আজ যেখানে ফুরফুরা শরিফ তখন তার নাম ছিল বালিয়া বাসন্তী
বিশ্বজনীন আদর্শকে প্রচার করতে আরব-ইরান আর ইরাক থেকে সুফিরা এসেছিলেন এদেশে। তাঁদের মুখে ছিল কোরানের এক আয়াত। যেখানে বলা আছে 'লা ইকরাহ্ ফিদ্দিন'- অর্থাৎ ধর্মে কোনো জবরদস্তি চলবে না। তাঁরা বলতেন কোরানে লেখা আয়াত আর হজরত মহম্মদের আচার ও মুখ নিঃসৃত বাণী ছাড়া প্রয়োজনে নিজের বুদ্ধি, যুক্তি আর বিচারের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে। এরই নাম ইসলাম।এদেশে ধর্ম প্রচারের জন্য যে পীররা এসেছিলেন অর্থাৎ যাঁরা ছিলেন ঐতিহাসিকভাবে সত্য তাঁদের মুখে ছিল হজরত মহম্মদের সেই বাণী, যেখানে নবী বলছেন, 'তোমার ধর্ম তোমার,অন্যের ধর্ম অন্যের।' পীররা বলতেন, হৃদয় জয় করতে ভালোবাসা হল আসল শক্তি। তার জন্য জবরদস্তির দরকার নেই। পীররা যখন এদেশে এসেছিলেন তখন যাদু দেখিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো হত। মানুষের মন জয় করার জন্য তাই তাঁরা অলৌকিক ক্ষমতা দেখাতে লাগলেন। অলৌকিক ক্ষমতা বলে পীররা এদেশের রাজা -জমিদারদের ভয় দেখাতে শুরু করলেন। তখন এইসব রাজাদের ব্যবহার আর অত্যাচারে অতিষ্ট ছিলেন মানুষ। ফলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে তাঁরা সহজেই মানুষের মন জয় করে নিয়েছিলেন। যেখানে দেখেছেন অত্যাচার চলছে সেখানে যুদ্ধ করেছেন।
হজরত পীর আবুবক্কর সিদ্দিকীর পূর্ব পুরুষরা এদেশে এসেছিলেন গিয়াসুদ্দিন বলবানের সময়। আজ যেখানে ফুরফুরা শরিফ তখন তার নাম ছিল বালিয়া বাসন্তী। যুদ্ধ জয় করে এই এলাকায় ইসলাম প্রচার শুরু করেন তাঁর পূর্বপুরুষ মনসুর বাগদাদী। বালিয়া বাসন্তীর নাম তখন পাল্টে রাখা হয় 'ফার রে ফারা' অর্থাৎ পূর্ণ আনন্দ। ধীরে ধীরে লোকমুখে ফার রে ফারা হয়েছে ফুরফুরা শরিফ। পীর আবুবক্কর সিদ্দিকী সম্ভাবত বাংলার শেষ জবরদস্ত আলেম। বাংলা -বিহার -ওড়িশা -অসম শুধু নয় সারা ভারতে তাঁর খ্যাতি ছিল। এমনকি মক্কা -মদিনাতেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। লোকমুখে পরবর্তীকালে তিনি দাদা হুজুর নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কেউ কেউ বলতেন দাদাপীর। তিনি ছিলেন হজরত মহম্মদের প্রথম খলিফা হজরত আবুবক্কর সিদ্দিকীর বংশধর। ১৮৪৬ সালে ফুরফুরাশরিফে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। মাত্র ৯ মাস বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। তখন ইংরেজ রাজত্ব। তাঁর মেধা দেখে ইংরেজি স্কুলে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল অর্থাৎ ইংরেজি ভাষা দিয়ে হজরত আবুবক্কর সিদ্দিকীর বাল্য শিক্ষা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে তিনি আরবী,ফারসী ভাষা শিখতে শুরু করেন।
আবুবক্কর সিদ্দিকী সেকালে শুধু পীর ছিলেন না, ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। এমনকি তাঁর পূর্ববর্তী সময়ে মুসলমানদের মধ্যে কুসংস্কার ছিল তা দূর করতে নামজাদা মাওলানা-মৌলবীদের সঙ্গে সরাসরি বাগযুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন। ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা অংশ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শোনা যায়, তিনি যেখানে বক্তৃতা দিতে যেতেন সেই আমলে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হত।
