
আদিম কলকাতা এবং কিছু অদ্ভুতুড়ে প্রেমের গপ্প
ক’দিন ধরে সন্ধের পর থেকে একটু ঠান্ডা লাগছে। কিন্তু গরম জামা গায়েও রাখা যাচ্ছে না। এমন বসন্ত সন্ধেতে কী গল্প শোনাই বলুন তো? শীত এখনও যায়নি পুরো, ভূতের গপ্প চলতেই পারে। আবার এ বসন্তে প্রেমের গল্পও জমে বেশ। তাহলে এমন একটা গল্প শোনাই, যার বাইরের খোলকটা মুচমুচে ভূতের। ভিতরের পুরটা মশলাদার প্রেমের। সেকালের সাহেবি কলকাতার কেচ্ছা কাহিনি।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। বেশ শীত রাত্রে। ন্যাশনাল লাইব্রেরির এক দারোয়ান বেশ করে কম্বল জড়িয়ে তামাক টিপছিলেন। হঠাৎ কিছু লোকের পায়ের শব্দে উঠে দাঁড়ালেন। খুব আবছা কয়েকটি ছায়ামূর্তি একটি পালকি ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এযুগে এমন পালকি! দারোয়ান একটু চমকালেন। ‘কৌন হ্যায়’ বলে চেঁচিয়ে লন্ঠন তুলে ধরতেই লোক পালকি সব ভ্যানিশ! ভাবলেন চোখের ভুল। এর কিছুদিন পর। এক পূর্ণিমার রাত। সেদিনও ওই দারোয়ান পাহারায়। আবার শুনলেন ওরকম পায়ের শব্দ। কয়েকজন পালকি বাহক ধরাধরি করে একটা পালকি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবার দারোয়ান দৌড় লাগালেন পালকির পিছনে। কে আছেন ওই পালকির ভিতর? একটুকরো চাঁদের আলো চলকে পড়েছে পালকির ভিতর। তাতেই দারোয়ান যা দেখলেন তাতে দাঁত কপাটি লেগে গেল। একজন সাহেব মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পালকির ভিতর। যেন মৃত। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার পোশাক। দারোয়ানের চেঁচামেচিতে বাকি দারোয়ানরা হল্লা করতে করতে হাজির। ততক্ষণে বাহক সহ পাল্কি বেমালুম উবে গেছে।

ক্যাথরিন ও মিঃ গ্র্যান্ডের বিয়ের রেজিস্টার। এটি সংরক্ষিত আছে কলকাতার সেন্ট জন'স চার্চে।
কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিকে ঘিরে এই ভৌতিক ঘটনা একটা লোকশ্রুতি। কিন্তু যেকোনো ভৌতিক ঘটনার আড়ালেই তো চাপা থাকে ক্লেদাক্ত ইতিহাস, খুনোখুনি, আত্মহনন ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই ইতিহাসকে আশ্রয় করেই এসব ভূতের গল্পের জন্ম। কে ওই সাহেব? কি হয়েছিল তাঁর? ন্যাশনাল লাইব্রেরির এই ভৌতিক ঘটনার ইতিহাস ঘাঁটলে মেলে এক দুর্বার পরকীয়া। সেসব প্রায় দু’শো বছরের পুরোনো। সেবার ক্যাথরিন এলেন এ শহরে। বাপ ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে লাগলেন চন্দননগরে। বাবা ফরাসী ধনকুবের। ক্যাথরিন তখন সুইট সিক্সটিন। কথাটা একটুও বাড়িয়ে বলা নয়। ক্যাথরিনের যে দ্বিতীয় ছবিটি দেখছেন, দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি, ওটি যখন আঁকা তখন নাকি ক্যাথরিন বিগত যৌবনা। সুতরাং ষোড়শী ক্যাথরিন কেমন রূপসী ছিলেন সেটি সহজেই অনুমেয়। তন্বী, নীল চোখের সোনালী চুলের ক্যাথরিন চন্দননগর থেকে যখন আসলেন এ শহরে, সকল ইংরেজ পুরুষের হার্টথ্রব সে। রুলিং পার্টির ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে, অপজিশন পার্টির স্যার ফিলিপ ফ্রন্সিস ক্যাথরিনে মজলো সবাই। হেস্টিংস অবশ্য পড়েছেন বেকায়দায়। ক্যাথরিনকে মনে ধরলেও মুখে কিছু বলার জো নেই। হেস্টিং তখন এ শহরের সবচেয়ে সম্মানীয় পুরুষ। তাঁর মতো একজন একটা ছুড়ির পেছনে ফ্যা ফ্যা করছেন এ কেমন দেখায়? তাই তিনি রইলেন চুপ করে। চান্স পে ডান্স করলেন ফিলিপ ফ্রান্সিস। তিনিও তখন শহরের দ্বিতীয় ক্ষমতাবান পুরুষ।
