
কিংবদন্তি লিপিকর পঞ্চানন কর্মকারের গল্প
১৭৯৮ সাল। ধর্মযাজক উইলিয়াম কেরি তখন থাকেন মদনাবাটীতে। বেহদ্দ গ্রাম, কিন্তু সম্পন্ন। নদীর পাড়ে গ্রাম হওয়ার সুবিধে ঢের। তা, সেই নদীপথেই কেরির কাছে একদিন একটা কাঠের বাক্স এসে পৌঁছোল। যে সে বাক্স নয়, ছাপার কল। বিলিতি মুদ্রাযন্ত্র। সেটা কী, খায় না মাথায় দেয়, গাঁয়ের মানুষ বোঝে না। এদেশের শিক্ষিতরা তখনো পুঁথি পড়েন। ছাপা বই চোখেই দেখেননি কেউ। গ্রামের সবাই অবাক হয়ে দেখে, এই যন্তর পেয়ে কেরি সাহেব ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা আনন্দে প্রায় নাচছে। সামান্য যন্তরের কী এমন গুণ যে যাজককেও নাচায়! গাঁয়ের মানুষরা সেই আশ্চর্য যন্ত্রের নাম দিলেন ‘সাহেবদের ঠাকুর’।
আরো পড়ুন
‘সাহেবদের ঠাকুর’ ও বিলিতি পুরোহিত
এই ‘ঠাকুরের’ ‘আশীর্বাদেই’ এরপর বাংলা গদ্যের হাতেখড়ি থেকে আদল গড়ে ওঠার বিচিত্র ইতিহাস জন্ম নেবে। তদ্দিনে অবশ্য এই ঠাকুর প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন শ্রীরামপুর মিশনের ছাপাখানায়। ১৮০০ সালের কনকনে ঠান্ডা পেরিয়ে বসন্ত আসতে না আসতেই ছাপা হয়ে যাচ্ছে রামরাম বসু ও টমাস অনূদিত সেন্ট ম্যাথুজ গসপেল। ডিমাই ৮ পেজি ১২৫ পৃষ্ঠার বই ‘মঙ্গল সমাচার মতিয়ের রচিত।’ তারপর অবিরাম ধারা। ১৮০১ থেকে ১৮৩২ সালের মধ্যে চল্লিশটি ভাষায় দুই লক্ষ বারো হাজার বই প্রসব করেছে এই মুদ্রাযন্ত্র। বাংলা ভাষাতেই ছাপা হয়েছে দেদার বই।
বাংলাদেশে ছাপাখানা যে এই প্রথম স্থাপিত হল, তা কিন্তু নয়। বাংলা ছাপাও এই প্রথম নয়। বাংলা হরফ প্রথম ছাপা হয়েছিল পর্তুগালে, তারপরে লন্ডনে। আর, এই বাংলাদেশেই ১৭৭৮ সালে হুগলিতে অ্যান্ড্রুজ সাহেবের ছাপাখানা থেকে বেরিয়েছিল নাথানিয়েল হ্যালহেডের ‘গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ’। বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বই। তাতে পাতায় পাতায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর থেকে উদ্ধৃতি। সব বাংলা হরফে। যে বাংলার ছাঁদ গড়ে দিয়েছিলেন উইলকিন্স সাহেব। তাঁকে সাহায্য করেছিলেন জোসেফ শেফার্ড নামের সাহেব যুবা এবং এক বঙ্গসন্তান—পঞ্চানন কর্মকার।
এই পঞ্চাননই এরপরে কোলব্রুক সাহেবের ছাপাখানা ঘুরে এসে পৌঁছেছিলেন কেরির শ্রীরামপুর মিশনে। বাংলা হরফের কাঠামো পেয়েছিল তাঁরই ছেনির স্পর্শ। শ্রীরামপুর মিশনের ছাপাখানার অন্যতম অবদানই হল সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মের মতো ছাঁচে ঢালা সুশৃঙ্খলভাবে সার বেঁধে দাঁড়ানো বাংলা অক্ষরসজ্জার স্থায়ী রূপের জন্ম দেওয়া। যে হরফসজ্জা কাঠের ব্লকের ছাড়াছাড়া ছাপাতে সম্ভবই নয়। আর এই হরফেরই জন্ম দিয়েছিলেন পঞ্চানন কর্মকার।

উইলিয়াম কেরি পঞ্চাননকে নিয়ে এসেছিলেন শ্রীরামপুর মিশনের ছাপাখানায়। বলা ভালো ছিনিয়ে এনেছিলেন কোলব্রুক সাহেবের ছাপাখানা থেকে। পঞ্চাননকে নিয়ে তখন কোলব্রুক সাহেব ও কেরি সাহেবের মধ্যে রীতিমতো দড়ি টানাটানি চলছে। জল গড়িয়েছে অনেকদূর। পঞ্চাননকে ছিনিয়ে আনতে কেরির নাকি সওয়াল ছিল ছাপার ক্ষেত্রে ইংরেজদের মনোপলি চলবে না। এমন কারিগরের ওপর একচ্ছত্র অধিকার চাপানোর কোনও অধিকার নেই ইংরেজদের। একজন লিপিকরকে নিয়ে এই লড়াই। ভাবা যায়!
