বাঁশবেড়িয়ার প্রাচীন হংসেশ্বরী মন্দির

২০৪ বছরের প্রাচীন এই মন্দির দেখতে আজও ছুটে আসেন অনেকে

হংসেশ্বরী কালী মন্দির সংলগ্ন অপূর্ব পোড়ামাটির কাজ সমৃদ্ধ মন্দিরটি ‘অনন্ত বাসুদেব’ মন্দির। ১৬৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন রামেশ্বর দত্তরায়। অনন্ত বাসুদেব মন্দিরটি হংসেশ্বরী মন্দিরের বেশ কিছু বছর আগেকার।

রামেশ্বর দত্তরায়ের আদি বাড়ি বর্ধমান অন্তর্গত পাটুলিতে। পরবর্তীকালে বংশবাটীতে(বর্তমান নামানুসারে বাঁশবেড়িয়া) রাজধানী স্থাপন করেন।

রামেশ্বরের পুত্র রঘুদেব, রঘুদেবের পুত্র গোবিন্দদেব, গোবিন্দদেব আর হংসেশ্বরী দেবীর পুত্র নৃসিংহদেব। এই হংসেশ্বরী দেবীর নামেই বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির। নৃসিংহদেবই হংসেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠারম্ভ করেন।

গোবিন্দদেব মারা যাবার তিন মাস পর জন্ম হয় নৃসিংহদেবের। নিজ পিতৃসম্পত্তি উদ্ধারের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন রাজা নৃসিংহদেব তাঁর মা হংসেশ্বরী দেবীর কাছে। তাই ১৭৯২ খ্রীষ্টাব্দে নৃসিংহদেব পিতৃসম্পত্তি উদ্ধারের জন্যে অর্থ উপার্জনের হেতু কাশী যাত্রা করেন। রাজ্য ত্যাগের সময় তিনি চার লক্ষ টাকা রেখে যান ও নির্দেশ দিয়ে যান, যেদিন ওই অর্থ সাত লক্ষ হবে, সেই দিন ওনাকে খবর দিতে। যদিও খবর দেওয়া হলেও আর পিতৃসম্পত্তি উদ্ধার হল না নৃসিংহদেবের(প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য রাজকোষে সাত লক্ষ টাকা জমানোর জন্যে নৃসিংহদেবের বড় রানি মহামায়া মহারাজকে না জানিয়ে নিজের গহনা পর্যন্ত বিসর্জন দেন)। কোনো এক ছোট ঘটনা কখন এবং কীভাবে একজন মানুষের জীবনের অমূল পরিবর্তন করতে পারে সেটা সম্ভবত কেউই বলতে পারে না। তেমনই ইতিমধ্যে নৃসিংহদেবের জীবনের অন্তররাজ্যে এক অমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। কাশীতে থাকাকালীন একদিন রাতে মাতৃরূপে দৈব দর্শন হল রাজা নৃসিংহদেবের। তিনি তাঁর মা হংসেশ্বরী দেবীকে দেখলেন এক জগজ্জননী মাতৃরূপে। পরের দিনই তিনি স্থির করলেন, রাজকোষে জমা টাকা দিয়ে তিনি আর কিছু না, বংশবাটীতে একটি মন্দির তৈরি করবেন, এক মাতৃমন্দির, মা হংসেশ্বরী দেবীর মন্দির।

সংসার তো ত্যাগ করেছিলেন অনেক দিন আগেই, এখন তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। জীবনের লক্ষ্য পাল্টে যায় তাঁর। ১৭৯৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ফিরলেন কাশী থেকে। ক্রয় করে আনলেন সাত নৌকা চুনা-পাথর, মন্দির তৈরির জন্যে। উত্তরখণ্ড থেকে আনা হয় প্রস্তর শিল্পী। কিন্তু ১৮০২ খ্রীষ্টাব্দে মন্দির অসমাপ্ত রেখেই এই ভবলীলা সাঙ্গ করে বিদায় নেন সন্ন্যাসী নৃসিংহদেব।

হংসেশ্বরী মন্দিরটি তৈরিতে নৃসিংহদেবের থেকে অনেক বেশি ভূমিকা ছিল তাঁর ছোটরানি শঙ্করী দেবীর। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শঙ্করী দেবী বহু বাধা, বহু প্রতিবন্ধকতার সাথে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করেন। এমনকি নৃসিংহদেবের এক পালিত পুত্র কৈলাসদেবের সাথে জমি জমা সংক্রান্ত মামলায় পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু শঙ্করী দেবীর জীবনের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, ওনার স্বামীর স্বপ্ন সম্পূর্ণ করা। অবশেষে ১৮১৪ খ্রীষ্টাব্দে সমাপ্ত করেন হংসেশ্বরী মন্দির নির্মাণ।

মন্দিরসংলগ্ন প্রস্তরফলকে এই শ্লোকটি লিখিত আছে – “শাকাব্দে রসবাহমৈত্রগণিতে লীমন্দিরং মন্দিরং। মোক্ষদ্বারচ্যুদশেখরসমং হংসেশ্বরীর জন্তং। ভূপালেন নৃসিংহদেবকৃতিনরকং তদাঞ্জামুগা। তৎপত্নী গু কুপাদপদ্মনিরন্ত শ্ৰীশঙ্করী নিৰ্ম্মমে।” ইম্পিরিয়াল গেজেটিয়ার প্রভৃতি সরকারি বহু পুস্তকে এই মন্দিরের উল্লেখ আছে। এটির স্থাপত্য পরিদর্শনের জন্য বহু শিল্পী বাঁশবেড়িয়ায় আসেন।

শোনা যায়, মন্দির তৈরির পাথর আনা হয়েছিল চুনার থেকে। আর রাজস্থানের জয়পুর থেকে কারিগরদের আনা হয়েছিল। ২১ মিটার মিনারের রূপো আনা হয়েছিল। ২১ মিটার মিনারে রূপ যেন একটি ফোটা পদ্মফুল। মন্দিরের মূল চূড়ার শীর্ষে সহস্রদ্বারে রয়েছেন পরম পুরুষ শ্বেতবর্মধারী মহাদেব আর সভাগৃহের মূলধারে কুলকুন্ডলিনী শক্তিরূপ হংসেশ্বরী।

২০১৭ সালের রথে স্নানযাত্রার দিন ২০৪ বছরে পড়েছে এই মন্দিরের পুজো। এই পুজোর বৈশিষ্ট্য হল, পুজোর দিন মা হংসেশ্বরীর মুখে মা কালীর একটি মুখোশ পরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও পুজোর পরের দিন সেই মুখোশ খুলে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ম মেনেই চলে আসছে মায়ের পুজো, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

(ঋণ – দেবভাষ্য.ওয়ার্ডপ্রেস.কম ও অন্যান্য) 

 

Developed by DXDasia