বাংলার পীর-৬

দেবালয়ের নাম যে বেড়াচাঁপা হল তার পেছনেও রয়েছে পীর আব্বাস আলির অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন

ঠিক সাতশো পনের বছর আগে মক্কা থেকে এদেশে এসেছিলেন পীর হজরত সৈয়দ আব্বাস আলি। তাঁর বহু অলৌকিক কথা আজও হিন্দু -মুসলমানের মুখেমুখে। তিনি যখন এদেশে এসেছিলেন তখন গৌড়ের বাদশা ছিলেন সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ। একুশ জন পীর সঙ্গীকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল, মানবতার আদর্শকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে ইসলাম প্রচার। তিনি যখন এসেছিলেন তখন দেবালয় বা দেউলা বর্তমানে বেড়াচাঁপার স্বাধীন হিন্দু রাজা ছিলেন চন্দ্রকেতু। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রাজা চন্দ্রকেতুকে অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়ে ইসলামে দীক্ষিত করানো। কিন্তু পীর গোরাচাঁদ কখনও তা সম্ভব করতে পারেন নি। ফলে যুদ্ধ লেগেই থাকত। তবে ইতিহাস থেকে জানা যাচ্ছে, রাজার মন্ত্রী, সৈন্যদের তিনি অলৌকিক শক্তি দেখতে থাকলেন, তখনই সামাজিক অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে সাধারণ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করলেন।

তখন গোড়া ব্রাহ্মণদের ভয়ে মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকার ছিল না নিম্ন বর্গীয় হিন্দু মেয়েদের। পীররা সেসময় বলেছিলেন,আল্লাহ্ হলেন প্রেমের অচিন পাখি। শ্রীচৈতন্যদেবও তখন প্রায় একই কথা বলেছিলেন। রাধা -কৃষ্ণ প্রেম তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন বাঙালি মনে। গবেষকরা বলছেন, নতুবা তখন গোরাচাঁদ সহ যে পীররা এসেছিলেন তাঁদের মানবিক আবেদনে অবিভক্ত বঙ্গে আরও নিম্নবর্গীয় হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতেন। পীর গোরাচাঁদ ১২৬৫ সালে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন হজরত আলির বংশধর আর মা ছিলেন হজরত আবুবক্কর সিদ্দিকীর উত্তরপুরুষ। তাঁর দীক্ষাগুরু ছিলেন পীর হজরত এয়মনি। তাঁরই আদেশে বর্তমানে হাড়োয়ার বালান্ডা পরগনায় গোরাচাঁদ এসেছিলেন ইসলাম প্রচার করতে।

বালান্ডার পাশেই ছিল দেবালয়। তার রাজা ছিলেন চন্দ্রকেতু। বেড়াচাঁপার সেই চন্দ্রকেতুগড় নিয়ে আজও গবেষণা চলছে। পীর আব্বাস আলি বুঝেছিলেন, রাজাকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে না পারলে তাঁর যাবতীয় প্রচেষ্টা বৃথা হবে, বহুবার তাই রাজার সঙ্গে ধর্ম আলোচনা করতে লাগলেন তিনি। অলৌকিক ক্ষমতা দেখাতে লাগলেন। দেবালয়ের নাম যে বেড়াচাঁপা হল তার পেছনেও রয়েছে পীর আব্বাস আলির অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন। পীর আব্বাস আলির সুদর্শন চেহারার জন্য চন্দ্রকেতু রাজার স্ত্রী তাঁকে ডাকতেন গোরাচাঁদ বলে। রানি ডাকতেন বলেই সবাই তাঁকে বলতেন গোরাচাঁদ পীর। তিনি বুঝেছিলেন, রানিকে বশীভূত করতে পারলে রাজাকে অনেকটা মানসিকভাবে দুর্বল করা যাবে। অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়ে তাই তিনি রাজার পাঁচিলে চাঁপাফুল ফুটিয়ে ছিলেন বলে কথিত আছে। আর তারপর থেকে দেবালয়ের নাম হয়েছে বেড়াচাঁপা। আজও অবশ্য দেবালয় নাম ভুলে যান নি স্থানীরা।

