দূরে বসলে কাছে ডেকে নিতেন
২০০৬। সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা হবে, নন্দীগ্রামে হবে কেমিকাল হাব, হরিপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ। জমি চাই, যে করেই হোক। শিল্প তথা উন্নয়নের নামে সে সময় এই রাজ্যের কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চরমে পৌঁছোয়। শিল্পী, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি – এক কথায়, সব শ্রেণির মানুষ প্রতিবাদের মঞ্চ গড়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, গড়ে ওঠে একাধিক মঞ্চ, যার অন্যতম প্রধান শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মী-বুদ্ধিজীবি মঞ্চ। সে মঞ্চের সভাপতি হলেন অধ্যাপক তরুণ সান্যাল, সর্বজনের সম্মতিতে। সম্ভবত সংশয় ও শঙ্কা ডিঙ্গিয়ে আসতে কারও কারও সময় লেগেছিল, কিন্তু পথচলা শুরু হলে আর কোনও সংশয়, আর কোনও শঙ্কা থাকেনি যে তার অন্যতম কারণ মঞ্চ সভাপতির ব্যক্তিত্ব, নিঃস্বার্থ কর্মতৎপরতা।
যখন সবে কবিতা বা সাহিত্যচর্চায় আকৃষ্ট হয়েছি তখন থেকে কবি তরুণ সান্যালের সাথে পরিচয়। তখনও চোখে দেখিনি, শুধু যেন বাঁশি শুনেছি। স্কটিশ চার্চ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক, ব্যস্ত মানুষ – ভয়ে কাছে যেতে পারিনি। যেতে পারি অনেক পরে, তাঁর প্রিয় ছাত্র শৈবালদা(বিশিষ্ট লেখক প্রয়াত শৈবাল মিত্র) ভুল ভাঙ্গালে – চিনতে পারি আপাত গম্ভীর অধ্যাপকের আড়ালে থাকা সেই সুরসিক গুণী মানুষটিকে। পান্ডিত্য যেমন, তেমন মেধা ও স্মৃতিশক্তি।
বুদ্ধিজীবি মঞ্চের ও অন্য বহু সংগঠনের অনুষ্ঠানে একসাথে গেছি, কখনও পাশে বসেছি, কখনও দূরে। দূরে বসলে কাছে ডেকে নিতেন। কথা হতো – মানে প্রধানত উনি বলতেন আমি ও আমার মতো কিছু মানুষ শুনতাম।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন পর্বে তরুণদা বলতে শুরু করলে অনেকে নীচুস্বরে মন্তব্য করত, উনি যেভাবে ভূগোল –বিশ্ব-ইতিহাস ঘাঁটছেন, বর্তমানে বুঝি আজ আর পৌঁছোতে পারলেন না! এমন অনেককে তিনি একপ্রকার ঝাঁকুনি দিয়ে আবেগ সরিয়ে অর্থনীতি-দর্শন-সমাজ-রাজনীতি বুঝিয়েছেন।
২০০৯ সালের ১ অক্টোবর আমরা অনেকে মিলে ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবিদের প্রতিবাদ’ নামে একটি প্রেস বিবৃতি প্রকাশের আয়োজন করি, এমন অনেক যৌথ বিবৃতি সে সময় প্রকাশ করা হয়েছে, যে সামান্য কয়েকজন মানুষ নির্দ্বিধায় সেসব বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিতে রাজি হতেন তরুণদা তাঁদের একজন। ইতোমধ্যে তাপসী মালিকের হত্যার নিন্দায় কবি তরুণদা লিখেছেন – তাপসী মালিকের জন্য ব্যালাড। তাঁর লেখায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার ও তার মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফুটে উঠত শ্লেষ ও ধিক্কার। আমরা উজ্জীবিত হতাম।
বুদ্ধিজীবি মঞ্চের সল্টলেক শাখার উদ্যোগে একটি পত্রিকা (শাণিত প্রহর – নামটি তাঁর কন্যা শতরূপার দেওয়া) প্রকাশের আয়োজন হলে তিনি খুব খুশি হন। বিশেষত আমি সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছি জেনে(সপ্তাহ পত্রিকায় তখন নিয়মিত লিখতাম, তরুণদার নাকি তা ভালো লাগত – তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠার সেও এক কারণ)। তিনি তখন ‘সপ্তাহ’ পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি (নামকাওয়াস্তা নয়, যথেষ্ট সময় দিতেন।), প্রতিষ্ঠিত কবি, গণ-আন্দোলনের শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় মানুষ। চাইতেই তাঁর লেখা পেলাম। পেলাম তো, সমস্যা হল সে লেখার পাঠোদ্ধার করা (তরুণদার হাতের লেখা, অন্তত তখন, বেশ খারাপ)।
মানুষ তরুণদার পাঠোদ্ধারে কখনও কারও সমস্যা হয়নি। সম্ভবত তাঁর কোনও শত্রু ছিল না, বিরুদ্ধ মতের মানুষের সঙ্গেও সহজে মিশতেন, বিরুদ্ধ মতকে সম্মান দিতেন।
তিনি নিজে সম্মান পেয়েছেন, পুরস্কার পেয়েছেন কিন্তু কদাচ মাথা নোয়াননি। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা, পরিবর্তনের অন্যতম ঋত্বিক তিনি নতুন সরকারের কাছে কিছু পাননি – চাননি তো কিছু, নতুন সরকারের ভুল-ত্রুটির নিন্দে করছেন নির্দ্বিধায়।
এমন কাছের মানুষ দূরে চলে গেলেন। বয়স হয়েছিল(৮৪), কিন্তু প্রায় শেষদিন অবধি অটুট ছিল তাঁর স্মৃতি, ঈর্ষণীয় ছিল তাঁর মেধা। হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে সপ্তাহ পত্রিকার সম্পাদক শ্রী দিলীপ চক্রবর্তী বলছিলেন আমাকে, আমার অভিভাবক চলে গেল গো।
শুধু তাঁর নয়, আমাদের সবার অভিভাবক চলে গেলেন।