পুরীর সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে চৈতন্যের মৃত্যুরহস্য

গম্ভীরায় এখনও রাখা আছে চৈতন্যের ব্যবহৃত লাঠি, খড়ম, কমণ্ডলু

গেসলুম পুরী। বাংলার বাইরেও প্রাণ খুলে বাংলা বলার এমন আনন্দ আর কোথাও আছে কি? জানি না। যাইহোক, অনেক বাঙালিই পুরী গেছেন, কাজেই সেই নিয়ে কিছু বলার বা জায়গার বর্ণনা দেওয়ার মানে নেই কোনও। এখানে শুধু ফাঁকতালে জানিয়ে রাখি কিছু ঘটনা, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা, যা কেউ কেউ জানেনও না।

১৯১৫ সালে নগেন্দ্রনাথ মিত্র ‘পুরীতীর্থ’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। ১০২ বছর আগেকার সেই বইতে পুরী তথা উড়িষ্যার তখনকার বর্ণনা, ইতিহাস খুব সুন্দর বলা আছে। এই বইটা নতুন অনেককিছু জানতে সাহায্য করেছে আমায়। সম্প্রতি ‘পরশপাথর’ থেকে বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।

কোনও জায়গায় যাওয়ার আগে খানিক পড়াশুনা করে গেলে সুবিধে হয় বইকি! আরও দু-একটি বই আছে। পুরী মানেই চৈতন্যের প্রসঙ্গ মনে আসবেই। সেই সঙ্গে চৈতন্যের অন্তর্ধান-সম্পর্কিত প্রশ্নও। এ-বিষয়ে সামান্য কিছু পড়াশুনা ছিল। তবে, সামান্য চার দিনের জন্য ঘুরতে গিয়ে পড়ে-জানা কৌতূহল মেটানো ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব নয়। খোঁজাখুঁজি তো দূর অস্ত। গবেষকরা দিনের পর দিন পড়ে থেকে যা লিপিবদ্ধ করে গেছেন, তাতে উঁকি দেওয়া শুধু।

স্বর্গদ্বার থেকে জগন্নাথ মন্দিরের পথে যেতে ডানহাতে পড়ে ‘রাধাকান্ত মঠ’। ‘গম্ভীরা’ নামে অধিক পরিচিত। এরপর কেউ গেলে, ঘুরে আসতে পারেন। উড়িষ্যার রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের রাজগুরু কাশী মিশ্রের বাড়ি ছিল ওটি। জীবনের শেষ ১৮ বছর চৈতন্য ওখানেই কাটিয়েছেন। একটা ছোট্ট ঘরে। বড়জোর দশফুট বাই সাতফুট হবে ঘরটি। ওখানে এখনও রাখা আছে চৈতন্যের ব্যবহৃত লাঠি, খড়ম, কমণ্ডলু। আরেকটা পুঁথিও দেখলাম। কীসের, জানি না।

এই গম্ভীরা থেকেই শেষবার বেরিয়েছিলেন চৈতন্য, তারপর অন্তর্ধান হয় তাঁর। ভিতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। একফালি জানলা দিয়ে উঁকি দিতে হয় ভেতরে। যদিও, আজকের গম্ভীরা দেখে হতাশ হলেও হতে পারেন। সে-আমলে যা ছিল মাটির বাড়ি, আজ তার চিহ্নমাত্র নেই। পাকা বিল্ডিং, মেঝে মোজাইক করা, আর চৈতন্যের ঘরটি তো সম্পূর্ণ মার্বেলে মোড়া! অথচ অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করলে কী ভালোই না হত! ধর্মক্ষেত্র করে তুলতে চেয়ে ইতিহাস নষ্ট করা মানুষের একটি প্রিয় স্বভাব। ব্যবসা, চারদিকে শুধু ব্যবসা আর প্রণামীর মোহ। এরা সময় বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। আর হ্যাঁ, কাশী মিশ্র রাধাকান্ত মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পরবর্তীতে, সেই থেকে ‘রাধাকান্ত মঠ’ বলে এর পরিচিতি। গম্ভীরা-র সম্পর্কে বিস্তৃত জানতে গেলে, চৈতন্য-জীবনী সংক্রান্ত অনেক বই পাবেন। সেগুলি থেকে কৌতূহল মিটবে যথেষ্ট।

স্বর্গদ্বার থেকে বাঁদিকে খানিক এগোলেই পাবেন হরিদাস মঠ। চৈতন্য নাকি স্বয়ং যবন হরিদাস-কে সমাধিস্থ করেছিলেন সেখানে। সেটিও আজ মার্বেলে মোড়া, পাকাপোক্ত। দেওয়ালে টাঙানো অনেকগুলি ছবি, চৈতন্যের জীবনী-সংক্রান্ত। বেশ আকর্ষণীয়।

এখন, চৈতন্যের মৃত্যু সম্পর্কে যে মতগুলি প্রচলিত, সেগুলি জানাই। এক নেতাজি ছাড়া, এই চৈতন্যের মৃত্যুই এখনও রহস্যাবৃত বাঙালির কাছে। মৃত্যু-সম্পর্কিত কিছু মত বা রটনা ভক্তদের, কিছু মত গবেষকদের।

১। কৃষ্ণভাবে মত্ত হয়ে সমুদ্রে নেমে ডুবে গিয়েছিলেন

২। জগন্নাথ মন্দিরে জগন্নাথের দারুবিগ্রহে লীন হয়ে গিয়েছেন

৩। রথের সামনে নৃত্য করার সময় পায়ে ইটের আঘাত লেগে পরে ক্ষতস্থান বিষিয়ে গিয়ে মৃত্যু

