বাংলার মেয়েদের বন্দীত্ব ঘোচাতে নিয়মের দেওয়ালে হাতুড়ি পেটাতে শুরু করেছিলেন কৃষ্ণভাবিনী

কৃষ্ণভাবিনী জন্মেছিলেন আধুনিকতার হাওয়া-লাগা কলকাতা থেকে অনেক দূরে

আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস এখন শুধুই 'নারী দিবস'।  মেয়েদের জন্য একটা গোটা দিন। খুব ভালো ব্যাপার। অথচ, যেসব মহিলারা প্রকৃত অর্থে বন্দীত্ব ঘোচাতে নিয়মের দেওয়ালে হাতুড়ি পেটাতে শুরু করেছিলেন, তাঁরা এই 'গালভরা' দিনটি দেখে যেতে পারেননি। বাংলার মেয়ে কৃষ্ণভাবিনী দাস তাঁদেরই একজন।

কৃষ্ণভাবিনী জন্মেছিলেন আধুনিকতার হাওয়া-লাগা কলকাতা থেকে অনেক দূরে মুর্শিদাবাদের চোয়া গ্রামে। তাঁর জন্ম সাল সঠিকভাবে জানা যায় না, তবে যতদূর জানা যায়, তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৮৬৪ সালে। আমরা জানি, সেকালের গ্রামে স্ত্রীশিক্ষা ছিল নৈব নৈব চ। তা সত্ত্বেও, লেখাপড়া শেখায় তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল। কারণ, কৃষ্ণভাবিনী ছিলেন শিক্ষিত এবং ব্যতিক্রমী পিতার একমাত্র আদুরে কন্যে। সেই সময়ের নিরিখে এক্ষেত্রে তাঁকে 'প্রিভিলেজড্' বলাই সমীচীন। তিনি লেখাপড়ার সুযোগ পান কৈলাসবাসিনী দেবী, নিস্তারিণী দেবী, কুমুদিনী, ব্রহ্মময়ী, মনোরমা মজুমদার, রাজকুমারী দেবী অথবা জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর মতো – বিবাহসূত্রে। তখন যা হতো, ৯ বছর বয়সেই বিয়ে। খেলনাবাটি ছেড়ে কড়াই-খুন্তির সংসারে প্রবেশ। স্বামীর আগ্রহেই তিনি লেখাপড়া শিখতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত এতটাই শিখেছিলেন যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

কৃষ্ণভাবিনীর স্বামী দেবেন্দ্রনাথ দাস কলকাতার উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভালো ছাত্র ছিলেন। বিএ পাশ করার পর সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মনমোহন ঘোষ, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিলেতে যান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য। জ্ঞানের উৎপত্তি, বিশেষ করে ভাষা শিক্ষার প্রতি, তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। সে কারণেই হয়তো কৃষ্ণভাবিনীর জীবনধারা,' সামাজিক মনোভাব, ব্যাপকভাবে পাল্টে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। স্ত্রী শিক্ষা ও স্ত্রী স্বাধীনতার প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। বস্তুত, লোকাচার অগ্রাহ্য করে বিলেত যাওয়ার দরুন দেবেন্দ্রনাথের পরিবার নাকি জাতিচ্যুত হয়েছিল এবং সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য তাঁর বাবাকে নাকি দেখাতে হয়েছিল, ছেলেকে তিনি ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। এই বিরোধিতার মুখে আত্মীয়দের অনুমতি ছাড়াই দেবেন্দ্রনাথ স্ত্রীকে নিয়ে বিলেত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার সময় কৃষ্ণভাবিনী তার ছ'বছরের সন্তানকে শাশুড়ির কাছে রেখে যান। গোবিন্দচন্দ্র দত্তের স্ত্রী এবং মেয়েরা – রাজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমাঙ্গিনী দেবী, স্বর্ণলতা ঘোষ এবং জ্ঞানদানন্দিনী দেবী – লোকাচার ভাঙার প্রাথমিক কাজটা সেরে রেখেছিলেন বলে কৃষ্ণভাবিনীর বিলেত যাওয়ার পথ কিছুটা হলেও সুগম ছিল।

