বৃদ্ধাশ্রম, ব্লাইন্ড স্কুল ও পথশিশুদের নিয়ে বেতার দিবস উদযাপন আকাশবাণী কলকাতার

আয়োজনে আকাশবাণী কলকাতার এফ এম বাংলা বিভাগ

“Radio: A century informing, entertaining and educating” 

০২৪ সালের বিশ্ব বেতার দিবসের এই বিষয়ই বুঝিয়ে দেয় পৃথিবীটা ছোটো হতে হতে মুঠোফোন আর ইন্টারনেটের দৌলতে হাতের মুঠোয় এলেও সুস্থ বিনোদন, শিক্ষা এবং সঠিক তথ্যের ঠিকানা হিসাবে রেডিওর পথচলা এক শতকেরও বেশি সময় ধরে জারি আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেডিও শোনার মাধ্যম হয়তো বদলেছে কিন্তু জীবনকে ‘বেটার’ বানাতে আজও অনেক মানুষের ভরসা ‘বেতার’। বেতারের প্রতি এই ভালোবাসার টানেই বিশ্ব বেতার দিবস-এ মিলে গেল দুই পক্ষ। আকাশবাণী কলকাতার এফ এম বাংলা বিভাগের রেডিও কর্মীরা গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সারাদিন বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন বেতার দিবসের আনন্দ।

কখনো শোভাবাজার সুতানুটি মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন পথ শিশুদের সঙ্গে, কখনো দেবাঙ্গন বৃদ্ধাশ্রমে, আবার কখনো নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ একাডেমির ছাত্রদের সঙ্গে দিনটি উদযাপনে মেতে ওঠেন রেডিওর আধিকারিক এবং উপস্থাপকরা। তাঁদের সঙ্গে গানে-গল্পে মেতে ওঠেন বিভিন্ন বয়সী শ্রোতারা, ভাগ করে নেন তাঁদের রেডিও শোনার অভিজ্ঞতা। আর সমাজের দৌড়ে পিছিয়ে পড়া পথশিশুদের জীবনকে একটু সুন্দর করতে এই বিশেষ দিনে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রেডিও সেট।

বহুজন হিতায় চ বহুজন সুখায়’ ভারতীয় বেতারের এই মূল মন্ত্রকে মনে রেখে প্রতিবছরই বিশ্ব বেতার দিবসের দিনটিতে আকাশবাণী কলকাতা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটিকে উদযাপন করে চলেছে।

শোনার আগ্রহ মানুষের বহু পুরোনো। সেই বৈদিক যুগ থেকেই মানুষ শুনে মনে রাখার অভ্যাস রপ্ত করেছে। তাই বিভিন্ন দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের পাশাপাশি এখনও মানুষ ভালোবাসে শুনতে- শুনে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে এক কল্প জগত গড়তে।  তাই শ্রাব্য মাধ্যম হিসাবে বিশ্ব জুড়ে রেডিও আজও মানুষের কাছে জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তাকে মান্যতা দিয়েই ২০১১ সালে ইউনেস্কো ১৩ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে বিশ্ব বেতার দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দান করে। উনিশ শতকের শেষভাগে বিশ্ব জুড়ে রেডিওর সম্প্রচার ধীরে ধীরে শুরু হতে থাকে। ১৯২৭ সালের ২৩ জুলাই ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত ভারতে সরকার অনুমোদিত বেসরকারি সংস্থা Indian Broadcasting Company-র তত্ত্বাবধানে তৎকালীন বম্বেতে ভারতবর্ষে প্রথম বেতার কেন্দ্র সম্প্রচার শুরু করলো। Indian Broadcasting Company – র চেয়ারম্যান Sir Ibrahim Rahimtoola তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, “All though by composition ours is a commercial company, it is the earnest desire of the board of directors to work broadcasting in a spirit of public service”. অর্থাৎ প্রথম দিন থেকেই বেতার জনকল্যাণে নিয়োজিত। ওই বছরেই ২৬ আগষ্ট সন্ধ্যা ছ’টা থেকে কলকাতায় বেতার সম্প্রচার শুরু হয়।