হেস্টিংসের ঠিক পরেই। তা ওনার ওত চক্ষু লজ্জা নেই। ক্যাথরিনের মন পেতে ফ্রান্সিসের কত না চেষ্টা! নিচে যে পুরুষটির ছবি দেখছেন উনিই ফিলিপ ফ্রান্সিস। এই ছবিটি যখন আঁকা তখন তিনি কাকু হয়ে গেছেন। কিন্তু কাঁচা বয়সে ফ্রান্সিস বেশ সুপুরুষ ছিলেন। মেয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করতেও তাঁর জুড়ি নেই, একথা বলছেন ফ্রান্সিসের এক বন্ধু। ক্যাথরিন বহু পুরুষ সঙ্গে গোল্লায় যাচ্ছিল। ক্যাথরিনের বাপ ভাবল, যদি বিয়ে টিয়ে দিয়ে সংসারী করে মেয়েকে শুধরানো যায়। ক্যাথরিন অবশ্য শুধরোবার মেয়েই নন। প্রথম দিকে ক্যাথরিন ফ্রান্সিসকে পাত্তা দিতেন না। এক পার্টিতে ক্যাথরিনের সঙ্গে আলাপ হল মিঃ গ্র্যান্ডের। বড়ো নরম মনের মানুষ তিনি। সব পুরুষের মতো তিনিও মজলেন ক্যাথরিনে। দুম করে ক্যাথরিনকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। ক্যাথরিনও বিশেষ আপত্তি করলেন না। সবাই অবাক। ক্যাথরিনের মনে তখন কী চলছিল কে জানে! ক্যাথরিনের বাবা দেখলেন এই তো মওকা। ছেলে বেশ ভদ্র। চাকরিও করে মোটামুটি একটা। ব্যাস, মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ে হল চন্দননগরের চার্চে। তবে বিয়ের খাতায় কলমে রেকর্ড খুঁজতে আপনাকে যেতে হবে কলকাতার সেন্ট জন চার্চ। ১৭৭৭ সালের ১০ই জুলাইয়ের রেকর্ড খুলে দেখুন, মিঃ গ্র্যান্ড আর ক্যাথরিনের বিয়ের খবর পাবেন। ক্যাথরিন হলেন ম্যাডাম গ্র্যান্ড। মিঃ গ্র্যান্ড পত্নীকে চোখে হারান। তাঁর মতো এক ছাপোষা সাদাসিধে পুরুষের কপালে এমন ডাকসাইটে সুন্দরী পত্নী জুটবে এ তার কল্পনার অতীত। ক্যাথরিনের এই বিয়েতে ফ্রান্সিসের কিছু এসে যায় না। তিনি ক্যাথরিনের পেছনে পড়েই রইলেন। এক সন্ধেয় বল পার্টির আয়োজন করলেন ফ্রান্সিস। বল পার্টি মানে, খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে মেম সাহেবদের জাপ্টে ধরে নাচা গানা সব চলবে। কেউ আপত্তি করবে না। শহরের গন্যমান্য সাহেবরা আমন্ত্রিত। গ্র্যান্ড দম্পতিরও নেমন্তন্ন রইল। সেই পার্টিতেই বাজিমাত করলেন ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিসের উপর মন পড়ল ক্যাথরিনের থুড়ি মিসেস গ্র্যান্ডের। ফ্রান্সিস তার প্রেমে হাবুডুবু। দুজনে ডুবে ডুবে জল খেতে থাকলেন মিঃ গ্র্যান্ডের অজান্তেই। মিঃ গ্র্যান্ড শহরে না থাকলে ফ্রান্সিস টুক করে চলে যান ক্যাথরিনের সঙ্গে দেখা করতে। সুযোগ পেলে ক্যাথরিনকে নিয়ে যান বাগান বাড়ি। তারপর, বাকিটা ব্যক্তিগত। শহরে তাঁদের এই সম্পর্ক নিয়ে তখন কানাঘুষো। মিঃ গ্র্যান্ডের কানেও গেল সেসব কথা। কিন্তু তিনি অন্ধ পত্নী প্রেমিক। তিনি এসব গুজব বলে উড়িয়ে দিলেন। কি নিদারুণ বিশ্বাসে লিখেছেন সেসব দিনের কথা- “এমন পত্নী পেয়ে আমি পৃথিবীর সবথেকে সুখী পুরুষ”। তাঁর এই বিশ্বাস ভাঙল এক রাতে। এক ডিসেম্বরের রাত।
(ক্রমশ…)

চার্চের চ্যাপলেনদের তালিকা। এই তালিকায় উনত্রিশ নম্বর যিনি, তিনিই ওঁদের বিয়ে দিয়েছিলেন।
• ঋণস্বীকার- ভূতের ঘটনাটি পেয়েছি বারিদবরণ ঘোষের আদিম কলকাতার ভূতের বাড়ি ও অন্যান্য বই থেকে
• ইতিহাস খুঁজতে ঘাঁটাঘাঁটি করেছি- Echoes from old Calcutta- H.E. Bustedd, Calcutta old and new- H.B. Cotton।
• এছাড়া হেস্টিংস সাহেবের চিঠিপত্র, ফ্রান্সিস সাহেব, গ্র্যান্ড সাহেবের ডায়েরি এসব তো আছেই।
ছবি- লেখক