কৃষ্ণভাবিনী’র ‘ইংল্যান্ডে বঙ্গমহিলা’

২৫ বছর বয়সে ইংল্যান্ড যাওয়ার এবং সেখানে বাস করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি যে বইটি (ইংল্যান্ডে বঙ্গমহিলা, ১৮৮৫ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত) লেখেন, তার ভূমিকায় দেখা যায়, খাঁচার বাইরে যাওয়ার আগ্রহ তাঁর কতটা প্রবল ছিল:

‘পাঠিকাগণ! আমিও আপনাদের মত একটি বাড়িতে বদ্ধ ছিলাম; দেশের, পৃথিবীর কোন বিষয়ের সহিত সম্পর্ক ছিল না; সামান্য গুটিকতক জিনিসে মনকে সন্তুষ্ট রাখিতে চেষ্টা করিতাম কিন্তু পারিতাম না। দেশের সমস্ত ব্যাপার উত্তমরূপে জানিবার নিমিত্ত লালায়িত হইতাম এবং কেহ বিলাত যাইতেছেন কিংবা কেহ বিলাত হইতে ফিরিয়া আসিতেছেন শুনিলেই মন নাচিয়া উঠিত। বিদেশ হইতে প্রত্যাগত ব্যক্তিদের নিকট বিদেশ সম্বন্ধীয় নানা প্রকার নূতন বিষয় শুনিবার জন্য ব্যস্ত হইতাম; কিন্তু দুর্ভাগ্য পরাধীনা বঙ্গবাসিনীদের মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয় না; সুতরাং চুপ করিয়া থাকিতাম।’

চুপ করে অবশ্য তিনি থাকেননি চিরকাল।তিনি আরও লিখলেন, ‘কথায় বলে যে ক্রীতদাস পর্যন্ত ইংল্যান্ডের মাটিতে পা দিলে তৎক্ষণাৎ স্বাধীন হইয়া যায়; আমি নিজেও দেখিতেছি যে যতদিন হইতে ইংল্যান্ডের স্বাধীন বায়ু সেবন করিতেছি, ততদিন হইতে আমার মনে এক নূতন ভাবের উদয় হইয়াছে… পুস্তকে নানা দেশের বিষয় পড়িতাম — এ দেশ স্বাধীন, ও দেশ পরাধীন, এ দেশের শাসন প্রণালী যথেচ্ছাচার, ও দেশের রাজ্য ব্যবস্থা,  নিয়মতন্ত্র এরূপ কত পড়িতাম, একরকম করিয়া কথার মানে বুঝিতাম কিন্তু ঐ কথাগুলি যে কত ভাব প্রকাশ করিতেছে, গূঢ় বিষয় সূচনা করিতেছে, তা কখনোই আমার হৃদয়ঙ্গম হইত না।’

নিজের সম্পর্কে কৃষ্ণভাবিনীর বিশ্লেষণ যথার্থই। লজ্জাকাতর, অন্তঃপুরের সংকুচিতা, অল্প শিক্ষিত নারী হিসেবে বিলেত যাওয়ার অল্পকালের মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিত্বে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তখনও পর্যন্ত বাংলা ভাষায় কোনও বাঙালি মহিলার দ্বারা রচিত এমন বিস্তৃত ভ্রমণকাহিনী আর প্রকাশিত হয়নি। সেকালে ইংরেজ মহিলাদের মধ্যে নারী মুক্তির আন্দোলন চলছিল, তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি তার সঙ্গে বাঙালি পাঠকসমাজের পরিচয় করিয়ে দেন এবং বাঙালি মহিলাদের জন্য একই ধরনের অগ্রগতির কথা বলেন। কৃষ্ণভাবিনীর প্রধান লক্ষ্যই ছিল স্বদেশের নারীদের হীন দশা থেকে টেনে তোলা। 'ইংল্যান্ডে বঙ্গ মহিলা'-য় তিনি তাঁর রচনার মাধ্যমে সংক্ষেপে মেরি কার্পেন্টার, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, লেডি বেকার এবং লেডি ব্যসির সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর 'ইংরেজ মহিলার শিক্ষা ও স্বাধীনতার গতি', 'স্ত্রীলোক ও পুরুষ', 'সংসারে নারীর ক্ষমতা', ‘ভারতী ও বালক’ প্রভৃতি প্রবন্ধে তিনি নারীমুক্তি আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করেন। মেয়েদের স্বাধীনতার জন্য  দেশবাসীর কাছে আবেদন জানান:

