সব ঘুড়িই ভো-কাট্টা

চাপরাশ, মুখপোড়া, চাঁদিয়াল, চোরঙ্গী, বাঁশমার, পেটকাটি-দের সেই ঝাঁক কই গেল?

“পেটকাটি চাঁদিয়াল মোমবাতি বগ্গা
আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক, মাটিতে অবজ্ঞা।”

সুমনের এই গান প্রথমবার শোনার ঢের আগে থেকেই আমাদের ঘুড়ি-প্রেম শুরু। পাড়ায় প্রতিবছর ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে বসত সুকুমারকাকু। তখন ঋত্বিক সবে ল্যান্ড করেছে বলিউডের মাটিতে আর আকাশে শুধুই ‘কহোনা পেয়ার হ্যায়’ ঘুড়ির ঝাঁক। শুধু সূর্যদা ঋত্বিক-ঘুড়ি ওড়াবে না বলেছে। প্রেমিকার ‘ফ্যান্টাসির’ প্রতি ঈর্ষায়। সলমন-শাহরুখের ঘুড়ির ট্রেন্ড শুরু হয়েছে বছর দুয়েক হল। আমরা ছাপ্পা-মারা বদ ছেলের দল ছাদে জড়ো হতাম ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য। বিশ্বকর্মা পুজোর অন্তত দিন পনেরো আগে থেকে। যখন-তখন বৃষ্টি নামত। ঘুড়ি তখন মাঝ আকাশে। সুতো গুটিয়ে আনতে-আনতেই ভিজে স্নান। আমাদের সেইসব ছাদ, বিকেলগুলো আনন্দে, ‘ঘুড়ি ভোঁ’ চিৎকারে উত্তাল হয়ে উঠত। এই ক'দিন প্রেমপর্ব মুলতুবি থাকত। প্রেমের চাইতেও তীব্র সমর্পণে ব্যবহৃত হত মরে আসা আলোর বিকেলগুলো। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার তাড়ায় সাইকেল কিছুতেই বেঁকে যেত না এদিক-সেদিক। 

আমাদের মধ্যে যারা ‘বড়ো খেলোয়াড়’, তাদের দেদার ঘুড়ি আর সুতো লাগত। তারা সেসব কিনতে যেত মেটিয়াবুরুজ। আর বাকিদের ভরসা ছিল সুকুমারকাকুর দোকান। অবশ্য, পাড়ার চৌহদ্দির মধ্যে তখন আরও অন্তত চারটে দোকানে ঘুড়ি, লাটাই, সুতো বিক্রি হত। কিন্তু, সুকুমারকাকু নিজেও বানাত ঘুড়ি। অস্ট্রেলিয়ান পেপারের সেই ঘুড়ির গায়ে যেন মোম লাগানো। কাঠি বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে দেখে নিতাম ঘুড়ির ফ্লেক্সিবিলিটি। প্লাস্টিকের ঘুড়ি তখন এসে গেছে বাজারে। কিন্তু, প্লাস্টিকের ঘুড়ি কিনতে গেলেই গাল পাড়ত সুকুমারকাকু। অথচ, নিজে স্টক রাখত। প্লাস্টিকের ঘুড়িকে সুকুমারকাকু বলত সাইলেন্সর-খোলা বাইক। শুধুই নাকি আওয়াজের জন্য লোকে এসব কেনে। 

