পীর মসনদ আলির প্রথম জীবনে নাম ছিল তাজ খাঁ মসনদ-ই-আলা
একটা পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অবিশ্রান্ত সংগ্রামই হল ইসলামের মূলকথা। সেই মানসিকতা নিয়ে চললেই ইসলামী সংস্কৃতির প্রকৃত মূল্যায়ন হবে, একথা প্রচার করেই এদেশে সুফিবাদের প্রসার ঘটিয়েছিলেন পীররা। তাঁরা বলতেন, যে আচার-ব্যবহার সমাজের কল্যাণ করে না, ইসলাম তার অনুমোদন দেয় না। পীররা তাই ছিলেন হিন্দু আর মুসলমানের সেতু বন্ধন।
পূর্ব মেদিনীপুরের হিজলীর মসনদী পীর। সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে ওড়িশা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পূর্ব মেদিনীপুরে তিনি এখনও সমান জনপ্রিয়। আজও সমুদ্রপথে কাকদ্বীপ, নামখানা থেকে বহু মানুষ আসেন হিজলী পীরের কাছে। পূর্ব মেদিনীপুরের হিজলীর নাম ছিল গুমগড়। এখন তা খেজুরিতে। এখানে একসময় হিজল গাছের বন ছিল। সেই গাছ কেটে জনবসতি তৈরি করেন পীর মসনদীর বংশধররা। তারপর এই অঞ্চলের নাম হয় হিজলী। পীর মসনদ আলির প্রথম জীবনে নাম ছিল তাজ খাঁ মসনদ-ই-আলা। মসনদ-ই-আলা তাঁর উপাধি। যার অর্থ সর্ব্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। তাঁর উদারতার জন্য পাঠানরা এই উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি বংশ পরম্পরায় ছিলেন হিজলীর রাজা। পরবর্তীতে পটাশপুরের পীর মখদুম আলির কাছে দীক্ষা নিয়ে ঈশ্বর সাধনা করতে থাকেন। একসময় তিনি পীরত্ব পান। পীরত্ব পাওয়ার পর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি তিনি দান করে মানুষের মধ্যে। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতায় মানুষ আকৃষ্ট হতে থাকেন।
হিজলীতে এসেছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ রহমত ভুঁইঞা। ওড়িশা সীমান্ত এলাকায় চণ্ডীভেটি মৌজার জমিদার ছিলেন মনসুর ভু্ঁইঞা। তাঁর দুই ছেলে ছিল – জামাল ও রহমত। জামাল ছিলেন বিষয় সম্পত্তিতে বেশ হিসেবী আর রহমত ছিলেন কুস্তিবিদ। দু-ভাইয়ে বনিবনা ছিল না। রহমত বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছিলেন গুমগড়ে। এখানে আসার পথে জমিদার চাঁদ খাঁর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। গুমগড়ের হিজলী বন কেটে তিনি বসতি স্থাপন করেন। চারিদিকে দুর্গ গড়ে তোলেন। রহমতের প্রধান সঙ্গী ছিলেন ভীমসেন মহাপাত্র, দ্বারকা দাস, দিবাকর পণ্ডা। তখন থেকেই পীর মসনদ-ই-আলার বংশের সঙ্গে হিন্দু পরিবারের যোগ। তখন হিজলী ছিল নদী। সাগর থেকে এ পথ দিয়ে তাম্রলিপ্তে ভিড়ত বড় জাহাজ। বাণিজ্য চলত।
হিজলীর নদীর ওপারে একসময় থাকতেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বিখ্যাত কপালকুণ্ডলা এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও কাহিনী নিয়ে রচিত। কথিত আছে কপালকুণ্ডলার নবকুমার হিজলী পীরের দরগায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র যে বাড়িতে থাকতেন আজও তা ভগ্নদশায় রয়েছে। আজও রয়েছে কাপালিকের মন্দির। তবে এটা সেই মন্দির কিনা দ্বিমত রয়েছে। এখানে প্রতিবছর মেলা হয়। পীর মসনদ ই আলা অনেকের কাছে পরিচিত মছলন্দী পীর নামে। তিনি এইএলাকায় রাজত্ব করছিলেন ১৬২৮ থেকে ১৬৪৯ সাল পর্যন্ত। ধীবর সম্প্রদায়ের মানুষ তখন বেশি বাস করতেন এখানে। আজ তাই যখন সমুদ্রে মাছ ধরতে যান মানুষ, হিজলী পীরের দরগায় গিয়ে তাঁরা মানত করেন। ফিরে এসেও যান মাজারে। পীরের দরগায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মানত করতে আসেন। সন্তানের মঙ্গল কামনায় মানত করেন। রোগ, শোক থেকে মুক্তির জন্য এখানে দিনের পর দিন বসে থাকেন। পীরের কৃপায় অনেকে সুস্থ হয়ে যান বলে মানুষের ধারণা। শোনা যায় তাঁর মৃত্যুর পরও মাজারে আসত মাড়িয়া, নাগেশ্বর, ঘোঙ্গা নামের তিনটে বাঘ। তিনটে বাঘই ছিল পীরের সবসময় সঙ্গী। লোকলয় যখন বাড়তে থাকে তখন ধীরেধীরে তারা দরগায় আসা কমিয়ে দেয় তারপর একদিন আর তাদের দেখা পাওয়া যায়নি। প্রতিবছর বৈশাখ আর শ্রাবণে তার উরুস শুরু হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও বহু মানুষ আসেন।
দিঘা যাওয়ার পথে নামতে হবে হেঁড়িয়া সেখান থেকে বাসে হিজলী। অথবা কাঁথিতে নেমে হিজলী যাওয়া যায়। পীর মসনদ-ই-আলা এক জবরদস্ত আলেম। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে তিনি সমান জনপ্রিয়।