‘বহুজন হিতায় চ বহুজন সুখায়’ ভারতীয় বেতারের এই মূল মন্ত্রকে মনে রেখে প্রতিবছরই বিশ্ব বেতার দিবসের দিনটিতে আকাশবাণী কলকাতা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটিকে উদযাপন করে চলেছে। এই প্রসঙ্গে আকাশবাণী কলকাতা এফ এম বাংলা বিভাগের আধিকারিক শুভায়ন বালা বঙ্গদর্শন.ডট কম-কে জানান, “কোভিডের জন্য দুটো বছর বাদ দিলে প্রতিবছরই এই দিনটি আমরা পালন করি। মানুষও চাইছেন রেডিও তাদের কাছে আসুক। স্টুডিওর বাইরে গেলে বুঝতে পারা যায় মানুষের কাছে রেডিওর গ্রহণযোগ্যতা এখনও যথেষ্ট।” 

সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য বিনোদন এবং তাদের সঠিক তথ্য দেওয়ার দায়বদ্ধতা রেডিও পালন করে চলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও হ্যাম রেডিওকে সঙ্গী করে ঘটনাস্থল থেকে মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব পালন করেছে আকাশবাণী এফ এম। শ্রী বালা আরও জানান, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেডিওকেও আধুনিক হতে হচ্ছে। শুধু রেডিও সেট নয়, অ্যাপের মাধ্যমেও এখন রেডিও শোনার ব্যবস্থা হয়েছে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও এখন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে। ফলে চিরাচরিত মাধ্যমের পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম নতুন মাধ্যমে রেডিওকে আপন করে নিচ্ছে”।

 

এই বছরের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, দেবাঙ্গন বৃদ্ধাশ্রমে, নরেন্দ্রপুর ব্লাইন্ড বয়েজ অ্যাকাডেমিতে এবং পথশিশুদের সঙ্গে নানা অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন তাঁরা। প্রবীণ নাগরিকরা ভাগ করে নিলেন তাঁদের যৌবন দিনের অভিজ্ঞতা, এখনকার রেডিও শোনার কথা। দৃষ্টিহীন ছাত্ররা প্রিয় রেডিও উপস্থাপকদের কাছে পেয়ে তাঁদের সঙ্গে গানে-গল্পে মেতে উঠে জানালো তাদের পছন্দের অনুষ্ঠানের কথা। আর দারিদ্রের করাল গ্রাস যে শিশুদের ঠিকানা করে তুলেছে ‘কেয়ার অব ফুটপাত’, রেডিও কর্মীরা তাদের হাতে রেডিও সেট তুলে দেন। এই প্রসঙ্গে শ্রী শুভায়ন বালা বলেন, “যাদের কাছে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের সংস্থান করাই চ্যালেঞ্জ তারা রেডিও কিনে শুনবে এটা অলীক কল্পনা। তাই বিনা পয়সায় তাদের রেডিও সেট দেওয়া হলো, যাতে রেডিওর অনুষ্ঠান শুনে তারা একটু সচেতন হতে পারে। শিশুরা আগামীর ভবিষ্যত, তাই তারা যাতে স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠান, শিক্ষা মূলক অনুষ্ঠান শুনে নিজেরা সচেতন হয়, বিপথগামী না হয়ে যায় এই লক্ষ্যে আমাদের এই কর্মসূচি”। প্রসঙ্গত তিনি আরও জানান, “স্টুডিওর বাইরে গিয়ে এই ধরনের কর্মসূচি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে উপস্থাপকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায়”।

ট্রানজিসটর থেকে ইয়ারফোন, ঘরের বড়ো রেডিও সেট থেকে হাতের মুঠোফোন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোনার মাধ্যমের বিবর্তন এলেও শুনতে মানুষ আজও ভালোবাসে। আর গান হোক বা গল্প, খেলা থেকে খবর আজও অনেক মানুষ সঠিক তথ্য পেতে কান পাতেন রেডিওতে। তাই শ্রুতি মাধ্যম হিসাবে বিশ্ব জুড়ে রেডিও এখনও প্রাসঙ্গিক।

Post Tags
Developed by DXDasia