ছোটদের পত্রিকা বালক

ইংরেজি সন ১৮৮৫ প্রকাশ পায় সচিত্র মাসিক পত্রিকাটি

উনিশ শতকের শুরুতে ছোটদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে জ্ঞানদানের লক্ষ্যে পত্র-পত্রিকা ও শিশুতোষ বইয়ের প্রকাশনা শুরু হয়। তখন বাংলা মুদ্রণ যন্ত্র ছিলো কম। প্রকাশনার বিস্তৃতি ঘটেনি। কলকাতার ব্যাপটিস্ট মিশনে সবেমাত্র বাংলা ছাপাখানা বসেছে। শিশুদের জন্য নানাজনে নানা ধরণের পাঠ্যবই লিখতে শুরু করেছেন। বসে নেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামেন্দ্র সুন্দর বসাক, সীতানাথ বসাক ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এরাই লেখেন বর্ণপরিচয়, বাল্যশিক্ষা, আদর্শলিপি ও সহজপাঠ।

বর্ণপরিচয়, বাল্যশিক্ষা ও আদর্শলিপি শুধু কোমলমতি বালক-বালিকাদের বর্ণমালা শেখার জন্য লেখা বই। বর্ণ, বানান, ফলা ও যুক্তাক্ষর শেখার জন্যই এসব বইয়ে প্রয়োজনীয় অংশে দুএকটি ছড়া-কবিতা এবং গল্পের আদলে নানা কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছোটদের জন্য বর্ণমালা শেখার সহজপাঠ (প্রথমখন্ড) লিখে দেখলেন ছোটরা বর্ণ চিনেছে ঠিকই, কিন্তু অন্য কিছুই শেখেনি। তাই তিনি ছোটদের মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে সহজপাঠের আরো তিন খণ্ড বই প্রণয়ন করলেন। শুধু তাই নয়, চতুর্থ খন্ডে তিনি অন্যদের গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ স্থান দিলেন। সেকালে এভাবেই শিশুতোষ বাংলা পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছিলো।

ছোট শিশুদের জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা গল্প, কবিতা, ছড়া এবং উপদেশমূলক কাহিনী শোনাবার ধারণা জেগেছিলো ১৮১৮ সালে মাসিক দিকদর্শন পত্রিকা প্রকাশের পর। মাসিক দিকদর্শন প্রকাশ করে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন এবং তা ছোটদের মধ্যে বিতরণের দায়িত্ব পালন করে কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি। এর চার বছর পর বুক সোসাইটি মাসিক 'পশ্বাবলী' নামে একটি সবিত্র পত্রিকা প্রকাশ করে। অনেকে মনে করে 'পশ্বাবলী'ই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সচিত্র ছোটদের পত্রিকা। এভাবেই শুরু হয় ছোটদের পত্রিকার প্রকাশনা।

এরপর পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয় কৃষ্ণধন মিত্র সম্পাদিত বিদ্যাদর্পণ, ক্রিশ্চিয়ান সোইটির সত্যপ্রদীপ, প্রাণধন দত্ত সম্পাদিত রহস্য সন্দর্ভ, রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত অবোধবন্ধু…সম্পাদিত জোতিরিঙ্গন, মোহনলাল সম্পাদিত বিশ্বদর্শন, কেশবচন্দ্র সেন সম্পাদিত বালকবন্ধু, শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত মাসিক মুকুল, সতীশ চন্দ্র রায়ের সম্পাদিত সাথী এবং এরপরে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় শিশু-কিশোর মাসিক বালক। বালক সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। তিনিই প্রথম প্রাচীন লোকাচার ভেঙে হিন্দু নারী সমাজে আধুনিক রীতি-নীতি প্রবর্তন করেন। পাশাপাশি তিনি ছোটদের বিদ্যাশিক্ষা, চালচলন, রুচি এবং মানসিক বিকাশে নতুন ধারা আনার লক্ষ্যে বালক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বালক পত্রিকা প্রকাশ এবং জ্ঞানদানন্দিনী সম্পর্কে একটি রচনায় কলকাতার প্রাবন্ধিক সত্যজিৎ চৌধুরী লিখেছেন:

