প্রধান বাগানবাড়িগুলি ছিল নীলগঞ্জ রোডের আশেপাশেই, দেঁতে খালকে কেন্দ্র করে
লোকমুখে বিখ্যাত এই প্রবাদটির অর্থ খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে বেলঘরিয়ার গৌরবময় ইতিহাস। কলকাতার বাইরে বরানগর, দমদম, আড়িয়াদহ প্রভৃতি স্থানে গড়ে উঠেছিল প্রচুর বাগানবাড়ি। বেলঘরিয়াও তার ব্যতিক্রম নয়। কলকাতার জমিদার ও বাবু-কালচারে পুষ্ট একশ্রেণীর ‘হঠাৎ-বড়লোক’ নিজের বাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্বে বিভিন্ন বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। সেইসব বাগানবাড়িই বেলঘরিয়ার উনিশ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধের ইতিহাসের প্রধানতম নজির। জমিদাররা কলকাতা থেকে পানসি(একশ্রেণীর নৌকা)-তে চেপে গঙ্গা হয়ে দেঁতে খাল ধরে বেলঘরিয়ার বাগানবাড়িতে পৌঁছোতেন। গলায় উল্লাসধ্বনি। তাঁদের সেই ফুর্তির মেজাজই অমর হয়ে আছে ‘চালাও পানসি বেলঘরিয়া’ প্রবাদটিতে।
আরো বিশদে বললে, এইসব বাগানবাড়িতে বাইজি নাচাতে এবং মদ্যপান করতে আসতেন জমিদাররা। তৎকালীন কলকাতার বড়লোকদের জীবনে রক্ষিতার উপস্থিতি অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। অনেকে এইসব বাগানবাড়িতে রক্ষিতাও রাখতেন, সময়ে-অসময়ে এসে ফুর্তির জন্য। তবে বেশিরভাগ বাগানবাড়িই ছিল পরিচারকদের হেফাজতে। বাবুরা ইচ্ছেমতো এখানে রাত কাটিয়ে আবার ফিরে যেতেন নিজেদের ডেরায়। কাজেই ‘চালাও পানসি বেলঘরিয়া’ কথাটিতে তাঁদের সেই শরিফ মেজাজ ও আসন্নপ্রায় মৌজ-মস্তির কল্পনাই যে ফুটে উঠেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু মুশকিল হল, বাগানবাড়ি ও তার কার্যকলাপ মানবজীবনের একটি গোপন দিক হওয়ায়, ঐতিহাসিকরাও সযত্নে এড়িয়ে গেছেন এ প্রসঙ্গ। ফলে সেই বাগানবাড়িগুলি কাদের ছিল এবং কারাই বা থাকত সেখানে, তার ইতিহাস জানা প্রায় অসম্ভব। কারণ বেশিরভাগই এখন ভেঙে বসতি গড়ে উঠেছে। মুছে গেছে সে-সময়ের দলিল।
তবু, যেটুকু ইতিহাস জানা যায় প্রাচীনদের মুখ থেকে, প্রধান বাগানবাড়িগুলি ছিল নীলগঞ্জ রোডের আশেপাশেই, দেঁতে খালকে কেন্দ্র করে। এখন যেখানে জেনিথ হসপিটাল, সেখানে ছিল বিশাল একটি বাগানবাড়ি। সেখানে নাচঘরে একটি কাঠের পাটাতনের নিচে জলের ওপর তার লাগানো থাকত, বাইজিরা নাচার সময় বেজে উঠত জলতরঙ্গ। বাকিগুলির কথা তেমনভাবে জানা যায় না এখন আর। এছাড়াও এখন যেখানে স্টেট ট্রান্সপোর্ট অফিস, সেখানেও বাগানবাড়ি ছিল। বর্তমান দু’নম্বর রেলগেটের পাশে ওল্ড নিমতা রোডের ওপরেই ছিল রেমিশনের বাগানবাড়ি, এক ঔষধ প্রস্তুতকারক কম্পানির অধীনে। বিশাল অঞ্চল জুড়ে গঠিত