আদিম কলকাতা এবং কিছু অদ্ভুতুড়ে প্রেমের গল্প
গত পর্ব থেকে একটুকরো
গ্র্যান্ড বুঝলেন গন্ডগোল কিছু একটা আছে। জর্জ যখন এখানে উপস্থিত, ফ্রান্সিস এসেছিল নিশ্চয়। জর্জ ফ্রান্সিসের ছায়াসঙ্গী। বড়ো ভেঙে পড়লেন গ্র্যান্ড সাহেব। এই ঘটনা নিয়ে কম জলঘোলা হল না। সবচেয়ে বড় আঘাতটা পেলেন যেদিন ক্যাথরিন নিজের মুখে স্বীকার করল, ফ্রান্সিসের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা। গ্র্যান্ড সাহেব ফ্রান্সিসের নামে কোর্টে কেস ঠুকলেন। কিন্তু ক্যাথরিনকে কিছু বললেন না। সাহেব বড়ো ভালোবাসতেন ক্যাথরিনকে। সাহেব লিখছেন ডায়েরিতে- “ওকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।” কিন্তু ক্যাথরিনের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্কও তিনি রাখলেন না। ক্যাথরিনকে তিনি বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। কিছু মাসোহারার ব্যবস্থা করে দিলেন।
এবার এই গল্পে এন্ট্রি নিলেন শূন্য থেকে সোনা তৈরি করার মালিক। তিনি আর কেউ না, হেস্টিংস সাহেব।
ফ্রান্সিসের এমন কর্মকাণ্ডে হেস্টিংস তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। দুজনের রাজনৈতিক চাপানউতোর দীর্ঘ দিনের। রাজনৈতিক দিক থেকে ফ্রান্সিস তাঁর জাঁদরেল প্রতিপক্ষ। তাকে ইন্ধন দিল প্রেম ঘটিত ঈর্ষা। ততদিনে হেস্টিংস বিবাহিত, তবুও এই ক্যাথরিনকে একদিন মনে মনে তিনিও তো কামনা করেছিলেন। হেস্টিংস দেখলেন ফ্রান্সিসকে টাইট দেওয়ার এই তো সুযোগ। এমনিতেই বেচারা মামলা মোকদ্দমায় জর্জরিত। ফ্রান্সিসকে পাঠালেন চিঠি- “আও, লড়ো আমার সাথে।” লড়া মানে, মল্লযুদ্ধ, লাঠিখেলা নয়। পিস্তলের ডুয়েল। এমন প্রস্তাবে ঘাবড়ে গেলেন ফ্রান্সিস। তিনি দুরন্ত প্রেমিক হতে পারেন, কিন্তু বন্দুক ধরেননি কোনোদিন। হেস্টিংস ওসব শুনতে নারাজ। নানা ভাবে তিনি চাপ দিতে থাকলেন ফ্রান্সিসকে। ফ্রান্সিস পড়লেন মুশকিলে। ডুয়েলের প্রস্তাবে রাজি না হলে তার প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন। লোকে কাপুরুষ বলে দুয়ো দেবে। তিনি রাজি হলেন। হেস্টিংসকে পাঠালেন চিঠি- “আপনি মশাই ছোটলোক। আমায় ডুয়েল লড়ার জন্যে জোরাজুরি করছেন।” কোথায় লড়া হবে ডুয়েল? অনেক টালবাহানার পর ঠিক হল বেলভেদের রোডের বাগান। এখনকার ন্যাশনাল লাইব্রেরি চত্বর। ১৭৮০ সালের ১৭ই আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটায় দু-পক্ষ হাজির সেখানে। হেস্টিংসের সঙ্গ নিয়েছেন কর্নেল পিয়ার্স। ফ্রান্সিসের সঙ্গে আছেন কর্ণেল ওয়াটসন। প্রতিপক্ষ ডুয়েল লড়ার সময় কোনো কারচুপি করছে কিনা তারা খতিয়ে দেখবেন। হেস্টিংস-ফ্রান্সিস দুজনে গুনে গুনে চোদ্দ পা তফাতে মুখোমুখি দাঁড়ালেন। দুজনের হাতেই একই ধরনের বন্দুক ধরিয়ে দেওয়া হল। আগে বন্দুক পরীক্ষার পালা। হেস্টিংসের বন্দুক থেকে গুলি বেরলো। ফ্রান্সিসের বন্দুক চলল না। ক্যাপ ফাটানোর বন্দুক এনেছিলেন কিনা জানা নেই। হেস্টিংস বললেন- “কৌই বাত নেহি। আমি বদলে দিচ্ছি বন্দুক।” ফ্রান্সিসের হাতে নতুন বন্দুক এল। এবার শুরু হবে ডুয়েল। কর্নেল পিয়ার্স, কর্নেল ওয়াটসন দুজনে ঘড়ি দেখতে থাকলেন। কর্নেল