অঞ্জলি মেন্টাল হেলথ রাইটস অর্গানাইজেশনের উদ্যোগে চলছে মনোরোগীদের শিল্প প্রদর্শনী
শহরের পাঁচতারা মলে খ্যাপাদের গল্প – বুঝতে একটু অসুবিধে হচ্ছে? তাহলে ঢুঁ মেরে আসতেই পারেন দক্ষিণ কলকাতার সাউথ সিটি মলে। গ্রাউন্ড ফ্লোরের গোটা প্যাসেজ জুড়ে অঞ্জলি – মেন্টাল হেলথ রাইটস অর্গানাইজেশনের উদ্যোগে চলছে মনোরোগীদের শিল্প প্রদর্শনী – ম্যাড স্টোরিজ (Mad Stories), একটি পাবলিক ইন্সটলেশন আর্ট ইভেন্ট। শিল্প, কিন্তু আদতে আস্ত জীবন। শিল্পের মধ্যে তো জীবনই নিহিত থাকে। হাজার গল্প নিয়ে যেমন জীবন, তেমন শিল্পও। মনোরোগীরা কেউ কেউ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন, কেউ বাড়ি ফিরতে পারেননি, কেউ আবার বাড়ি ফিরতে চানওনি। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনের কাহিনি আর্ট ইন্সটলেশনের মাধ্যমে প্রদর্শিত হচ্ছে সাউথ সিটি মলে।

সমাজ ওঁদের নাম দিয়েছে ‘পাগল’ বা ‘খ্যাপা’। আবার এ-ও মানা হয়, পাগলামি না থাকলে শিল্প হয় না। অঞ্জলি হয়তো সমাজের এই প্রচলিত চিন্তাভাবনাকে গ্রহণ করেই নিজেদের মতো করে তা ভাঙতেও চেয়েছেন। শিল্প প্রদর্শনী তাই চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হয়ে উঠেছে ‘ক্লাসি’ জনতার। ব্র্যান্ডেড পোশাক বা জিনিসপত্র কিনতে যাঁরা নিত্য সাউথ সিটিতে ইভিনিং শপিংয়ে যান, তাঁরা প্রত্যেকেই একবার হলেও থমকে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ কেউ ভাবছেন, যত্তসব ‘পাগলদের কাণ্ডকারখানা’! এখানেই এই উদ্যোগ সফল। উচ্চবিত্তের মাথায় ক্রমশ টোকা মারছে। তথাকথিত আর্ট প্র্যাক্টিসের বাইরে বেরিয়ে এসব আজব কাণ্ডকারখানাগুলোই হয়ে উঠছে আমজনতার। ছক ভাঙার এ কাজটি করেছেন শিল্পী সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায়, প্রত্যয় পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার একাধারে মনোসমাজকর্মী রত্নাবলী রায়-সহ অন্যান্যরা। গোটা প্রদর্শনীটি নিবেদন করেছে অঞ্জলি – মেন্টাল হেলথ রাইটস অর্গানাইজেশন।
সক্ষম সমাজ যে শুধু শেখানোর দায়িত্ব নিয়ে বসে নেই, তাকেও প্রতিনিয়ত শিখতে হয়। শিখতে হয় এই ‘প্রান্তিক’ মানুষদের থেকেই, তাঁদের সঙ্গে চলার অভিজ্ঞতা থেকে। সেই শেখায় ভুল হলে শুধরে নিতে হয়। অঞ্জলির তরফে জানানো হয়েছে, গত দুই বছর ধরে প্রত্যয় (মনোরোগ থেকে সেরে ওঠা মানুষদের ঘর)-এর আবাসিকরা একটা ন্যারেটিভ প্র্যাক্টিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। যারা ‘খ্যাপা’ বা ‘উন্মাদ’ হন তাদের ঠাঁই হয় গারদে। সমাজের চোখে তারা ফালতু। অঞ্জলি এবং প্রত্যয় সেইসব খ্যাপাদের গল্প, তাদেরই শর্তে জনপরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। একে বলা যেতে পারে উন্মাদের বোঝাপড়া। অর্থহীনের মধ্যে অর্থ খোঁজার চেষ্টা। রত্নাবলী রায় বলেন, “‘খ্যাপা’ বা ‘উন্মাদ’ যাঁরা, তাঁরা কি বরাবর রোগীর তকমা নিয়ে বাঁচবেন? নাকি তাঁদের অন্য আইডেন্টিটি থাকতে পারে এবং তা ‘প্রত্নতাত্ত্বিক’ কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠতে পারে? তাঁদের নির্মিত স্হাপত্য শিল্প, গল্প, ছবি লেখা আমাদের দৃষ্টিকে অন্য কোনো বড়ো রাস্তায় নিয়ে যেতে পারে?”

যারা ‘খ্যাপা’ বা ‘উন্মাদ’ হন তাদের ঠাঁই হয় গারদে। সমাজের চোখে তারা ফালতু। অঞ্জলি এবং প্রত্যয় সেইসব খ্যাপাদের গল্প, তাদেরই শর্তে জনপরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। একে বলা যেতে পারে উন্মাদের বোঝাপড়া।
রত্নাবলী যদিও ম্যাড স্টোরিজ-এর বাংলায় ‘পাগল’ বা ‘পাগলামি’ শব্দ ব্যবহার করছেন না। তিনি সচেতন ভাবে ম্যাডনেসকে ‘খ্যাপামি’ বলছেন। এর পিছনে তাঁর সুনির্দিষ্ট যুক্তিও আছে। তিনি বলেন, “আমি এই শিল্প প্রদর্শনীকে খ্যাপামির উদযাপন হিসেবে দেখছি। যাঁরা মূলস্রোতের নিরিখে ‘অস্বাভাবিক’, তাঁদের গল্পের পরিসর। যে গল্পে তাঁদের বয়ানটাই মুখ্য। যে গল্পে দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো কথক নেই। তথাকথিত মনোরোগী বা মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের অস্তিত্ব শুধুমাত্র ওই একটা অসুখকে কেন্দ্র করেই থাকে না। সেই অস্তিত্বের আরও নানান বাঁক আছে, স্তর আছে, সত্য আছে, গল্প আছে। ‘ম্যাড স্টোরিজ’ সেইসব গল্পই বলছে।”

কেন সাউথ সিটি মলের মতো একটা জায়গা বাছা হল? কারণ প্রান্তিক গোষ্ঠীর এই শিল্পীরা চান তাঁদের কাজ এমন জায়গায় দেখানো হোক, যেখানে প্রচুর মানুষ আসেন। এক কথায় বাজার। বড়োলোকের বাজারে ‘ফালতু’ লোকেদের কাজ। গত ৩১ মার্চ সন্ধে ৬টায় সাউথ সিটি মলে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়ে গেল মহাসমারোহে। অঞ্জলির কর্মীরা তো ছিলেনই, সঙ্গে ছিলেন অসংখ্য মানুষ। ছিলেন অধ্যাপক কল্যাণ রায়, পরিচালক সুদেষ্ণা রায়, থিয়েটার নির্মাতা অবন্তী চক্রবর্তী, বাচিকশিল্পী সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী দামিনী বেণী বসু। প্রত্যেকেই একবার অন্তত থমকে গিয়েছেন। ছুঁয়ে দেখেছেন ব্রাত্যজনের কাজ। কথা বলেছেন। প্রশ্ন করেছেন। আর নিশ্চয় তুমুল অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। প্রদর্শনীটি চলবে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা।