সামনেই বড়োদিন, তার আগে বিশ্বস্ত কেক-পেস্ট্রির খোঁজ
এক ঝুড়ি সম্ভাবনা নিয়ে আসছে বড়োদিন। আসছে কেকের গন্ধে… ক্যারলের ছন্দে। আর বড়োদিন মানেই কেক, ক্যারলের সুরে মেতে ওঠা। গোটা পৃথিবীর সঙ্গে কলকাতা শহরও মেতে ওঠে কেক ক্যারলের উৎসবে। সব সমস্যা দূরে সরিয়ে রেখে আনন্দে বুঁদ হয়ে ওঠা। বড়োদিনের কলকাতা যেন আলো আর তারায় তারায় খচিত আকাশ। পার্ক স্ট্রিট (Park Street) সেজে ওঠে যেন রানির বেশে। সেন্ট পল ক্যাথিড্রাল থেকে বো-ব্যারাক সর্বত্রই আনন্দের হিড়িক। আর কেক… ঘরে ঘরে কেক, থরে থরে কেক। চারিদিক যেন ম-ম করে কেকের মিষ্টি গন্ধে, সান্তা ক্লজ়-এর উপহারের আনন্দে আর ক্যারলের ছন্দে। এই তো বড়োদিন। আর কেকের কথা যখন উঠলই তখন বেকারিগুলোতে তো ঢুঁ মারতেই হয়। পুরোনো বেকারি হলে তো কথাই নেই, কারণ সেই সব বেকারির গায়ে লেগে আছে প্রাচীনতার গন্ধ। সেই সব জায়গায় শুরু হয়ে গেছে কেক তৈরির প্রস্তুতি। পেস্ট্রি, কুকিজের পাশাপাশি এই সব বেকারিগুলো বানিয়ে বসে আছে কেক নিয়ে। কেকের গায়ে লেগেছে সেকেলের পাশাপাশি নতুনত্বের ছোঁয়া। চকোলেট কেক, প্লাম কেক, ফ্রুট কেক- সর্বকালেই পছন্দ সবার। কেকের কথা যখন উঠলই তখন ঘুরে আসা যাক মোমিনপুর। কেন? ইতিহাস গায়ে মেখে কেক বানিয়ে চলেছে তারা। এবারও বড়োদিনের জন্য তৈরি তারা।
সেন্ট পল ক্যাথিড্রাল থেকে বো-ব্যারাক সর্বত্রই আনন্দের হিড়িক। আর কেক… ঘরে ঘরে কেক, থরে থরে কেক। চারিদিক যেন ম-ম করে কেকের মিষ্টি গন্ধে, সান্তা ক্লজ়-এর উপহারের আনন্দে আর ক্যারলের ছন্দে। এই তো বড়োদিন। আর কেকের কথা যখন উঠলই তখন বেকারিগুলোতে তো ঢুঁ মারতেই হয়।

কে আলি বেকারি
মোমিনপুর রোডের কে আলি বেকারি ১১০ বছরের প্রতিষ্ঠান৷ বর্তমান মালিকের বাবার হাতে গড়া৷ আধুনিকতার কোনও ছাপ পড়েনি৷ এঁদের সন্ধ্যার চমক- জার্মান ব্রেড৷ ফি সন্ধ্যায় কেবল মাত্র দু’ ঘন্টায় চব্বিশ পাউন্ড জার্মান ব্রেড পাওয়া যায়৷ এই নামের উত্পত্তি নিয়ে বর্তমান কর্ণধার তেমন কিছু মনে করতে না পারলেও, তাঁর বাবার কাছে শোনা কথা জানালেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, কলকাতায় ব্ল্যাক আউটের সময়, খুব অল্প সময়ের জন্য ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ব্রেডের আদলে তৈরি জার্মান ব্রেড পাওয়া যেত৷ এই রুটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিল৷ জার্মান ব্রেডের প্রধান বৈশিষ্ট্য- উপরটা শক্ত, আর মধ্যের ভাগ নরম৷ আদতে পাউরুটি হলেও জার্মান ব্রেডের স্বাদ স্বতন্ত্র৷ যন্ত্রের কৃত্রিমতা ছাড়া, বেকারির অকৃত্রিম গন্ধে ভরা জার্মান ব্রেড খানা-ই-খিদিরপুরের সন্ধ্যাকালীন জলখাবার৷ বাখরখানি, নান খাটাই বা জার্মান ব্রেড, এই দ্রব্যমুল্যের বাজারেও বেশ সস্তা খাবার৷ খানা-ই-খিদিরপুরের আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া বাসিন্দাদের কাছে এর বিকল্প বেছে নেওয়া কষ্টকর৷ প্যাকেজিং প্রতিযোগিতায় ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এই সুস্বাদু খাবারগুলো৷ অন্যদিকে, এ সব খাবার প্রস্তুতকারকরা, অনেকেই দু-তিন প্রজন্ম ধরে এই সব পেশায় জড়িত, তাঁরাও ক্রমশ রুটি-রুজি হারাচ্ছেন৷
বিশ্ব হেরিটেজ সপ্তাহে ‘পুরোনো কলকাতার গল্প’ সোসাইটি এই পুরোনো বেকারিকে সম্মানিত করে। মালিকের হাতে তুলে দেয় সাম্মানিক মানপত্র, স্মারক, ঘড়ি এবং পাঁচহাজার টাকা। বর্তমান মালিক জানান, তাঁরা পুরোনো ট্র্যাডিশন ধরে রেখেছেন। এখনও প্রতি সন্ধ্যায় ২০ পাউন্ড ব্রেড বেক করেন। আর তা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে শেষ। কেক, পুডিং, সুফলে পেস্ট্রির মতো খাবার এখন আমাদের প্রাণের কাছাকাছি চলে এসেছে। আর শতাব্দী প্রাচীন বিভিন্ন বেকারি বছরের পর বছর জোগান দিয়ে চলেছে এই সব খাবার।
আরও পড়ুন: স্বদেশি আন্দোলন ও বাঙালির বেকারি তৈরির গল্প