৪। টোটা গোপীনাথ মন্দিরে গোপীনাথের বিগ্রহে লীন হয়ে গিয়েছেন

৫। পুরীর পাণ্ডারা চৈতন্য-কে হত্যা করে জগন্নাথ মন্দিরের প্রাঙ্গনে কোথাও দেহ পুঁতে দিয়েছিলেন

৬। চৈতন্যকে হত্যা করে টোটা গোপীনাথের প্রাঙ্গনের কোথাও পুঁতে দেওয়া হয়েছিল

৭। আরও অনেক

এ-ব্যাপারগুলিতে আমার মন্তব্য বেশ কিছু বইয়েরই পুনরাবৃত্তি হবে। চাইলে সরাসরি বইগুলিই পড়ে নিতে পারেন।

হরিদাস মঠ ছাড়িয়ে সোজা এগনোর পর, ডানদিকে মোড় নিয়ে খানিক গেলেই দেখা যাবে টোটা গোপীনাথ মন্দিরের তোরণ। ওড়িয়া ভাষায় ‘টোটা’ শব্দের অর্থ বাগান। বলা হয়, গোপীনাথ বিগ্রহের জানু-তে একটি সাদা দাগ আছে, চৈতন্য নাকি সূক্ষ্মদেহে ওখান দিয়েই মিশে গিয়েছিলেন বিগ্রহে। মূল গর্ভগৃহের পাশের একটি কাঠের ফলকে এখনও চারটি লাইন লেখা, চৈতন্যের কোনও জীবনীগ্রন্থ থেকেই(ঠিক কোনটি থেকে, মনে নেই। চৈতন্যচরিতামৃত, চৈতন্যভাগবত, না অন্যকিছু?)। সেই চারটি লাইনের শেষ লাইনটি ‘অপ্রকট হইলা গোপীনাথের অঙ্গেতে।’ যাইহোক, এসব গালগল্পে মন ছিল না বিশেষ। আমি চাইছিলাম গোপীনাথ বিগ্রহের হাঁটুর সাদা দাগটা দেখতে। কিন্তু বিগ্রহের পুরো অঙ্গই ছিল কাপড়ে মোড়ানো। ফলে বিশেষ সুবিধে হয়নি। আর, টোটা অর্থাৎ বাগানেও ঘুরে লাভ নেই। প্রায় ছ’শো বছর পর, যদি চৈতন্য-কে ওখানে পোঁতাও হয়ে থাকে, কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়ার ভাবনা পাগলামি নয় কি?

একই কথা জগন্নাথ মন্দিরের ক্ষেত্রেও। অসম্ভব। তবু কোনও কোনও গবেষক চেষ্টা করেছেন। নিজেদের মত জানিয়ে গিয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যুক্তির ফাঁক। অন্য গবেষকরাই দেখিয়ে দিয়েছেন তা। আমি পাঠক, পড়ে জেনেছি – এর বেশি কিছু না।

চৈতন্য-কে বাদ দিয়ে পুরী আমার কাছে অনেকটাই ম্লান। খোঁজার প্রশ্নই নেই; মিলিয়ে দেখা শুধু। তাও অপরিণত জ্ঞানে কতটাই বা সম্ভব! শুধু, এএসআই বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া যেভাবে জগন্নাথ মন্দির, কোনারকের সূর্যমন্দির বা ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দির ইত্যাদি দেখভাল করে, যথাসাধ্য ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে(হয়তো ওগুলি ‘প্রতিষ্ঠান’ হয়ে উঠেছে বলেই। ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয় বটে…); সেভাবে যদি গম্ভীরা বা টোটা গোপীনাথের মন্দিরও যত্ন পেত, সংকীর্ণ ধর্মব্যবসায়ীদের পাল্লায় পড়ে ভোল পাল্টে যেত না।

ধর্মব্যবসা কোথাও কম নেই তা বলে! জগন্নাথ মন্দিরের কীর্তির কথা তো সবাই জানেন! তবে, সেগুলো উচ্চস্তরের ব্যবসা হওয়ায়, ব্যালেন্স রেখে চলেছে ইতিহাসের সঙ্গে। গম্ভীরা বা টোটা গোপীনাথ মন্দির বা হরিদাস মঠের সে-দায় নেই। নষ্ট হচ্ছে। হোক। ১৯১৫ সালে নগেন্দ্রনাথবাবু একরকম দেখেছিলেন, ২০১৭-তে আমি একরকম দেখলাম, ২০৫০-এ হয়তো কেউ আরও আলাদা দেখবে। বাজাও কাঁসর, বাজাও ঘণ্টা। প্রণামী বাক্স উপচে পড়ুক। কপাল ছেয়ে যাক গেরুয়া টিপে। আর চৈতন্যের খড়ম লাঠি কমণ্ডলু মার্বেলের সাজানো ঘরে বসে-বসে হাসুক। ওরা জানে প্রকৃত গম্ভীরা কী, কীভাবেই বা অন্ধকার একটি ঘরে থাকতেন চৈতন্য, কেনই বা গম্ভীরার দেওয়ালে মুখ ঘষে চিৎকার করে কাঁদতেন। আজকের কৌতূহলীদের শুধু বই-ই সম্বল, তাই না?

Developed by DXDasia