রবীন্দ্রনাথের চিঠি পৌঁছল দুই বোনের বাড়িতে – তাতে লেখা, “আশাপূর্ণা-সম্পূর্ণা”

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা, সামান্য স্কুলেও যাননি আশাপূর্ণা

প্রত্যেক বাঙালি নারীই হয়তো আশাপূর্ণা হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন বা চান। কারণ আশাপূর্ণার তেজ, আশাপূর্ণার ঘর এবং বাইরের অবিরাম সংগ্রাম, সর্বোপরি রান্নার হেঁসেলে বই পড়ার বাতিক এ যুগের মেয়েদের সঙ্গেও একাত্ম হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়। এই ‘পুরুষতান্ত্রিক’ সমাজে দাঁড়িয়ে এখনও আশ মেটেনি গুটিকয়েক পুরুষের। তাঁরা বারবার চান নারী স্বাধীনতার উপর আঘাত আনতে। রুখে দিতে সমস্ত বাইরের পথ। এই কাঁটা বিছানো পথেই আশাপূর্ণা খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের উত্তরণ। যে উত্তরণ বেঁচে থাকারও।

আশাপূর্ণারা ছিলেন দুই বোন। দুই বোন মিলে জেদ ধরেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে। চিঠি পাঠিয়ে লিখেছিলেন, “নিজের হাতে আমাদের নাম লিখে একটি উত্তর দেবেন।” অবশেষে অনেকদিন পর রবীন্দ্রনাথের চিঠি পৌঁছল আশাপূর্ণাদের বাড়িতে। তাতে লেখা, “আশাপূর্ণা-সম্পূর্ণা”। বোন পারেননি। কিন্তু দিদি আশাপূর্ণা পেরেছিলেন সাহিত্য জগতে একটা চিরকালীন আসন বিছিয়ে দিতে। আশাপূর্ণার সাহিত্যপ্রীতি কিন্তু তৈরি হয়েছিল মা সরলাসুন্দরীর জন্যই। সরলাসুন্দরী ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, জ্ঞানপ্রকাশ লাইব্রেরি এবং চৈতন্য লাইব্রেরির আজীবন সদস্য। তাই বাড়িতে নিয়মিত আসত ‘সাধনা’, ‘প্রবাসী’, ‘বঙ্গদর্শন’, ‘সবুজপত্র’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বসুমতী’, ‘সন্দেশ’ এইসব নামজাদা পত্র-পত্রিকা। দাদাদের পড়া শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলতেন আশাপূর্ণা। এমনকি বর্ণপরিচয়ও শিখে ফেলেছিলেন সেইভাবে। ‘আর এক আশাপূর্ণা’ গ্রন্থে নিজেই লিখছেন, “হিসেব মতো আমার ছেলেবেলাটা কেটেছে, সংসার ঊর্ধ্বের একটি স্বর্গীয় জগতে। বই পড়াই ছিল দৈনিক জীবনের আসল কাজ।”

যিনি প্রায় দুশোটি উপন্যাস লিখেছেন, প্রায় চার হাজার গল্প লিখেছেন, ভাবতে অবাক লাগে সেই আশাপূর্ণা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা, সামান্য স্কুলেও যাননি কোনোদিন। পড়াশোনা যা শেখার সব ওই দাদাদের পড়া শুনে আর পত্র-পত্রিকা পড়ে। তাই ছোটো থেকেই একপ্রকার জেদ তাঁকে পাগলের মতো সবকিছু ভাবিয়েছে। এমনকি বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে গেলেও লেখালেখি ছাড়েননি। বারবার সবকিছুর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ঘোষণা করেছেন বিদ্রোহ। চোখের সামনে কলকাতাকে পাল্টে যেতে দেখেছেন। দেখেছেন যৌথ পরিবার কীভাবে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। মূল্যবোধ কীভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে। আশাপূর্ণার কলম তাঁকে দিয়ে লেখাচ্ছে, “অধিকারহীন অবলাদের কথা বলেছি বৈকি! কিন্তু আজকের স্বাধীকারমত্তা সবলাদের দেখেও খুব একটা আনন্দ পাচ্ছি না।” আরও লিখছেন, “নারী ছলনাময়ী, নারী জন্ম অভিনেত্রী। কিন্তু সে কি শুধু পুরুষজাতিকে মুগ্ধ করবার জন্যে? বিভ্রান্ত করবার জন্যে? বাঁচবার জন্যে নয়? আশ্রয় দেবার জন্যে নয়?” – তাঁর এই কথায় উঠে আসতে পারে ২০২০ সালের প্রসঙ্গ। আজকের দিনেও কি সত্যিই মেয়েরা ‘স্বাধীন’? মেয়েরা তাদের নিজেদের কথা বলতে পারছে? প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারছে এই ‘প্রগতিশীল’ সমাজের প্রতি? এই প্রশ্নগুলো যত বেশি উঠে আসবে, আশাপূর্ণা দেবী তাঁর লেখনীতে ততই জীবন্ত এবং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।

আর তাই ‘সেকেলে’ মেয়েরা যখন পৃথিবী বলতে বুঝত রান্নাঘর, শ্বশুরবাড়ি বলতে বুঝত সমঝোতা – সেখানেই আশাপূর্ণা বারবার আঘাত করেছেন। লড়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। লিখেছেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার অনুভূতির ব্যাকুলতা আমাকে ভাবিয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে, আমাকে লিখিয়ে ছেড়েছে…. আমি লিখেছি ঘরোয়া মেয়েদের নিয়ে…. চিরদিনই মনের ভিতরে একটা আপোষহীন বিদ্রোহ ছিল, তাকে যদি নারী মুক্তির পিপাসা বলতে হয়, তাহলে তাই। যদি কিছু বিদ্রোহিণী চরিত্র সৃষ্টি করে থাকি, সেটা করেছি প্রতিবাদ করার মাধ্যম হিসাবেই…”।

 

Developed by DXDasia