পিয়ার্স বললেন- “ফায়ার”। দুটো পিস্তল এক সঙ্গে গর্জে উঠল। ফ্রান্সিসের গুলি হেস্টিংসের গায়েও লাগল না। কিন্তু হেস্টিংসের ছোড়া গুলি বিধল ফ্রান্সিসের শরীরে। সাহেব আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তবে কি ফ্রান্সিস সাহেব মারা গেলেন? এখনকার ন্যাশনাল লাইব্রেরির ভূত কি ফ্রান্সিস সাহেবের অতৃপ্ত আত্মা? জনশ্রুতি তেমনই বলে। এখানেই জনশ্রুতির সঙ্গে প্রভেদ গড়ে ইতিহাস। সত্যি কি ঘটেছিল সেদিন? ফ্রান্সিস সাহেব কি মারা গেলেন? বাকি গল্পটা তাহলে বলি।
আরও পড়ুন
‘ভূত’পূর্ব প্রেম- ২
গুলি লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। হেস্টিংস- “ও মাই গড” বলে ছুটে গেলেন। তিনি ফ্রান্সিসকে মারতে চাননি। একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন। ব্যাটা টেঁসে গেল নাকি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ফ্রান্সিসের শরীর। গুলি লেগেছে ঘাড়ে। ফ্রান্সিস নড়ছেন না। কর্নেল পিয়ার্স পরীক্ষা করে বুঝলেন ক্ষীণ শ্বাস পড়ছে ফ্রান্সিসের। তিনি ছুটলেন কাপড় আনতে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে হবে এক্ষুণি। কর্নেল ওয়াটসন ছুটলেন খাট পালকির ব্যবস্থা করতে। এক্ষুনি ফ্রান্সিসকে শহরে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ব্যবস্থা হল। কিন্তু তখন ঘোর বর্ষা। গঙ্গায় বান ডেকেছে। কী করে গঙ্গা পেরিয়ে শহরে নিয়ে যাওয়া হবে তাকে? যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ফ্রান্সিস। এপারেই টালি সাহেবের বাগান বাড়িতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল। বিখ্যাত ডাক্তার ক্যাম্পবেল আসলেন। বললেন- “আঘাত খুব গুরুতর কিছু নয়। অকস্মাৎ গুলির আঘাতে জ্ঞান হারিয়েছিলেন।” কিছুদিনের মধ্যেই ফ্রান্সিস সুস্থ হয়ে উঠলেন। মাস খানেক পর তাঁর কাজে যোগ দেওয়ার খবর নিজে লিখেছেন ডায়েরিতে। ফ্রান্সিস মারা যান বহু পরে, নিজের দেশেতে। তাহলে, ন্যাশনাল লাইব্রেরির দারোয়ানের ভূত দেখা কি চোখের ভুল? নাকি, কোনো নিশীথে এ তিলোত্তমা রোমন্থন করে তার রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি! কে জানে।
আরও পড়ুন
‘ভূত’পূর্ব প্রেম
পুনশ্চঃ ম্যাডাম গ্র্যান্ডের কী হল? ফ্রান্সিসের সঙ্গে ম্যাডাম গ্র্যান্ডের সম্পর্কও বেশিদিন টেকেনি। মিঃ গ্র্যান্ড ফ্রন্সিসের নামে যে কেস ঠুকেছিল, তাতে ফ্রান্সিস হেরে যান। তাতে অবশ্য বিশেষ ক্ষতি তাঁর হয়নি। ম্যাডাম গ্র্যান্ড কয়েক বছরের মধ্যেই ফ্রান্সে ফিরে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সংসার পাতলেন। মিঃ গ্র্যান্ড কয়েক বছর পর এক ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করে জীবনে সুখী হয়েছিলেন। হ্যাপি এন্ডিং।
সমাপ্ত
• ঋণস্বীকার- ভূতের ঘটনাটি পেয়েছি বারিদবরণ ঘোষের “আদিম কলকাতার ভূতের বাড়ি ও অন্যান্য” বই থেকে
• ইতিহাস খুঁজতে ঘাঁটাঘাঁটি করছি, Echoes from Old Calcutta- H.E. Bustedd, Calcutta old and new- H.B. Cotton।
• এছাড়া হেস্টিংস সাহেবের চিঠিপত্র, ফ্রান্সিস সাহেব, গ্র্যান্ড সাহেবের ডায়েরি এসব তো আছেই।
ছবি- লেখক