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে যশোরের মেয়েরা বউ হয়ে আসতেন নিতান্ত বালিকা বয়সে। সে মেয়েদের দুধের দাঁত পড়ত শ্বশুরবাড়ি এসে। দেবেন্দ্রনাথের মেঝো ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ বিয়ে করেন সাত বছরের মেয়ে জ্ঞানদানন্দিনীকে (আনু, ১৮৫৭)। জ্ঞানদানন্দিনীই লিখেছেন, বিয়ের পরে যখন দুধের দাঁতগুলি পড়তে শুরু করল তখন ওই পাকা বাড়িতে "দাঁত ফেলতে ইঁদুরের গর্ত কোথায় খুঁজব তা ভেবে পেতুম না।" এ বাড়িতে এসে তাঁরা লেখাপড়া, পারিবারিক আদব-কায়দা শিখতেন। বাইরে যতই উদার হোন, দেবেন্দ্রনাথ অন্তঃপুরের মানমর্যাদা সম্পর্কে রীতিমতো রক্ষণশীল ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী গঙ্গাস্নানের অনুমতি পেলেও বেহারারা তাকে পালকিসুদ্ধ জলে চুবিয়ে নিয়ে আসত। বড়দের মধ্যে এই জ্ঞানদানন্দিনীই ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরের চিরাচরিত প্রথা ভেঙে শুধু নিজেদের নয়, সারা বাংলারই মেয়েদের স্বাধীনতার সূচনা করেছিলেন। তাঁর মেয়ে ইন্দিরা দেবীর সাক্ষ্যে, দুধের দাঁত না পড়া সাত বছরের বউটির আত্মবিকাশ এবং রূপান্তর খুবই চমকপ্রদ মনে হয়। ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরিকাদের পোশাক ছিল একখানা মাত্র শাড়ি। এ পোশাকে বাইরে বেরনো অসম্ভব ছিল। আজকের মহিলারা যে-পোশাকে অভ্যস্ত, সে তো জ্ঞানদানন্দিনীরই উদ্ভাবন। ঠাকুরবাড়ির বউ একাই যোগ দিচ্ছেন গভর্নর লর্ড লরেন্সের পার্টিতে (১৭ ডিসেম্বর ১৮৬৬), পাথুরেঘাটার প্রসন্ন ঠাকুর লজ্জায় স্থান ত্যাগ করলেন। এখন ভাবা যায় না, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় একেবারেই শিশুসন্তান নিয়ে একা বিলেত যাত্রা করেছিলেন তিনি (১৮৭৭)। অবশ্যই সত্যেন্দ্রনাথের প্রেরণা তাঁকে সাহস জোগাত। কিন্তু অবরোধ ভাঙার এমন দুঃসাহস আর অন্দর মহলের মধ্যযুগীয় রীতিনীতি উড়িয়ে দিয়ে নতুন রুচির হাওয়া বইয়ে দেওয়ার রূপ শুধু বাইরে থেকে আসে না। লাগে চরিত্রের তেজস্বিতা, 'জবরদস্ত' ইন্দিরার কথায়) ব্যক্তিত্ব। তুলনা করলে মনে হয়এই প্রজন্মের অন্য বউদের, কাদম্বরী বা মৃণালিনীর এমন জোরালো চরিত্র ছিল না। জ্ঞানদানন্দিনী শুধু যে মেয়েদের পোশাক উদ্ভাবন বা ঘরের বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা নিয়ে ভাবছেন এমন নয়, গোটা পরিবারের রুচির প্রকর্ষ নিয়ে ভাবছেন। একেবারে বালক-বালিকাদের স্তর থেকেই সৃজনশীলতা জাগিয়ে তুলতে চাইছেন। চাইছেন গোড়া থেকেই ছোটদের রুচিপ্রকৃতি মার্জিত হবে, তারা আলো পাবে আধুনিক জ্ঞানের। সাহিত্যের স্বাদ, নাটক, অভিনয় তাদের সংবেদনশীল করে তুলবে। এ অবশ্যই এক দায়িত্বশীল, মুক্তমনের মানুষের ভাবনা। অভিভাবকত্বের দায় তুলে নিচ্ছেন নিজের উপরে।

