ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের নববর্ষ পালন

বৈষ্ণবধর্মী মণিপুরীরা সেদিন কোলাহল থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন বেশি

মনিকা মুখার্জি
তামিলনাডুতে নববর্ষ পালন করা হয় পয়লা এপ্রিল। চৈত্রপূর্নিমায় নববর্ষ পালন হয় অন্ধ্রপ্রদেশে, কেরলে বিশু নামে নববর্ষ পালন হয় ১৪ই এপ্রিল। কেরলের দক্ষিণ অংশে আরও একটা নববর্ষ পালন হয় ওনাম নামে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হয় এই ওনাম।

কর্নাটকের নববর্ষ যুগাদি পালিত হয় ১লা চৈত্র, আকাশের চাঁদ দেখে শুরু হয় যুগাদি। অসমে ১লা বৈশাখ পালিত হয় 'বিহু' নামে নববর্ষ। এটি অবশ্য পালিত হয় বছরে তিন বার। নতুন বছরে প্রথম দিনটিতে হয় বংগালি বিহু, কার্তিক মাসে হয় কাঙালি বিহু, আর মাঘে হয় ভোগালি বিহু।

মেঘালয়, মিজোরাম ও নাগাল্যাণ্ডের বেশির ভাগ মানুষই খ্রিষ্টান। তাই নববর্ষ পালিত হয় এই তিন রাজ্যে ১লা জানুয়ারি। মণিপুরে ১লা বৈশাখই হয় নববর্ষ। পূর্বাঞ্চলে আর একটি পাহাড়ি রাজ্য ত্রিপুরা। এখানে বাইরের মানুষ যেমন আছেন, তেমনি উপজাতির সংখ্যাও কম নয়। বাঙালিদের ১লা বৈশাখের পাশাপাশি ওখানকার 'লুসি' ও টুকাই উপজাতি খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী হওয়ায় ১লা জানুয়ারি নববর্ষ পালন করেন। পাঞ্জাবীরা ১লা বৈশাখের আগের দিন নববর্ষ শুরু করেন, আসল উত্সব অবশ্য পরের দিন, ওঁরা একে বলেন বৈশাখী। রাজস্থানে নববর্ষ পালিত হয় রাম নবমীর দিন। গুজরাতে নববর্ষ হয় অঘ্রাণ মাসের প্রথম দিন। পশ্চিমবঙ্গে ১লা বৈশাখ পালিত হয় নববর্ষের অন্যতম অনুষ্ঠান হালখাতা, দেব দেবীর মন্দির দর্শন ইত্যাদি দিয়ে। বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মালদা, পশ্চিম দিনাজপুরের আদিবাসীরা নববর্ষ পালন করে ১লা মাঘ। অনুষ্ঠানের নাম 'মাগসিম'। ঐ দিন মাদলের শব্দে জেগে ওঠে সাঁওতাল পল্লির মানুষ। প্রত্যেকেই হাতে একটি মুরগি নিয়ে হাজির হয় বট বা অশ্বত্থ গাছের তলায়। আরাধ্য দেবতাকে নিবেদন করে মুরগিটিকে। অনেকে আবার কচিপাতা বা ফল ও নিবেদন করে। কৃষি কাজে যুক্ত যারা, তারা হাল, লাঙল ছুঁয়ে ফসল বোনার শপথ নেয়। মেয়েদের চুলের খোঁপায় থাকে রঙিন ফুল আর পাখির পালক। এরপর থাকে নিজস্ব ঘরানার নাচ গান, খানাপিনা।

 

তামিল ভাষায় নববর্ষ উত্‍‌সবের নাম 'পুটুবর্ষ পিরাপ্পু'। এপ্রিল মাসকে তারা বলে 'চিহিরাই' মাস। অন্ধ্রপ্রদেশে খুব ভোরে উঠে লোকেরা কৃষ্ণা, কাবেরী আর গোদাবরীর জলে স্নান করে নতুন কাপড় পরে বেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে পূজো দেয়। সেদিন নিমফুল, আম, গুড়, আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে চাটনি বানায়, তার নাম 'উগাদি পার্য্চাদি'। চাটনির তেতো, মিষ্টি, টক, ঝাল বাস্তব জীবনে ঐ সব উপকরণের প্রতীক হিসেবে বছরের প্রথম দিন থেকেই গ্রহণ করা হয়। বিহু উত্‍‌সবে অসমের ঘরে ঘরে তৈরি হয় পিঠে, চলে পিঠে উত্সব। চাল, তিল, নারকেল দিয়ে তৈরী সেই পিঠের নাম 'খোলসাপুরি'। পিঠে খাওয়া আর নতুন জামাকাপড় পরে বাড়ি বাড়ি য়াওয়া আর সৌজন্য বিনিময় এই উত্‍‌সবের অঙ্গ।

মেঘালয়, মিজো ও নাগাল্যান্ডে ৩১শে ডিসেম্বরই মানুষজন ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। গির্জায় গির্জায় চলে প্রার্থনা, আকাশে ঝলসে ওঠে আতসবাজির আলো, তারপর শুরু হয় ভোজন উত্সব।

অন্যদিকে মণিপুরে নববর্ষ উত্সব কিছুটা অন্যরকম। বৈষ্ণবধর্মী মণিপুরীরা সেদিন কোলাহল থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন বেশি। ১লা বৈশাখ নববর্ষ হলেও উত্‍‌সবের শুরুটা হয়ে যায় দোল উত্‍‌সবের মধ্য দিয়ে। নতুন বছরের প্রথম দিন পর্যন্ত চলে এই রঙের খেলা। বৈষ্ণবধর্মের মূলমন্ত্র পরধর্ম সহিষ্ণুতা, তাই স্ফূর্তির বাঁধন থেকে বেরিয়ে আত্মসংযমের সাহায্যেই মণিপুরীরা ১লা বৈশাখ পালন করে। 
পাঞ্জাবীরা গুরুগোবিন্দর স্মরণ করে গুরুদ্বারের সরোবরে স্নান করে 'গ্রন্থসাহেব' পাঠ করেন ১লা বৈশাখ সকাল থেকে, গুরুদ্বারগুলিতে চলে উপাসনা, দুপুরে চলে ভোজ। খাওয়া শেষ হলে সকলে একসঙ্গে দৌড়ে যান কৃষিক্ষেতের দিকে, সেখানে ভরা ফসলের দিকে তাকিয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে শুরু হয় প্রীতি ও সৌজন্য বিনিময়। পরের দিন থেকে শুরু হয় গম কাটার কাজ।

 

গুজরাতে সবরমতী নদীর পাড়ে বসে মেলা, বজরা ভাসিয়ে শুরু হয় দৌড় প্রতিযোগিতা। নদীর জলে প্রদীপ ভাসিয়ে মৃতজনকে স্মরণ করেন তারা। বেসনের খাবার তৈরি হয় বাড়িতে বাড়িতে। সন্ধেয় শুরু হয় নাচ গানের আসর, ব্যবসায়ীরা সেদিন খাতা পুজোরও আয়োজন করে।

ধর্মীয় উত্‍‌সবের পরেই নববর্ষ উত্‍‌সবটি অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয় প্রায় সর্বত্রই। বৈদিক গ্রন্থগুলিতেও এই নববর্ষ উত্সব পালনের খবর পাওয়া যায়। নববর্ষের আগমনে অগ্নিপিতা ও পৃথিবীমাতাকে অর্ঘ্য দিয়ে শুরু হত নববর্ষের উৎসব।

(ঋণ – অবসর ডট নেট)

Developed by DXDasia