উনিশ শতকে পা রাখতে চলা ভারতবর্ষে ছাপাখানার তখন বিপুল গুরুত্ব। ছাপাখানা থাকলেই রাতারাতি হাজার হাজার বাইবেল অনুবাদ করে ছেপে পৌঁছে দেওয়া যায় বাঙালির ঘরে ঘরে। ধম্ম প্রচারের পথ সুগম হয়। ছাপাখানা থেকে বই ছেপে, তার ভিতর দিয়ে সুকৌশলে ‘নেটিভ’দের মগজে দ্রুত ঢুকিয়ে দেওয়া যায় সাহেব প্রভুদের উদ্দেশ্যের বীজ। তাছাড়া, আধুনিক শিক্ষায় আলোকিতকরণের গল্প তো আছেই। এহেন ছাপাখানায় শুধু ছাপার কল থাকলেই চলে না, দক্ষ লিপিকরও চাই। যে অক্ষরের ছাঁদ গড়ে দেবে। বঙ্গদেশে সে কাজে অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোক খুঁজে পাওয়াই কঠিন। তাই লিপিকরদের গুরুত্বও তখন বিরাট। তাদের নিয়ে দড়ি টানাটানিও অসম্ভব কিছু নয়।
হাজার সওয়ালেও যখন চিঁড়ে ভিজল না, তখন পরিকল্পনা বদলালেন কেরি। পঞ্চাননকে তাঁদের চাই-ই। কোলব্রুক সাহেবের কাছে ফের অনুরোধ গেল। “খুবই বিপদে পড়েছি। অন্তত দিন কয়েকের জন্য যদি পঞ্চাননকে ধার দেন আমাদের। কাজ হয়ে গেলেই ও আপনার কাছে ফিরে যাবে।” কোলব্রুক এবারে আর না করতে পারলেন না। পঞ্চাননকে ক’দিনের ছুটি দিয়ে বললেন— “একবার শ্রীরামপুর ঘুরে এসো।” কোলব্রুক দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, পঞ্চাননের এই যাওয়াই অগস্ত্যযাত্রা। পঞ্চানন শ্রীরামপুর থেকে আর গার্ডেনরিচে ফেরেননি।
কিছুদিন অপেক্ষা করার পর কোলব্রুক বুঝতে পারলেন, তাঁকে ঠকিয়ে পঞ্চাননকে চিরতরে বাগিয়ে নিয়েছেন কেরি সাহেব। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কোলব্রুক ভারত সরকারের কাছে আর্জি পেশ করলেন। কেরিও ছাড়ার পাত্র নন। পঞ্চানন হাতছাড়া হলে শ্রীরামপুরের ছাপাখানাও বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে কেরিও দিনেমার সরকারকে নামিয়ে দিয়েছেন আসরে। এক বাঙালি কারিগরকে নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতির লড়াই শুরু হল। যে যুদ্ধে শেষ হাসি হাসলেন কেরিই।
তারপর? শ্রীরামপুরের ছাপাখানায় পঞ্চানন প্রায় এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। বাংলা অক্ষরের ছাঁদ তো বটেই, গড়ে দিলেন আরও নানা ভাষার অক্ষরের ছাঁদ। বাংলা অক্ষরের একটা সুদৃশ্য আদল জন্ম নিল। সেই অক্ষর গড়ার ঐতিহ্যকেই এরপর আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন তাঁরই জামাতা মনোহর এবং তাঁর বংশধরেরা। যে আদলকেই আরও ঘষে-মেজে পরিষ্কার করে আমরা আজও লেখা চালাচ্ছি।
পঞ্চানন কর্মকার সম্পর্কে এই কাহিনি প্রথম শুনিয়েছিলেন শম্ভুচন্দ্র মুখার্জি। তিনি এই গল্প শুনেছিলেন পঞ্চাননের বড়ো নাতির কাছে। পঞ্চানন শ্রীরামপুরের মিশনারিদের কাছে কতটা গুরুত্ব পেতেন, তার হাজারো প্রমাণ ছড়িয়ে আছে তাঁদের লেখায়, চিঠিতে, পত্রিকায়। একজন লিপিকরকে নিয়ে কত গল্প, স্তুতি। একটা বদলাতে থাকা সময়ের মাঝে তাঁর ছেনি, হাতুড়ি আর হরফ গড়ে দেওয়ার অসামান্য দক্ষতা নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন পঞ্চানন। যা তিনি গড়ে দিয়েছিলেন, তা নিছক ধাতুর তৈরি হরফ নয়—তা একটা জাতির আত্মপ্রকাশের ধরন।
বাঙালি বিশ্বকর্মা যাকে বলে!