তিনি রাজনীতিতে কখনও জড়িয়ে পড়েন নি, তবে হিন্দু -মুসলমানের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে রাজনৈতিক নেতারা পীর সাহেবের কাছে আসতেন। ১৯৩৯ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ফজলুল হক, মৌলানা আবুল কালাম আজাদরা আসতেন পরামর্শ নিতে। একবার গান্ধীজীও এসেছিলেন তাঁর কাছে। পীর সাহেবের কেরামতি দেখে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আজও সেই পরম্পরা চলছে।আজও রাজনৈতিক নেতারা সময় পেলে ছুটে যান ফুরাফুরায়। তাঁরা আসলে বাংলা, অসম, বিহারে মুসলমানদের কাছে বার্তা দিতে চান আবুবক্কর সিদ্দিকীর প্রতি তাঁরা শ্রদ্ধাশীল।
পীরের বংশধররা এখনও যে নির্দেশ দেন, তা এ বাংলার বাঙালি মুসলমান প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন।তা সে রাজনৈতিক হোক বা ধর্মীয় অথবা সামাজিক। এখনও বাংলা, অসম, বাংলাদেশ থেকে হাজার মানুষ আসেন প্রতিদিন। নতুন গাড়ি কিনলে গাড়ি নিয়ে যান ফুরফুরায়, নতুন বাড়ি করলে যান, নতুন জামাই -মেয়ে নিয়ে যান, মানত করতে যান, ছেলেমেয়ের পরীক্ষার আগে যান, সন্তান চাইতে যান, বিপদ থেকে উদ্ধার হতে যান, ফুরফুরার মাদ্রাসায় ছাত্র ভর্তি করতে যান, ইদানীং রাজনৈতিক পরামর্শ নিতে যাচ্ছেন অনেকেই।
তবে পীর আবুবক্কর সিদ্দিকীর মাজারে চাদর চড়ানো যায় না, এখানে যা হয় তার সবটাই আড়ম্বরহীন। পীর বলতেন,ইসলামে সমস্ত অনুষ্ঠান আড়ম্বর ছাড়াই পালন করতে হবে। প্রতিবছর ২১/২২/২৩ ফাল্গুন এখানে ঈছালে সওয়াব হয়। ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় তিনদিনে। রাজনৈতিক নেতারাও আসেন। পীর সাহেব বলতেন, গরীব আর আমীরে কোনো ভেদ নেই। এই তিনদিন তাই এক থালায় একসঙ্গে বসে মানুষ খাওয়াদাওয়া করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরাও আসেন এই ৩ দিন। পীরসাহেব বলতেন, ইংরেজ রাজত্ব একটি বৃক্ষ স্বরূপ। সেই বৃক্ষের তিনটি শিকড়। হিন্দু, মুসলমান আর খ্রীষ্টান। বৃক্ষটিকে রক্ষা করিতে হইলে তিন জাতিরই নায্য দাবি সমূহ সমান অংশে পূরণ করিয়া শিকড় তিনটি মজবুত রাখিতে হইবে। ' এই প্রস্তাব পীর আবুবক্কর সিদ্দিকী রেখেছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটনের কাছে। তিনি চান নি দেশ ধর্মের ভিত্তিতে। মুসলিম লিগের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও জিন্মাকে শেষদিকে পছন্দ করতেন না। আজীবন তিনি চেয়েছেন এদেশে সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বাস করুন। অসমে তাই যখন জাতি বিদ্বেষ হচ্ছে পীর সাহেব বলছেন, অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখানো মানুষের ধর্ম। তিনি তাঁর শিষ্যদের বারবার বলছেন কন্যা সন্তানের শিক্ষা দিতে। বেআব্রু না হয়ে উচ্চশিক্ষিত করার ফতোয়া দিয়েছেন। তখন মুসলমান সমাজে বিয়ের জন্য মোটা টাকা পণ দিয়ে মেয়ে পছন্দ করতে হত। পীর সাহেব ফতোয়া দিয়েছিলেন, এই টাকা যেন মেয়ের বাবা ভবিষ্যতের জন্য গচ্ছিত রাখেন। তখনও মুসলমান সমাজে বিধবা বিবাহ ছিল না। নিজের বংশে বিধবা বিবাহ শুরু করেছিলেন। আর ছেলেদের জন্য বলেছিলেন চাকরি করতে হবে। সেজন্য উচ্চশিক্ষা করতে হবে। যে ভাষা শিখলেচাকরি হবে তা শিখতে হবে। তাঁর এই বার্তা সর্বত্র পৌঁছে গিয়েছিল বলে আজও তিনি সমান জনপ্রিয়।
ফুরফুরা হুগলির এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। কোলকাতা অসংখ্য বাস যায়। আরামবাগ বা বাঁকুড়া যাওয়ার বাসে নামতে হয় শিয়াখালা। সেখান থেকে ৫ কিলোমিটার। বাস,অটো, টোটো, ভ্যান রয়েছে। পীর বংশের জামাতা সাজ্জাদ হোসেন বলছিলেন, তাঁর তৈরি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জমিয়তে উলামায়ে বাংলার দায়িত্ব নিয়ে আজও দাদাহুজুরের কথা তারা প্রচার করে চলেছেন।