বিশুদাকে মাঞ্জার মাস্টার বলতাম আমরা। তখনও চিনে মাঞ্জার কথা শুনিনি। হামানদিস্তায় টিউবলাইট গুঁড়ো করে, আঠা মাখিয়ে মাঞ্জা দেওয়া হত। সঙ্গে গোটা দুই ডিম। পাড়ায় তখনও বেঁচে পাঁচ-পাঁচখানা মাঠ। সেখানে বাঁশ পুঁতে চলত সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া। মাঞ্জা দেওয়া হত রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টেও। লাটাই নিয়ে সুকুমারকাকুর কাছে গেলে অন্য লাটাই থেকে সুতো আসত। মহাভারতে ঠিক যেভাবে রূপা গাঙ্গুলি থুড়ি দ্রৌপদিকে বিপদে শাড়ি দিয়েছিল কৃষ্ণ, অনেকটা তেমনভাবে ঘুরত হাতের লাটাই। হাতের লাটাই নিজে থেকেই ঘুরছে, এ এক আশ্চর্য অনুভূতি। সুকুমারকাকুর লাটাই-এর সুতো খুলতে খুলতে খসে যেত এক-একটা কাগজের টুকরো। ওইগুলো হিসেব। পাঁচশো গজ, হাজার গজ। আমাদের পাড়ায় হাজার গজের সুতো মানে অনেক। কিন্তু আমাদের মামাবাড়িতে দেড় হাজারের কমে কুলোতোই না। অনেক বড়ো বড়ো মাঠ তো। দূরপাল্লার খেলা হত সেখানে। 

লাটাই নিজে থেকেই বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝের স্পেসটায় পাক খেত আরও একটা সময়। তখন ঘুড়ি নিজেই সুতো টানত খুব। কীরকম ঘোরের মধ্যে আমরাও সুতো ছেড়েই যেতাম। সেই থেকেই ছেড়ে খেলা অভ্যেস হয়ে গেল আমার-রনির-আকাশের। কেউ কেউ টেনেও খেলত অবশ্য। আমাদের ছেড়ে খেলা ঘুড়িকে হুট করে কেটে দিত নিচ থকে গোঁত্তা মেরে ঢুকে। চমক ভেঙে দেখতাম ঘুড়ি পাক খেতে খেতে উড়ে যাচ্ছে শ্যামলদা-দের বাড়ির ছাদ পেরিয়ে, পাশের ছাদে টুপুর দির নাইটি মেলা—তাকেও নিচে রেখে বটতলা ছাড়িয়ে, অন্য এক পাড়ায়। আমার অধিকারের ঘুড়ি, তার সঙ্গে লেগে থাকা সুতো সেই মুহূর্ত থেকেই আর আমার নয়। বাকি সুতো গুটিয়ে আনার সময় অন্য ছাদ থেকে তাকে ধরে কেটে নিত কোনও কোনও বদ। আমরা দেখতে পেলেই থ্রেট দিতাম। কারণ যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী, কাটা ঘুড়ির সুতো লাটাইতে গুটিয়ে নেওয়ার সময় তাকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না। পরাজিত সুতো পশ্চাদপসারণ করে ফিরে আসবে লাটাইতে। হাজার গজ কমে তখন আটশো। ফের ঘুড়ি বাঁধা। মন ভালো নেই… 

মাঝে-মাঝে কোনও ঘুড়ি কিছুতেই কাটতে চাইত না। আমাদেরও কেমন বিশ্বাস শুরু হত, এ আমাকে ছেড়ে যাবে না। ফলে, ছেড়ে খেলো যত খুশি। হাতের ঘুড়ি সন্ধেয় হাতেই ফিরে এলে রাজকীয় মেজাজে নেমে আসা নিচে। চুলে শ্যাম্পু করে পরেরদিন স্কুল। আমার ঘুড়ি যে আকাশে উড়ছে, তার নিচেই কোনও এক ছাত থেকে কি আমার ঘুড়ি দেখতে পাচ্ছে সে? সে কিংবা আমাদের ‘তারা’? ঘুড়ি একাই উড়ত না তখন। সঙ্গে আমরাও।

