বইমেলার আড্ডা : ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ
আমি এমন একটি জেনারেশনের ফসল, যে কি না নব্বইয়ের দশক থেকে মিলেনিয়াম হয়ে জেন-এক্স, জেন-জির মধ্যে বিচরণের সৌভাগ্য পেয়েছি। জৌলুসহীন মুদিখানার দোকান থেকে পাঁচতারা মল-এর ঝলমলে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নির্মাণ হতে দেখেছি চোখের সামনে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার সুবাদে পাশ্চাত্য ঘেঁষা সংস্কৃতির স্বাদ পেয়েছি অনেক ছোটো থেকেই। খুব ভালো ছাত্র না হলেও বই পড়ার নেশা এসেছে সেই তখনই।

এখন লেখক লেখিকা অনেক, বরং পাঠকই যেন কিছুটা অপ্রতুল। আসলে এখন ব্যপারটা অনেকটাই হয়ে গেছে এমন – যিনি পাঠক, তিনিই লেখক। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বহু মানুষকে দিয়েছে একটা খোলা প্ল্যাটফর্ম।
আমাদের স্কুলের অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি থাকার সৌজন্যে বহু ইংরেজি ক্লাসিক্স পড়ে ফেলেছিলাম ক্লাস টুয়েলভ পৌঁছতে পৌঁছতেই এবং তখন থেকেই, বলা ভালো তারও আগে থেকে, শীতকালে বইমেলা যাওয়াটা ছিল একটা রিচুয়ালের মতোই। বইমেলা মানে প্রথমেই মনে পড়ে যায়, এখনও ময়দানের মিঠেকড়া শীতে, মাঠে বসে বা দাঁড়িয়ে নতুন কেনা বইয়ের গন্ধ নিতে নিতে সামান্য নির্ভেজাল আড্ডা। তবে সমকালীন আড্ডার রীতি অনেক পালটে গেছে। সমকালীন আড্ডার ব্যাপারে বলতে হলে ঘড়ির কাঁটা কিছুটা পিছিয়ে দিয়ে দেখে নিতে হবে পূর্বকালীন আড্ডার পরিধি। আগে যখন ময়দানে বইমেলা হত তখন ছিল না তথ্য প্রযুক্তির এই সর্বব্যাপী প্রকৌশল, তখন মূলত ছিল শীতের রোদ গায়ে মেখে, ছোটোবেলায় বাবা-মা’র হাত ধরে বা বড়োবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে মাঠের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে হেঁটে বই দেখা। সারা বছরের পকেটমানি জমিয়ে দুটো বা তিনটে বই কেনা। দূর থেকে দাঁড়িয়ে স্বনামধন্য সাহিত্যিকদের দেখা অথবা কাছে এগিয়ে গিয়ে বইয়ের ওপর তাঁদের একটি সই পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। আর সবশেষে ছিল এই সমস্ত কিছু ‘জড়ো’ করে আড্ডা দিতে বসা।
তখন সোশ্যাল মিডিয়ার অস্তিত্ব ছিল না বলে আড্ডার মধ্যে কোনও শারীরিক দূরত্ব এসে বাসা বাঁধেনি। কিন্তু এখন সময় গেছে পাল্টে। বইমেলা ফেরৎ আমরা অনেকেই এখন চায়ের কাপ আর মোবাইল হাতে আড্ডা দিতে বসি হোয়াটসঅ্যাপের মাঠে, যে মাঠে থাকে না কোনও ঘাস। প্রযুক্তিকে আপন না করে নেওয়া কোনও কাজের কথা নয়, কিন্তু প্রযুক্তির এই ‘সাইড এফেক্ট’গুলো মাঝে মাঝে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে।
আজ বইমেলা অনেক পাল্টে গেছে। এক ছাদের তলায় মানুষের চাই অনেককিছু। তারস্বরে মাইক বাজিয়ে নানা ঘোষণা, প্রতিযোগিতা, মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন উঠতি কবিদের কবিতাপাঠ, নানা মঞ্চে বইপ্রকাশ, আলাপ আলোচনা, খাবারের দেদার আয়োজন আজ ঘিরে থাকে বইমেলাকে। আড্ডার বিষয়বস্তুতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। এখন লেখক লেখিকা অনেক, বরং পাঠকই যেন কিছুটা অপ্রতুল। আসলে এখন ব্যপারটা অনেকটাই হয়ে গেছে এমন – যিনি পাঠক, তিনিই লেখক। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বহু মানুষকে দিয়েছে একটা খোলা প্ল্যাটফর্ম। সেখানে কোনও বিষয় নিয়ে লিখতে লিখতে যদি একটা ভার্চুয়াল পাঠকবৃত্ত তৈরি হয়, তাহলে তার ওপরে নির্ভর করেই প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন বই এবং এই বিষয়টি এখন হয়ে উঠেছে বইমেলার আড্ডা-র অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। আগে পুরস্কার প্রদান হত অনেকটাই মেধার ওপর ভিত্তি করে, এখন সেই পুরস্কার পাওয়া যায় নানা গোষ্ঠীতে যাতায়াতের মাধ্যমে – এ-ও উঠে আসে আড্ডায়। আর ভুঁইফোঁড় পুরস্কার দেখে যে হাসির উদ্রেক হয়, তা হল আড্ডার অন্যতম বিনোদন। তবে বিনোদনের বিষয়বস্তু এখন অনেক – ওয়েবসিরিজ, পডকাস্ট, ইনস্টারিল – এসবের আলোচনা তো ফিরে ফিরে আসতেই থাকে বইমেলাতে, ফিশরোলে কামড় দিতে দিতে।

সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে আজ প্রকৃত বন্ধুর জায়গায় গুরুত্ব পায় ‘অ্যাড টু ফ্রেন্ডস’ বা ‘ব্লক’। ছোটোবেলার বন্ধুও যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগ না রাখতে চায়, মনে হয় সে যেন আমাদের উপেক্ষা করছে। জীবনের অনেক সমীকরণ হয়ে উঠেছে জটিল। আর সোশ্যাল মিডিয়ার এই জটিল সমীকরণে পড়ে হাঁসফাঁস করছেন অনেক লেখক লেখিকাও। মাঝে মাঝেই দেখতে পাই অযথা বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি করতেও তাঁরা পিছপা হন না। এর পেছনে হয়তো থাকে একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। কিন্তু চাপা প্রতিযোগিতা কি পূর্বকালীন সাহিত্যিকদের মধ্যে ছিল না? অবশ্যই ছিল, কিন্তু তাকে এভাবে বেআব্রু করে অসূয়ার পর্যায়ে কেউ নামিয়ে আনেননি। আর এ ধরনের ঘটনা, আচরণ পাঠক হিসেবে কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে আমার জন্য, আমাদের জন্য। আর আড্ডা তো হয় মাত্রাহীন, তার গতিপথ নির্ধারণ করা যায় না। তাই সমমনস্ক বন্ধুমানুষের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় উঠে আসে এইসব অপ্রিয় বিষয়ও। আর এইভাবেই নিজেদের অজান্তেই কখন যেন শেষ হয়ে যায় বইমেলার একটি মিঠেকড়া সন্ধে।
_____
ছবি: পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড