নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তি বিষয়ে বিখ্যাত ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় একাধিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন অবলা বসু
‘নারীর ক্ষমতায়ন’ এই শব্দটা তখন অপ্রচলিতই ছিল। নারীবাদ-নারীচেতনা এইসবও কারও মুখে শোনা যায়নি। কেবল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (Bidyasagar) তাড়নায় এবং উদ্যোগে বাংলা তথা ভারত জুড়ে নারীশিক্ষার এক জোয়ার এসেছিল, শুরু হয়েছিল পর্দানসীন নারীদের ক্রমে ক্রমে জনমানসে প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা। বাংলা জুড়ে দিকে দিকে নারীশিক্ষার জন্য বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন শুরু হয়ে গিয়েছে। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও তখন স্কুলে যাচ্ছে, কলেজে যাচ্ছে। বিধবা বিবাহও হচ্ছে দু-একটা। ঠিক তখনই এক বাঙালি মহিলা চিন্তা করছেন বিধবাদের তথা সমস্ত নারী সমাজকেই শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাবলম্বীও হয়েও উঠতে হবে, না হলে নারীর মুক্তি নেই। বিধবা ও দুঃস্থ মহিলাদের জন্য তিনি সর্বদা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনিই পরে আবার প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তিমূলক শিক্ষাদানে মহিলাদের উৎসাহিত করেছেন এবং মহিলাদের জন্য এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সহজসাধ্য করে তোলার চেষ্টা চালিয়েছেন।
১৯১৯ সালে তাঁর প্রচেষ্টাতেই স্থাপিত হয় ‘নারী শিক্ষা সমিতি’। আর এই সমিতির মাধ্যমেই সমগ্র বাংলা জুড়ে মোট ৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৪টি প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন অবলা বসু। বিধবা মহিলারা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে, সে জন্য তিনিই প্রথম বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। আর এই লক্ষ্যেই ১৯২৫ সালে ‘বিদ্যাসাগর বাণী ভবন’, ১৯২৬-এ ‘মহিলা শিল্প ভবন’, পরে ‘বাণীভবন ট্রেনিং স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁরই প্রচেষ্টায়।
পরিচয়ে দুর্গামোহন দাশের কন্যা, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর (Jagadish Chandra Bose) স্ত্রী – অবলা বসু (Abala Bose)। হাল আমলে বেশ কিছু দিন আগে পর্যন্তও নারীর শিক্ষা এবং সঙ্গীতশিক্ষা বা অন্যান্য চারুকলাদি শিক্ষাকে বিয়ের বাজারে দর বাড়ানোর উপকরণ ভাবা হত, এ নিয়ে সেই উনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েই অবলা বসু সতর্ক করে দিয়েছিলেন – ‘নারীর শিক্ষাকে যেন ভালো পাত্র পাওয়ার উপলক্ষ হিসেবে ভাবা না হয়’।
আজকে কলকাতার (Kolkata) বুকে ঐতিহ্যবাহী যে ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ রয়েছে, ঠিক তার উলটো দিকেই একটা পার্কের পাশে লাল রঙের পুরনো বাড়ি দেখা যাবে, ওইটাই ছিল ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়। অবলা বসুর প্রতিষ্ঠিত প্রথম নারীশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯১০ সালে অবলা বসু এই বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদিকা পদে উন্নীত হন, পরে সরলা রায়ের সঙ্গে গোখলে মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠাতেও সাহায্য করেছেন তিনি। ১৯১৯ সালে তাঁর প্রচেষ্টাতেই স্থাপিত হয় ‘নারী শিক্ষা সমিতি’। আর এই সমিতির মাধ্যমেই সমগ্র বাংলা জুড়ে মোট ৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৪টি প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন অবলা বসু। বিধবা মহিলারা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে, সে জন্য তিনিই প্রথম বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। আর এই লক্ষ্যেই ১৯২৫ সালে ‘বিদ্যাসাগর বাণী ভবন’, ১৯২৬-এ ‘মহিলা শিল্প ভবন’, পরে ‘বাণীভবন ট্রেনিং স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁরই প্রচেষ্টায়। এই সব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মহিলাদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলিতে তাঁদের শিক্ষয়িত্রী হিসেবে নিযুক্তও করতেন অবলা বসু। কৃষ্ণপ্রসাদ বসাকের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মুরলীধর গার্লস কলেজ। শুধু তাই নয়, নারীশিক্ষা ও নারীর মুক্তি বিষয়ে ইংরেজিতে বিখ্যাত ‘মডার্ন রিভিউ’ (Modern Review) পত্রিকায় একাধিক প্রবন্ধও লিখেছেন অবলা বসু।
প্রথমে বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় এবং পরে বেথুন স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে চেয়েছিলেন ডাক্তারি পড়বেন। মেয়েরা তো ঘর-কন্না করবে, হাতা-খুন্তি ধরা হাতে ছুরি-কাঁচি ধরা, গরম মশলার গন্ধের বদলে কাঁচা রক্তের আর ফর্মালিনের গন্ধ সহ্য করা কি সম্ভব! পুরুষরা তো জায়গা ছাড়তে নারাজ। তাছাড়া সেকালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার নিয়মও ছিল না। পরে ১৮৮৪ সালে অনেক বাধা পেরিয়ে কাদম্বিনী গাঙ্গুলিই প্রথম মেডিকেল কলেজে পড়তে পেরেছিলেন। ভর্তি হওয়ার পরেও রক্ষণশীল শিক্ষকদের কাছ থেকেও নানাবিধ বাধা এসেছিল কাদম্বিনীর জীবনে। অবলা বসু মনে-প্রাণে চেয়েছিলেন ঐ সাদা গাউন আর গলায় স্টেথোস্কোপ (Stethoscope) ঝুলিয়ে মানুষের সেবা করবেন। মেডিকেল কলেজে (Medical College) নিয়মে আটকালো। ডাক্তারি পড়ার রোখ পাল্টালো না তাঁর। কলকাতা ছেড়ে সোজা চলে গেলেন মাদ্রাজে। উনবিংশ শতাব্দীর বুকে দাঁড়িয়ে মাদ্রাজে গিয়ে এক বাঙালি মহিলার ডাক্তারি পড়া এক স্বপ্নাতীত ব্যাপার ছিল। বরিশালের মাটিতে বড় হয়ে ওঠা অবলাকে প্রথমে ছাড়তে চাননি তাঁর বাবা দুর্গামোহন। বাঙালির কাছে মাদ্রাজই তখন বিদেশ-বিভুঁই। কিন্তু কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি! প্রথম বাঙালি মহিলা হিসেবে অবলা বসুই ডাক্তারি পড়া শুরু করলেন। এদিকে মাদ্রাজে সেই সময় মেয়েদের থাকার জন্য কোনো হস্টেলের ব্যবস্থাও ছিল না। এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট (PG) হিসেবে থাকতে শুরু করেন তিনি। মনে জোর ছিল অদম্য, কিন্তু শরীর সায় দিল না। এত দূরে এসে পড়তে শুরু করার স্পৃহা দেখিয়েছিলেন তিনিই, সে কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু দু বছর পড়ার পরেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে মাঝপথেই পড়া ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন অবলা বসু। তা নাহলে কাদম্বিনী গাঙ্গুলির (Kadambini Ganguly) আগে তিনিই হতে পারতেন প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার।
কলকাতার ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ (Basu Bigyan Mandir) প্রতিষ্ঠায় আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর অবদানের কথা যত বেশি আলোকিত হয়, তার তুলনায় আমরা ভুলেই গিয়েছি তাঁর স্ত্রী হিসেবে এর পিছনে অবলা বসুরও কম অবদান ছিল না। একদিকে যোগ্য সহধর্মিণীর মতো দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন, স্বামী হিসেবে জগদীশচন্দ্রের যাতে বিজ্ঞান-গবেষণায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন, অন্যদিকে আবার স্বামীর সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন নানা দেশ। বিজ্ঞান বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য জগদীশচন্দ্র ঘুরে বেড়িয়েছেন নানা দেশে আর তাঁর পাশে সবসময় সফরসঙ্গী ছিলেন অবলা বসু। তাঁর এই ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছিল ১৩৩২ বঙ্গাব্দে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাঙ্গালী মহিলার পৃথিবী ভ্রমণ’ প্রবন্ধে। স্বামী জগদীশচন্দ্রের মৃত্যুর পরে তাঁর জমানো টাকা দিয়ে অবলা বসু তৈরি করেছিলেন ‘সিস্টার নিবেদিতা উইমেন্স এডুকেশন ট্রাস্ট’। বেগম রোকেয়ার আগে নারীশিক্ষা ও নারী চেতনার বিস্তারে মুক্তি পথের দিশারী হয়ে উঠেছিলেন খেতাব না পাওয়া লেডি অবলা বসু। সেই ‘অবলা’র কথা অনেকটাই না-বলা থেকে গেছে আজও।