এই দায়বোধ থেকেই জ্ঞানদানন্দিনী একটি ছোটদের পত্রিকা প্রকাশের আয়োজন করেছিলেন। এই উদ্যোগে তার সম্পাদনায় প্রকাশ পেল 'বালক' পত্রিকা, ১৮৮৫ সালে, ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে। 'বালক' নামক এই সচিত্র মাসিক পত্রিকা দীর্ঘায়ু হয়নি, মাত্র এক বছর চলল। তারপরে যুক্ত হল ঠাকুরবাড়িরই বিখ্যাত পত্রিকা 'ভারতী'র সঙ্গে, যুগ্ম পত্রিকার নাম হল 'ভারতী ও বালক'। 'ভারতী'র সম্পাদক স্বর্ণকুমারী দেবী লিখলেন, "আজ তিনি (ভারতী) বালক ক্রোড়ে আর এক নতুন বেশে দেখা দিলেন।" এভাবে 'ভারতী'র কোলে 'বালক' টিকে রইল আরও বছর ছয়েক—১২৯৩-১২৯৯। ১৩০০ বঙ্গাব্দ থেকে 'ভারতী' আবার শুধু 'ভারতী' নামে প্রকাশিত হতে থাকে। এইটুকু 'বালক' পত্রিকার ক্ষুদ্র ইতিহাস। এই ক্ষুদ্র আয়ুতেই 'বালক' আমাদের সাময়িক পত্রিকার ইতিহাসে বেশ গভীর দাগ রেখে গেছে।

আমরা অনেকেই জানি না বালকের লেখা সংগ্রহ, মুদ্রণ ও বিপণনের জন্য কার্যাধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনীর ২৪ বছর বয়সী দেবর রবীন্দ্রনাথ। বালকের আয়ুষ্কাল যুক্তভাবে মোট সাত বছর। এই সাতবছর শিশুসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে জাগরণ এনোছিলো বালক। রবীন্দ্রনাথের সংগে শিশুতোষ রচনা বালকেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো। ঠাকুর বাড়ির লেখক ছাড়া বালকে সেকালে নামজাদা লিখেয়েরা লিখেছিলেন। এর মধ্যে কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার, ভূবনমোহন রায়, শরত্চন্দ্র দত্ত, প্রবোধচন্দ্র ঘোষ, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ও প্রিয়নাথ সেনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বালক পত্রিকাটিতেই প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা ছাপা হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাগুলো লেখেন রবীন্দ্রনাথের বড়দি সৌদামিনীর ছেলে নরেন্দ্রবালা।

একশ বত্রিশ বছর আগে বালক প্রকাশিত হয়। বালক প্রকাশের পর ছোটদের জন্য সখা ও সাথী, মুকুল, শিশু, সন্দেশ, মৌচাক, পাঠমালা, রামধনু রংমশাল, শেরেবাংলা সম্পাদিত বালক বালিকা, সুখীপাখি, শিক্ষা, ছাত্রসহচর, আঙুর, শিশু সওগাত ও জমজম প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকা শিশুসাহিত্য সৃষ্টি, শিশুর মেধা-মনন ও প্রতিভা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জ্ঞানদানন্দিনী সেকালে বালক পত্রিকা সম্পাদনা করে শিশুদের জ্ঞানচর্চার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। তাঁকে আমরা কখনো ভুলতে পারি না।

Developed by DXDasia