সেই বাগানে বিভিন্ন গাছের সঙ্গেই ছিল একটি নাচঘর। বর্তমানে বাসুদেবপুরের যে অঞ্চলটি ‘মনোভিলা’ নামে পরিচিত, সেখানে ছিল মনোরমা বাইজির বাগানবাড়ি। বৃদ্ধ বয়েসে তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন অনেকে। তার পাশেই ছিল সুরেন দাসের বাগান। এখন যেখানে বেলঘরিয়া থানা, সেখানেও একটি বাগানবাড়ির প্রাচীন অস্তিত্বের কথা জানা গেছে। বিটি রোডের ওপর, বর্তমান ‘রাইস’ শিক্ষায়তনের উল্টোদিকে অবস্থিত কালিদাস পালের বাগানবাড়ি। সামনে রাধা-কৃষ্ণের মন্দির। বেলঘরিয়ার প্রাচীন বাসিন্দা মণীন্দ্রনাথ বব্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বাইরের লোকের চোখে ধুলো দেয়াই এই মন্দিরটির নির্মাণের কারণ। আমাদেরও তাই মনে হয়। কারণ ভেতরের বাগানে ঝর্না, প্লাস্টার অব প্যারিসের নারীমূর্তি, সুন্দর বৈঠকখানা, গাড়িবারান্দার দার্ঢ্য নিছক মন্দিরের কারণে তৈরি হতে পারে না।
আরও পড়ুন
বেলঘরিয়ার হারিয়ে যাওয়া নদী
অবশ্য বাগানবাড়ি হলেই যে সবসময় ফুর্তি ও বাইনাচের অনুষঙ্গই উঠে আসবে, তা নয়। ডানলপের কাছে বি.টি. রোডের পশ্চিমদিকে ছিল গুপ্তনিবাস, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে অনেকদিন ছিলেন এবং এখানেই মারা যান ১৯৫১ সালে। এমনকি, তিরিশের দশকের প্রথমার্ধে, অসুস্থ অবস্থায় রবীন্দ্রনাথও কিছুকাল বাস করেন এখানে। সদ্যনির্মিত সিসিআর ব্রিজের ওপর দিয়ে মালগাড়ির অবিরাম যাতায়াতের শব্দে বিরক্ত হয়ে, কিঞ্চিৎ রসপ্রয়োগেই বেলঘরিয়া’কে ‘ঘড়ঘড়িয়া’ বলে ডাকতেন তিনি।
বেলঘরিয়ায় বিটি রোডের ওপর এখনও অবস্থিত মতি শীলের ঠাকুরবাড়ি ও অতিথিশালা। একে ঠিক বাগানবাড়ি বলা যায় না। মতিলাল শীল ছিলেন উনবিংশ শতকের কলকাতার একজন প্রধান ব্যবসায়ী ও দানশীল ব্যক্তি। ১৮৪১সালে তিনি আড়িয়াদহে স্নানার্থীদের জন্য একটি ঘাট এবং বেলঘরে পথচারীদের জন্য একটি অতিথিশালা নির্মাণ করে দেন। তখনই রোজ প্রায় একশজন আহার গ্রহণ করতো এখানে এবং আজও এই প্রথা চালু রয়েছে।
বাগানবাড়ির ইতিহাস বিস্তৃতভাবে আজ আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। অন্ধকারেই মিশে গেছে বেলঘরিয়ার এই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য। অথচ গত শতকের পাঁচের দশকেও এদের অনেকগুলিই টিকে ছিল। বেলঘরিয়ায় অন্যান্য ইতিহাস রচয়িতারা, এমনকি স্থানীয় মানুষজনও তেমন আগ্রহী হননি এই ব্যাপারে। কাজেই কিছুটা অনুমান আর অনেকখানি কল্পনা মিলিয়ে একটি অবয়ব দাঁড় করানো ছাড়া আজ আমাদের কাছে আর কোনো পথই খোলা নেই।
(ঋণ – বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে / তন্ময় ভট্টাচার্য)