ফ্লুরিজ
কলকাতার বেকারির কথা বললে ফ্লুরিজের নাম না উচ্চারণ করলেই নয়। বলা যায়, এই শহরের আবেগের অনেকখানি প্রায় এক শতাব্দী ধরে ফ্লুরিজের মধ্যে আজও বর্তমান। ১৯২৭ সালে কলকাতায় এই বেকারির পথচলা শুরু হয়। সুস্বাদু পেস্ট্রি, ফ্রুট কেক, বিভিন্ন কুকিজ, ইতালীয়, মহাদেশীয় এবং ইউরোপীয় নানা মুখোরোচক স্ন্যাকস পাওয়া যায় এখানে। বড়োদিনের সময়ে পার্ক স্ট্রিটে ফ্লুরিজের মূল কেন্দ্রে ভিড় সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান কর্মীরা। এখানকার প্লাম কেক সারা দেশে বিখ্যাত। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

নাহুম অ্যান্ড সন্স
বেকারিটি ১৯০২ সালে একজন বাগদাদী ইহুদি নাহৌম ইসরায়েল মোর্দেকাই দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইসরায়েল তাঁর বেকারির ব্যবসা শুরু করেন বাড়ি বাড়ি খাবার বিক্রির মাধ্যমে। এবং তাঁর মিষ্টি খাবার সেই সময় ঔপনিবেশিক শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিভিন্ন পাউরুটি, হার্ট কেক, ভ্যানিলা আর চকোলেট কেক, ব্রাউনি, ক্লাসিক ফ্রুট কেক, লেবুর টার্টস বা তাজা বেকড কুকিস এখানকার বিশেষত্ব। আজও কলকাতায় বহু দূর থেকে এখানে খাবারের খোঁজে আসেন বহু মানুষ। আর বড়োদিন হলে তো কথাই নেই!
আরও পড়ুন: বড়দিনের কেক এবার রামধনু সাজে

হায়াত রিজেন্সির বেকারি
সুস্বাদু চকোলেট, কুকিজ এবং আরও নানা ধরনের কেক বা পেস্ট্রি হল হায়াত রিজেন্সির ‘দ্য বেকারি’র বিশেষত্ব। অনেকেই একে কলকাতার সেরা বেকারির মর্যাদা দিয়েছেন। অভিজাত হোটেল হলেও এখানে পছন্দের খাবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখে দেখতে পারেন। এমনকি কেক, পেস্ট্রি, কুকিস এবং আরও নানা খাবার নিয়ে যেতে পারেন উপযুক্ত মূল্যে। এখানে পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়। বেকারির সব উপকরণ নিয়মিত জীবানুমুক্ত করা হয়।
সারা বছর জন্মদিন কিংবা বিবাহবার্ষিকীতে ক্রিম কেকের বেশি কদর হলেও বড়োদিনের মরসুমে কিন্তু ফ্রুট কেক আর প্লাম কেকের চল বেশি। আর সেই কেকের প্রস্তুতি পর্বে পাশ্চাত্যে বিরাট উৎসব পালন করা হয়। বিশ্বয়ানের পর প্রাচ্য পাশ্চাত্যে তেমন আর ভেদ নেই।

সালদনহা
এই বেকারিটি ১৯৩০ সালে উবেলিনা সালদানহা এবং তাঁর স্বামী ইগানাশিয়াস শুরু করেছিলেন। সেই সময় নাকি পুরো কলকাতা শহর জুড়ে উপহার পাঠানো হয়েছিল। এই বেকারির প্লাম কেক আজও শহরবাসীর খুব প্রিয়। এছাড়াও এখানকার রাম বল, ডার্ক চকোলেট ব্রাউনি, ফ্রেঞ্চ ম্যাকারন, চিজ পাফ, ওয়ালনাট কেক প্রভৃতি সারা শহরে বিখ্যাত। এখানকার ফ্রুট কেকের রেসিপি নাকি স্বয়ং উবেলিনা সালদানহা নিজে আবিষ্কার করেছিলেন। উৎসব অনুষ্ঠানে শহরের নানা প্রান্ত থেকে অখানে অর্ডার আসে। অতিমারীর পরে শোনা গেছিল, এটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে কলকাতার বুকে এখনও চলছে রমরমিয়ে।
বড়োদিন মানেই বাড়িতে বাড়িতে কেকের গন্ধ। সারা বছর জন্মদিন কিংবা বিবাহবার্ষিকীতে ক্রিম কেকের বেশি কদর হলেও বড়োদিনের মরসুমে কিন্তু ফ্রুট কেক আর প্লাম কেকের চল বেশি। আর সেই কেকের প্রস্তুতি পর্বে পাশ্চাত্যে বিরাট উৎসব পালন করা হয়। বিশ্বয়ানের পর প্রাচ্য পাশ্চাত্যে তেমন আর ভেদ নেই। সংস্কৃতির নানা ধারা একে অন্যের সঙ্গে মিশেমিশে একাকার। তাই কেক পার্বন তো এখন আমাদের নিজেদের উৎসব। তৈরি সেন্ট পল ক্যাথিড্রাল, পার্ক স্ট্রিট আর বো-ব্যারাক।
____
কৃতজ্ঞতা- আনন্দবাজার পত্রিকা, Times Of India