস্যা দেখা দিতে পারে। নীল জলের নীচে বিস্তৃত রয়েছে উদ্ভিদের জাল। তাছাড়াও ঘন শ্যাওলা বারবার নৌকোর পথ আবদ্ধ করে। কিন্তু এই অপূর্ব পরিবেশে নৌকোয় চলার আনন্দ কথায় প্রকাশ করা যায় না। আমাদের মত শহরবাসীদের এটি খুব আকর্ষণের। তাই সুযোগ পেয়ে আমিও বাঁশের লগি টানা অভ্যাস করলাম। ডান দিকের বাঁকে দেখলাম কমন স্নাইপ(Common snipe), কমন রিংড প্লোভার(Common ringed plove)-এর মত ছোট পাখিদের। পানার উপর বসে আছে হোয়াইট ওয়াগটেল(White wagtail)। একটু এগিয়ে যেতেই দেখি গ্রেট ইগ্রেট(great egret)। মাথা উঁচু করে রাজকীয় ভঙ্গিমায় দাড়িয়ে। আর দেখলাম ব্ল্যাক হেডেড ইবিস বা কাস্ত বকের দলকে ঘুরে বেড়াতে। মোহনার চরে পৌঁছেই দেখলাম তিনটি রুডিশ্যাল ডাক বা চখা-চখী পাখি।
চুপির পাখি পাঁচালি শেষ করা খুব কঠিন। নীল জলের উপর আলপনার মত পদ্মপাতা ভাসমান ছবি, ডিঙি নৌকো করে গ্রামবাসীদের মাছ ধরা, আবার কোনো কোনো ঘাটে দল বেঁধে স্নানের দৃশ্য। কখনও শাপলাফুলের উপর বসে থাকা মাছরাঙা। মনে হয় এভাবেই ভেসে চলে যাই কোনও অচেনা দেশে। চুপির ভ্রমণের ছবিগুলি বায়োস্কোপের মত আজও মনে ভেসে আসে।