এমন নিদর্শন কেবল শিল্পরূপ নয়, বরং এক ঐতিহাসিক দলিল
বাংলার কত রূপ, কত বর্ণ, কত ঋতুভিত্তিক লোকাচার! কত রকম উৎসব ঐতিহাসিকভাবে তার ধরন, আন্তরিকতা ও ঐতিহ্যের ভঙ্গিতে আজীবন জনপ্রিয়। সাধারণ গ্রামীণ মানুষ যার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িয়ে আছেন। গ্রামবাংলায় সমাজচিত্রে এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন উৎসব পালিত হয়। আজও সেখানকার আনাচ কানাচ, মাটির রাস্তা, দিঘি ভরা জল, ছোটো পুকুর, সদরবাড়ি, বুড়ো শিবের মন্দির, বাগান সব নিয়ে ব্যাপ্তি বৈচিত্র্যে প্রকৃতি অনন্য। চৈত্র মাসে গ্রামীণ মানুষজন ঘরবাড়ি পরিষ্কার করেন। গ্রামীণ বিশ্বাস যে, চৈত্র বৈশাখে ভূতের উপদ্রব হয়। পুকুরঘাট আর নির্জন জায়গায় যেতে মানা করা হয়, কারণ এই সময়ে তেনারা নাকি আসেন। গ্রাম বাংলায় শিবের গাজনে উৎসবের প্রস্তুতি চলে। এ সকল লোকসংস্কারের মধ্যে লোকাচার অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে গেছে। (টেরাকোটায় চড়ক)
দুদিকে সবুজ ক্ষেত। কোথাও সরু পথের ধারে বাঁশঝাড়। মেঠো পথের দিকে দিকে বনফুল। বড়ো গাছপালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে রোদ খেলে যায়। দু-চারখানি পাখির ডাক বাতাসের শব্দে ভেসে আসে। ঘরগুলোর সামনে হাঁস-মুরগির চলাচল। দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট শুনশান। পথ ধরে এগিয়ে আসছে অদ্ভুত পোশাকের কজন। তাদের শরীর ও মুখে রং মাখা। কাঁধের ওপর মরা মানুষ। হঠাৎ দেখে সত্যি ভেবে ভুল হয়। কখনও তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন আবার পথ চলা বেশ খানিকটা। ছয়-সাত জনের দল মুখে বলে চলেছেন, ‘শাবড়া গাছে ভূতের কানি, ভূত ছাড়াতে আমরা জানি’। এদের মধ্যে কেউ সেজেছে অসুর। কেউবা ধনী-গরিব। লোকজনের কাছ থেকে যা দান পাওয়া গেছে, তাতে চড়ক পুজোর খরচ উঠবে। (টেরাকোটায় চড়ক)
একরত্ন,পঞ্চরত্ন, চারচালা, আটচালা মন্দিরগুলোতে দেখা যায় চড়কি খেলার দৃশ্য। গ্রাম বাংলায় এই শিব ভক্তির আচার অনুষ্ঠানটি মহা সাড়ম্বরে পালিত হয়। মন্দির স্থাপত্যে ভিত্তিবেদির ঠিক ওপরে চওড়া ফলকে সাধারণত চড়কি খেলার দৃশ্যটি উঠে আসে।

চড়কের সময় শান্ত জলের ভেতর থেকে এক আঁজলা জল নেবার মতো শাল গাছের খুঁটিটি পুকুর থেকে তুলে আনা হয়। সেটি জলের মধ্যে ডোবানো থাকে সারা বছর। যাকে চড়ক গাছ বলেন গ্রামীণ মানুষরা। সন্ন্যাসীরা এই সময় পুকুরে ডুব দিয়ে শুদ্ধ হয়ে নেন। শিবের পাটা রেখে বুড়ো শিবের পুজোপাঠ করা হয়। তারপর আসে বাণ-সন্ন্যাস। জিভে বা শরীরে বাণ শলাকা বিঁধিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরা হয়। প্রাচীন এই উৎসব দেখতে বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষজন আসেন। ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব মন্দির স্থাপত্যে বাংলার পোড়ামাটি নিদর্শনে পাওয়া যায়।
