শঙ্খদা দেখে যেতে পারলেন না তাঁর ‘বন্দনার বাগান’-এ আমার আঁকাআঁকি : হিরণ মিত্র

শঙ্ঘ ঘোষের লেখা শেষ কিশোরকাহিনি ‘বন্দনার বাগান’

ন্দনার বাগান এক অপূর্ব বই। শৈশব আবিষ্কারের বই। প্রথম যখন পড়ি, একদিনে, এক রাতেই শেষ করি। এবং পাতায় পাতায় ছবি আঁকি। এমনিতেই কবি শঙ্খ ঘোষের গদ্য আমার অসম্ভব প্রিয়। কবিতার পাশাপাশি পড়তে পড়তে ওনার স্নেহ মাখানো মুখটা ভেসে উঠছিল। এই ছবি আঁকা বা আমাকে নির্বাচনের পিছনে, ছোট্ট এক কাহিনি আছে। তার বিস্তারে যাবো না। আমাকে অনুরোধ করার আগেই এর ছবিগুলো আঁকা হয়ে গিয়েছিল। এবং যেকোনও কারণেই তা আর প্রকাশ পায়নি তখন।

দীর্ঘদিন কাজটা বন্ধ থাকার পর, শঙ্খ ঘোষ চলে যাবার পর, বিধান শিশু উদ্যান আবার উদ্যোগ নেয়। দায়িত্ব বর্তায় একরাম আলির উপর। যে আমার পূর্ব-পরিচিত। তার সিদ্ধান্তে এই বইয়ের ছবিগুলি আঁকি। সাধারণ ভাবে আমার সম্বন্ধে নানা ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে এটাই আছে যে, আমি একজন বিমূর্ত শিল্পী। আমার প্রিয় রং কালো, কখনো কখনো লাল, হলুদ। যেকোনও শিল্পীর গঠন প্রক্রিয়ার নানা পরত থাকে। তার চিত্রের অভিব্যক্তির নানা অভিমুখ। মূল যেটা বিষয় তার ব্যক্তিগত আবেগ, এই আবেগ নানা বস্তু দিয়ে তৈরি হয়। তার মধ্যে থাকে স্মৃতি, শৈশব স্মৃতি, প্রেম, ভালোবাসা, মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং বেশ কিছুটা কর্কশতাও। বৈপরীত্য ও সংঘাত, এই রকম নানা পরত থাকে বলে নানা লোক, নানা কিছু ভেবে নেয়। বলে, ও এটা পারবে না, এটা ওর কাজ নয়। হয়তো সত্যি, আবার মিথ্যাও। ‘বন্দনার বাগান’, তার গদ্য আমাকে আমার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা, ভালোবাসার শৈশব, রাজনীতি, দুহাত মেলা –সবই জেগে ওঠে।

আমি মনে করি না, কোনও অলংকরণ-শিল্পীর শুধুমাত্র তার অলংকরণের দায়িত্ব আঁকার মধ্যেই থাকে। তার শেষপর্যন্ত। ছাপা পর্যায়, সুস্থ ভাবে যথাযথ ভাবে কাগজ কালির সমন্বয় ঘটছে কিনা তার দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টায় থাকা উচিৎ।

আমি মজে যাই। পড়তে পড়তে ছবি ভেসে ওঠে। এর মধ্যে একটা বিশেষ ভূমিকা নেয় বিভাব পত্রিকার রাহুল সেন। খুব যত্ন করে, ছাপার অক্ষরে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে, আমাকে সশরীরে দিয়ে যায়। আমার কাজ করতে বিশেষ সুবিধা হয়। আমি দ্রুত ঢুকে পড়ি মূল ভাবনায়। একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলে যা হয়… মনটা স্বস্তি পায়। কাজে মন বসে। একথা সাধারণ ভাবে কাউকে বোঝানো যায় না। কাজও দ্রুত ঘটে যায়। কী ধরনের রেখা, রঙ, আঁকার, তার কিছু উদাহরণ একরামকে পাঠাই। ও আরও উৎসাহ দেয়। সব ছবিই এক মুহূর্তে শেষ হয়। তারপর পৃষ্ঠা সাজানোর পালা। তাও… হলো, প্রতিষ্ঠা হলো, বিশেষ ভাবে বানিয়ে তুললাম।

তারপর সামান্য জটিলতার সৃষ্টি হয়। সেগুলো তেমন ঘটনা নয়। প্রকাশনা ও ছাপা নিয়ে। তাও সমাধান করলাম। কারণ যে প্রেস এই দায়িত্ব নিয়েছিল, তারা আমার বিশেষ পরিচিত হবার জন্য, আমি সরাসরি কথা বলি। ছাপা নিয়ে উপদেশ দিই।

আমি মনে করি না, কোনও অলংকরণ-শিল্পীর শুধুমাত্র তার অলংকরণের দায়িত্ব আঁকার মধ্যেই থাকে। তার শেষপর্যন্ত। ছাপা পর্যায়, সুস্থ ভাবে যথাযথ ভাবে কাগজ কালির সমন্বয় ঘটছে কিনা তার দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টায় থাকা উচিৎ। বিশদে বলছি না।

বইটি পাঠক ও ক্রেতার কাছে সমাদৃত হয়। শঙ্খদার পরিবারও তৃপ্তি পায়। বইটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে একথা বলাই যায়। আমিও কাজটি করতে পেরে, শ্রদ্ধার শঙ্খদাকে, যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে পেরে খুবই খুশি হয়েছি।

(উল্লেখ্যঃ ‘বন্দনার বাগান’ সম্ভবত শঙ্খ ঘোষের শেষ গদ্যলেখা এবং সেই সঙ্গে এটিই তাঁর শেষ কিশোরকাহিনি বলেও উল্লেখ করেছেন প্রকাশনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষজন।)

____

বন্দনার বাগান – বিধান শিশু উদ্যান প্রকাশনা – প্রথম প্রকাশকাল ২০২২ – মুদ্রিত মূল্য ২০০ টাকা

 

Developed by DXDasia