নানা মিথ্যা আউড়ে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে পথ নেই
কমিউনিস্টদের নানা দোষের কথা বিভিন্ন সময় বলেছেন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ। কিন্তু আবোল–তাবোল বকাও যে তাঁদের স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য, তা আগে জানা ছিল না। চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস–এর দৌলতে এবার তা জানা গেল। জোকা লা নিয়ে দু দেশের টানাপোড়েনের সময় এই কাগজটি লাগাতার হুমকি দিয়ে গিয়েছে। তাতে দিল্লি কর্ণপাত করছে না দেখে শেষে বানিয়ে খবর তৈরি করেছিল, ভারত সেনা পিছোতে শুরু করছে। ভারত তেমন কিছু করছে না বলে জানিয়ে দেওয়ার পর তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। আর যখন আলোচনার মাধ্যমে ভারত ও চীন একটা রফাসূত্রে পৌঁছল, তখনও আবোল–তাবোল বকা বন্ধ হল না। এবার তারা লিখল, বাবা রাম-রহিমের সমর্থকরা যেভাবে হিংসায় নেমেছে তা থেকে নজর ঘোরাতে সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে দিল্লি!
এমনই হয় একটা বদ্ধ অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আটকে থাকা মানু্যের চিন্তাভাবনার ধারা। কারণ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করে, কীভাবে নানা ঘাত–প্রতিঘাতের সমাধান সেখানে হয়, সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই থাকে না তাদের। রাম-রহিমের ঘটনায় ভারতের দুর্দশার চিত্র আরও প্রকট হয়ে উঠেছে দাবি করেছেন গ্লোবাল টাইমস–এর লিউ লুলু। তা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু সেই সঙ্গেই তিনি আরও কিছু লিখেছেন। যেমন, ডেরা সাচ্চা সংগঠনটি যথেষ্ট জনপ্রিয়। মানুষের সমস্যার সমাধান হয় না বলে মানুষ এই সব ধর্মগুরুদের আশ্রয় করে। এতে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক দুরবস্থার চিত্র আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, একাধিক জাতিগত ও সামাজিক সমস্যায় রয়েছে ভারতে। শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে দোটানা রয়েছে। আর এত সব কিছু বলার পরেই তাঁর ফরমান, ‘আমরা আশা করব চীনা অঞ্চল থেকে যত দ্রুত সম্ভব সেনা সরিয়ে নিয়ে দিল্লি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলির সমাধানে মনোনিবেশ করবে। সীমান্ত বিরোধকে হাতিয়ার করে আভ্যন্তর সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে গেলে দু’কুলই হারাতে হবে।’
এত হাস্যকর লেখা, এত হাস্যকর যুক্তির তুলনা মেলা ভার। এক তো লেখকের অজ্ঞতা এর মধ্যে দিয়ে সামনে এসেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যে সামাজিক–ধর্মীয় জীবন নিয়ন্ত্রণ করে না, তা তাঁর জানা নেই। কারণ, তাঁরা কমিউনিস্টরা নাগরিক জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। যেখানে স্বাধীনতা নেই, সেখানে স্বাধীনতার অপব্যবহারও নেই। মানুষের আন্দোলন বা প্রতিবাদের অধিকার নেই। চীন যে কতবার কত সুস্থ আন্দোলনে গুলি চালিয়েছে, কত মানু্ষকে মেরেছে, তার ইয়ত্তা নেই। সেটা তাদের সমস্যা। নাগরিক অধিকার–কর্মীরা বাদে বাকি পৃথিবীর তা নিয়ে বলারও কিছু নেই। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। চীনের কমিউনিস্ট পণ্ডিতকে কে বোঝাবে তাঁরা যতই নাক গলাতে চান না কেন, তাঁদের কথা কেউ গ্রাহ্য করবে না, কারণ তাঁরা নিজেরাই নিজেদের জন্য একটা বর্বর ব্যবস্থা তৈরি করে তার মধ্যে রয়েছেন।
তার চেয়েও বড় কথা হল, পুরো পরিস্থিতি নিয়ে চীনা নেতৃত্বের দিশাহারা অবস্থাটাই প্রতিফলিত হয়েছে চীনা মিডিয়ায়। গত ১৬ জুন থেকে ডোকা লা অঞ্চলে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল ভারত ও চীনা বাহিনী। সীমান্ত অঞ্চলে নতুন করে বিরোধ মাথাচাড়া দেওয়ায় শুরু থেকেই হইচই ফেলে দেয় বেজিং। চীনা সংবাদমাধ্যমগুলি তো বটেই, তাদের সরকারের পক্ষ থেকেও পরের পর বিবৃতি দেওয়া হতে থাকে। তুলনায় বরাবরই চুপ থেকেছে ভারত। কিন্তু সেনা সরায়নি। ভারতের মূল বক্তব্য ছিল, ওখানে রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সেই কথাই মানতে হয়েছে চীনকে। এই যে তাদের এত প্রতাপ, এত শক্তি, পাঁচগুন বড় অর্থনীতি, অথচ তাদের সামনে রুখে দাঁড়িয়েছে ভারত, এই বিষয়টাই চীনকে দিশাহারা করে দিয়েছিল। তারা ভয় দেখিয়ে কাজ সারতে জানে, কিন্তু কেউ ভয় না–পেলে কী করতে হবে তাদের জানা নেই।
এমনকী, দুপক্ষ মতৈক্যে পৌঁছনোর পরেও চীনা বাহিনী বলছে, তারা এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়েছে। আর সেইসঙ্গে হুমকি দিচ্ছে, ভারতও যেন শিক্ষা নেয়। ভারতের সেনারা কিন্তু পিছিয়ে গিয়েও এমন জায়গায় রয়েছে, যেখান থেকে চীন ফের রাস্তা তৈরি করতে গেলে আবার তারা পৌঁছে যাবে আগের জায়গায়। কিন্তু এসব কথা স্বীকার করা তো চীনের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে ছোটছোট প্রতিবেশী দেশগুলিকে চোখ রাঙিয়ে আর থামানো যাবে না যে। এমনিতেই ভারতকে দেখে সবাই উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তাই এখন নানা মিথ্যা আউড়ে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে পথ নেই। আর সে কাজে কট্টর কমিউনিস্টদের হাতে থাকা গ্লোবাল টাইমস আবারও নেতৃত্ব দেবে, ধরেই নেওয়া যায়।