রাঢ় ভূমিতে পোড়ামাটির ফলক বাংলার শিল্পকলার এক অনন্য অবদান। নদীবাহিত পলি মাটি দিয়ে পোড়ামাটির ফলক নির্মাণ হয়। আগুনে পুড়ে প্রাচীন স্থাপত্যের দেওয়ালে উঠে আসে দেবদেবী, জীবনযাত্রা ও লোককাহিনি। একরত্ন, পঞ্চরত্ন, চারচালা, আটচালা মন্দিরগুলোতে দেখা যায় চড়কি খেলার দৃশ্য। গ্রাম বাংলায় এই শিব ভক্তির আচার অনুষ্ঠানটি মহা সাড়ম্বরে পালিত হয়। মন্দির স্থাপত্যে ভিত্তিবেদির ঠিক ওপরে চওড়া ফলকে সাধারণত চড়কি খেলার দৃশ্যটি উঠে আসে। মন্দিরের সামনে ফলকচিত্রের এই কাজটি স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন। (টেরাকোটায় চড়ক)
শিবের নাম নিয়ে বাঁশের তৈরি উঁচু মাচা বেঁধেছে। দুইদিক থেকে মাচা বেঁধে ওপরে উঠেছে কজন। নির্ভীক সন্ন্যাসী দিলেন উঁচু মাচা থেকে নিচে ধারালো বঁটি-কাঠারির ওপর ঝাঁপ। নানা মানুষের হৃদয়েনুভবে তখন শিবের নাম। উৎসবের মধ্যে এক দরদ ফুটে ওঠে। যে-নিয়মে এখনও প্রযুক্তি গলার ফাঁস হয়ে ওঠেনি। গ্রামীণ সহজ সরল জীবনের স্পন্দন শুধু দরদি ও আবেগময়। চড়কি খেলা বিস্ময়ে দম বন্ধ হয়ে আসে। আর যারা খেলছেন বিশেষ লক্ষ্যে তারা আত্মনিবেদিত। এই কঠিন যোগের মধ্যেও তাদের বিস্তর আনন্দ। যাতে প্রাণের টানটাই বেশি।
চৈত্র শেষে মধুমাসে ফি বছরের মত হয় শিব-পার্বতীর বিয়ে। চড়কির সঙ্গে এই বিবাহ উৎসব পালন হয়। এর অপর নাম নীল পুজো। লোকজীবনে শিব-পার্বতীর বিয়ে নিয়ে প্রবচন আছে, ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান/শিব ঠাকুরের বিয়ে হবে তিন কন্যে দান’। নবদ্বীপে বুড়োশিবের বিয়ে মহা ধুমধাম করে হয়। শিব ঠাকুর চতুর্দলায় চড়ে মুখোশ পরে বিয়ে করতে যান। তিনি যে বুড়ো, তাই মুখোশ পড়ে তরুণ সেজে যান। আধবোজা চোখ, গোঁফ ও মাথায় সাপের ফণা মুখোশে থাকে। শিব মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির চিত্রে শিব-পার্বতীর বিয়ের দৃশ্য উঠে আসে।
শিব মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির চিত্রে শিব-পার্বতীর বিয়ের দৃশ্য উঠে আসে। কালনা বৈঁচি রোডের ওপর বৈদ্যপুর গ্রাম। যা বর্ধমান ও হুগলির সীমান্তে অবস্থিত। বহু প্রাচীন মন্দির এখানে ছড়িয়ে আছে।

কালনা বৈঁচি রোডের ওপর বৈদ্যপুর গ্রাম। যা বর্ধমান ও হুগলির সীমান্তে অবস্থিত। বহু প্রাচীন মন্দির এখানে ছড়িয়ে আছে। মনসামঙ্গল কাব্যে এই স্থানের উল্লেখ রয়েছে। কথিত যে, বেহুলা বৈদ্যপুরে বৈদ্যদের কাছে লখিন্দরকে নিয়ে এসেছিলেন। এখানে একটি আটচালা শিব মন্দিরে ভিত্তিবেদির ওপর পোড়ামাটি কাজে চড়কি খেলার দৃশ্যটি আছে। মূলত শিব মন্দিরগুলোতে এই শৈল্পিক কাজ পাওয়া যায়। আরেকটি কাজ আছে ইলছোবার পঞ্চরত্ন শিব মন্দিরে। শিব মন্দিরগুলো ছাড়া এই কাজ বেশি দেখা যায় না।
ধর্মীয় লোকাচার মন্দিরে পোড়ামাটির চিত্রে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। যাতে লোকবিশ্বাসের ছাপ ও স্থানীয় সংস্কৃতি উঠে আসে। তবে সময়ের সাথে আজ সব জীর্ণ। শিল্পকর্মগুলো সংরক্ষণ জরুরি। এমন নিদর্শন কেবল একটি শিল্পরূপ নয়, বরং এটি এক ঐতিহাসিক দলিল। পোড়ামাটির শিল্পকে সংরক্ষণ করা বিশেষভাবে প্রয়োজন, কারণ এতে লুকিয়ে আছে আমাদের বৈচিত্র্যময় উৎসবমুখর সংস্কৃতির পরিচয়।
_______________
তথ্যসূত্র: ডেভিড ম্যাককাচ্চন | ইলছোবা, রামগতি ন্যায়রত্ন | সুধীর কুমার মিত্র