বেড়াচাঁপা বাজারের পাশেই চন্দ্রকেতুগড়। গড়ের পাশেই পীর গোরাচাঁদের নজরগাঁ। তার পাশে খনার ঢিপি। খনা ছিলেন চন্দ্রকেতুর মেয়ে আর জামাই ছিলেন বরাহ। খনার বচন আমরা সবাই জানি। রাজার দুই যোদ্ধা ছিল। হামু ও তার ভাই দামু মুখোপাধ্যায়। খনা আর বরাহের কৃপায় দু'ভাই ছিলেন শক্তিশালী যোদ্ধা। গোরাচাঁদ পীর বুঝেছিলেন দু'ভাইকে ইসলামে দীক্ষিত করতে হবে। তিনি তাঁর ক্ষমতা বলে হামু আর দামুর শক্তি বিনষ্ট করলেন প্রথমে। তা সত্বেও রাজা চন্দ্রকেতুকে তিনি ইসলামে দীক্ষিত করতে পারেন নি। হামু আর দামুর বাড়ি ছিল যে গ্রামে, আজ তার নাম হামাদামা। ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে আকানন্দ আর বাকানন্দ নামের দুই রাজার সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল পীর সাহেবের।

তখন গোরাচাঁদের বয়স প্রায় ৯০ বছর। দেউলার পাশে ছিল হাতিয়াগড়। সেখানকার রাজা ছিলেন দু'ভাই। বিদ্যাধরী নদীর পাশে দীর্ঘ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ প্রাণ গিয়েছিল আকানন্দের। পীর সাহেবও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের পাশেই অসুস্থ পীর সাহেবকে রেখে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে একটা গরু তাঁকে প্রতিদিন দুধ পান করিয়ে যেত, সে গরুর মালিক ছিলেন কালু আর কানু ঘোষ। আজও পীরের মাজারে উরুস যখন হয় এই ঘোষ পরিবার থেকে দুধ আসে। সেই দুধে পীরের মাজার ভালো করে ধোওয়া হয়। তারপর শুরু হয় উরুস উৎসব।

যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়েছিলেন পীর গোরাচাঁদ। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি মারা যান। তাঁর হাড় এখানে রয়েছে বলেই গ্রামের নাম হয়েছে হাড়োয়া।

শিয়ালদহ থেকে বসিরহাট -হাসনাবাদ ট্রেনে হাড়োয়া নামতে হবে। সেখান থেকে বিদ্যাধরী নদীর পাশে পীরের মাজার। বারাসাত থেকে বাস যায় মাজার পর্যন্ত। এমনকি রাজারহাট দিয়ে ২৪/২৫ কিলোমিটার এলে পীরের মাজার। উল্টোডাঙা থেকে বাসও পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক এই স্থান নিয়ে বহু লোককথা ছড়িয়েছে। ১৩৭৩ সালের ১২ ফাল্গুন আহত পীর গোরাচাঁদের মৃত্যু হয়েছিল। ১১ ফাল্গুন থেকে উৎসব শুরু হয়। টানা ২০/২৫ দিন মেলা চলে। মেলায় যে শোভাযাত্রা বের হয়, তা দেখার মতো। মূল উরুস চলে তিনদিন। কয়েক লক্ষ মানুষ আসেন। তাঁর স্মৃতিতে রয়েছে স্কুল, পাঠাগার। দরগাহের খাদিমদার সাবির আহমেদ বলছিলেন এছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার বহু মানুষ আসেন মাজারে, কবর জিয়ারত করেন, মানত করেন। পীর গোরাচাঁদ ছিলেন জবরদস্ত আলেম। হাড়োয়ার আনাচে কানাচে তাঁর বহু অলৌকিক কথা ছড়িয়ে রয়েছে। আজ যে মাজার সেটা তৈরি করে দিয়েছিলেন গৌড়ের রাজা আলাউদ্দিন শাহ্। খাদিমদাররা পীরোত্তর সম্পত্তি রক্ষা করে মাজারের দেখভাল করছেন।

Developed by DXDasia