সত্তর বছর ধরে চমচমের খ্যাতি বজায় রেখেছে বেলাকোবা

উত্তরবঙ্গে ঘুরতে এসে অনেক মানুষ এখনও খোঁজ করেন এই চমচমের

মিষ্টি বলতেই বাঙালির মনটা কেমন চনমনে হয়ে যায়। আর তার ওপর যদি বলা হয় বেলাকোবা-র এর চমচমের কথা, তাহলে তো কথাই নেই! উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়িতে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ এই চমচম। এই চমচমের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। আমেরিকা, লন্ডন, সিঙ্গাপুর সহ অনেক জায়গাতেই রপ্তানি করা হয় এই চমচম।

বেলাকোবা-র চমচমের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। কবে থেকে এই অঞ্চল চমচমের জন্য বিখ্যাত হল এই নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। তবে লোকমুখে প্রচলিত আছে ১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হয় সেই সময় পূর্ব বঙ্গের ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল থেকে দুই বন্ধু কালিদাস দত্ত এবং ধীরেন সরকার বেলাকোবায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমের খ্যাতি তখন জগৎজোড়া। এই দুই বন্ধুই নাকি টাঙ্গাইল থেকে চমচম তৈরি করা শিখে আসেন। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়েই শুরু হয় বেলাকোবায় চমচম তৈরির কাজ। তাঁরা প্রথমে এই চমচম চা বাগানে ফেরি করে বেড়াতেন। ধীরে ধীরে এর খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেই দুই বন্ধু কালিদাস দত্ত বা ধীরেন সরকারের কেউ আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বোধন দত্ত বা উদয় দেসরকাররা আজও সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।

এই চমচম তৈরি হয় সম্পূর্ণ ছানা দিয়ে। তার সঙ্গে ব্যবহার হয় দুধ, চিনি, সামান্য ময়দা। বেলাকোবা-র চমচমের বিশেষত্ব হল, এই চমচমে কড়াপাকের মিষ্টির ওপর ক্ষীর ছড়ানো। চমচমের ভিতরটা রসালো ও নরম। একটু লালচে ধরনের চমচম। একসময় ৫০ পয়সা বা এক টাকাতেও পাওয়া যেত তা। আজ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর দামের অনেক হেরফের হয়েছে। প্রয়াত কালিদাস দত্তের ছেলে বোধন দত্ত জানালেন, তাঁর কাছে এখন কুড়ি টাকা ও দশ টাকা দামের চমচম পাওয়া যায়। তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে এই চমচম তৈরির কাজ শিখেছেন। তবে লালচে ভাবের চমচমের সঙ্গে তাঁরা সাদা চমচমও তৈরি করছেন।

এই চমচম তৈরি করতে ব্যবহার করা হয় খাঁটি গরুর দুধ। কুড়ি টাকা দামের চমচমের ভিতরে কিছু মৌচাকের মতো কড়া মিষ্টি থাকে। বোধনবাবু জানান, প্রতিদিন তিনশোর বেশি দশ ও কুড়ি টাকার চমচম তৈরি করা হয়। তবে কেউ অর্ডার দিলে ত্রিশ টাকা বা চল্লিশ টাকা দামেরও চমচম তিনি তৈরি করেন। কালিদাস দত্ত বা ধিরেন সরকারের ছেলেরা ছাড়াও প্রতুল পাল, গোপাল রাহা সহ মোট সাত জন বেলাকোবায় এই চমচম তৈরি করতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা দেবাশিস মিত্র বলেন, তাদের কাছে গর্ব এই চমচম।

রাজ্য সরকার গাজোলডোবায় বিরাট পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করছে। বেলাকোবার পাশেই গাজোলডোবা। বেলাকোবা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে শিকারপুর চা বাগানে ঐতিহাসিক ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর মন্দির। আবার বেলাকোবা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে সতীর একান্ন পীঠের একটি মা ভ্রামরী দেবীর মন্দির। সেই সব স্থানে পর্যটকরা এলে বেলাকোবা প্রবেশের সময় সেখানকার চমচমের খোঁজ করেন। ফলে এখানকার চমচমের ব্র্যান্ডিং হওয়া উচিৎ – এমন দাবি তুলছেন অনেকেই।

Developed by DXDasia