'ভারতবর্ষীয় পুরুষ'রা স্ত্রীলোকদের স্বাধীনতা দিতে ভয় পান। কারণ স্ত্রীরা বহুকাল অবধি পরাধীন থাকাতে তাঁহাদের মন এত দুর্বল এবং তেজহীন হইয়া পড়িয়াছে যে স্বাধীন হইলে নিজেদের শাসন করিতে পারেন না। অবশ্য ইহা অনেকটা সত্য; কেহ অনেক বৎসর অধীন অবস্থায় থাকিয়া সহসা স্বাধীন হইলে নিজেদের শাসন করিতে অথবা স্বাধীনতা বজায় রাখিতে পারে না। কিন্তু এক সময় না এক সময় সকলকে শিখিতে হয়, শিশু একবারে চলিতে শিখে না। আমাদের স্ত্রীদের বর্তমান অবস্থা এইরূপ, তাঁহারা এত হীন দুর্বল অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছেন যে পুরুষেরা তাঁহাদের আদর করিয়া ধরিয়া না তুলিলে তাঁহাদের অবস্থার কোন উন্নতি হইবে না এবং অল্প অল্প করিয়া তাঁহাদিগকে স্বাধীনতার পথে প্রবর্তিত না করিলে তাঁহারা কখনোই নিজেদের শাসন করিবেন না বা স্বাধীন হইয়া বেড়াইতে পারিবেন না।'

বাংলার মেয়েদের আহ্বান জানান কবিতার ভাষায়

মেয়েদের পুরুষের সহযোগিনী, সহকর্মিণী ভাবার মত মনোভাব তখনও বাঙালি সমাজে জন্ম নেয়নি। তাঁর রচনা বিশ্লেষণ করলে এই পরিবর্তিত মূল্যবোধ এবং মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। সাধারণ শিক্ষিত এবং পর্দানশীন হলেও ইংল্যান্ডে যাওয়ার অল্পকালের মধ্যেই তিনি তাঁর জ্ঞানের পরিধি বিস্তার করেন এবং জীবনযাত্রায়ও বৈদগ্ধ্য নিয়ে আসেন। সেখানে থাকার সময়ে লিখতে আরম্ভ করেন এবং তার মধ্য দিয়েই তাঁর এই পরিবর্তিত ব্যক্তিত্বের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু লেখিকা নয়, কৃষ্ণভাবিনীকে সমাজকর্মী হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে ‘অক্সফোর্ড ডিএনবি’-তে। ২০০৪ সালে বইয়ের আকারে এবং অনলাইনে প্রথম প্রকাশিত হয় এই অভিধান। তার পর থেকে প্রতি বছর জানুয়ারি, মে এবং সেপ্টেম্বর মাসে নতুন জীবনী জুড়ে আপডেট করা হয় অভিধানটি। কৃষ্ণভাবিনীর রচনার বক্তব্যের পেছনে যে মনোভাবটি কাজ করত তা হলো, আন্দোলনের মাধ্যমেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, কান্না অথবা অনুনয় দিয়ে নয়। আর এর মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার প্রথম প্রগতিবাদী নারী।

গ্রন্থ সহায়তাঃ

নারীপ্রগতির একশো বছর: রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া, গোলাম মুরশিদ

Developed by DXDasia