ঘুড়ি নিয়ে অনেক গপ্প শুনেছি ছোটো থেকেই। ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতেই নাকি সেই ১৭৫২ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছিলেন বেঞ্জামিন। তারও আগে ঘুড়িতে থার্মোমিটার বেঁধে আকাশের তাপমাত্রা মাপতে চেয়েছিলেন দুই স্কটিশ ভাই। চিনের বাহারি ঘুড়ির হাজারো গপ্পো-উপকথা। জাপানে নাকি ঘুড়ি নিষিদ্ধই করে দেওয়া হয়েছিল, লোকেরা ঘুড়ি পেলে আর কাজ করতে চাইত না বলে। ঘুড়ি ওড়ানোর এই আনন্দ কি আসলে উড়তে চাওয়ারই আনন্দ? হাওয়া লেগে যায় অবচেতনের কোথাও। অপর্ণা সেনের ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’ সিনেমায় সুদূর জাপানের বউটি তাই ঘুড়িই পাঠায় বঙ্গদেশের বরকে। সেই তাদের যুগলে ওড়া। বাংলায় ঘুড়ি এল নবাবদের হাত ধরে। জমিদার বাবুরা ঘুড়িতে টাকা বেঁধে ওড়াতেন। তারপর, কখন যেন বিশ্বকর্মা পুজো হয়ে উঠল বাঙালির ঘুড়ি উৎসব। অবশ্য, ওপার বাংলায় পৌষ সংক্রান্তিতেই মূলত ঘুড়ি ওড়ে। এখানেও সরস্বতী পুজোয় ঘুড়ি ওড়ে কোথাও কোথাও। তবে, বিশ্বকর্মা পুজোতেই মূলত ঘুড়ির ঝাঁক জমে আকাশে।

ঝাঁক আর কই? এ কথা অবশ্য সবাই জানে। সুকুমারকাকু আর বসে না ঘুড়ি নিয়ে। পাড়ায় একটাও দোকান নেই। ‘কেনেই না কেউ। পোষাবে না’– বলছিল সুকুমারকাকু। কাটা ঘুড়ির পিছনে উন্মাদের মতো দৌড় আর নেই। নেই বিপদ অগ্রাহ্য করে পাঁচিল ডিঙিয়ে কাটা ঘুড়ি নামাতে চাওয়া। বাজার ছেয়েছে চিনা মাঞ্জায়। নামেই নিষিদ্ধ। কালও দেখলাম খোলা বাজারে বিকোচ্ছে দেড় হাজার গজ পৌনে চারশো টাকায়। দেশি মাঞ্জাও আছে। হাজার গজ তিনশো। মাঞ্জা হাতে দেয় না আর কেউ। চাপরাশ, মুখপোড়া, চাঁদিয়াল, চোরঙ্গী, বাঁশমার, পেটকাটি-রা সব ভোকাট্টা হয়ে গেছে ধীরে ধীরে। এখন থিম-ঘুড়ির বাজার। গতবছর মোদি-ঘুড়ি উঠেছিল খুব। এবারে সেই পালে হাওয়া কম। মন্দা? মাছ ঘুড়ি তাও কিনছে লোকে। ২০ টাকা এক-এক পিস। বড়ো, কিন্তু ফানুস নয়। টেনিদাদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সাধ্য তার নেই।

আজ ছাদগুলো সব ফাঁকাই থাকবে। ফ্ল্যাটেদের উপনিবেশে এমনিতেই বাড়িগুলোর মাথা নিচু। মাঠ নেই। ময়দানে ঘুড়ির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে টোকেন পার্টিসিপেশনে মাতবে কয়েকজন ঘুড়ি-পাগল। তাদের ঘিরেই দেদার ছবি উঠবে। সেই ছবি আপলোড হবে ফেসবুকে। আকাশে আজ কটা ঘুড়ি দেখা গেল, হাতে গুনে লেখা হবে মোবাইল মেসেজ। এখন মাথা-নিচুতেই আমাদের ঝোঁক বেশি। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঝোঁকই নাকি ঘুড়ির ঝাঁক কমিয়ে নিচ্ছে আকাশ থেকে। আর, আমাদের ওড়ার ইচ্ছেগুলো? টেনে ও ছেড়ে খেলাগুলো? টুপুরদির ছাদ, না দেখতে পাওয়া ছাদে সেই একজনের মাথা তুলে ঘুড়ি দেখা সন্ধেগুলো?

ভো-কাট্টা!  

Developed by DXDasia