January 21, 2017 | 12:00 PM

বাংলা সিনেমার শতবর্ষ

আজ্ঞে, হ্যাঁ! এ বছরই বঙ্গ চলচ্চিত্রের শতবর্ষ ।
বিগত শতকের ২৪ মার্চ শনিবার ১৯১৭ তারিখে প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বাংলা নির্বাক কাহিনিচিত্রটি ময়দানের নতুন তাঁবুতে সন্ধ্যে ৬-১৫ ও রাত ৯-৩০-এর দু’টি শো-এ দেখানো হয়। দৈর্ঘ্যে ৭০০০ ফিট, ৫ রিলের এই ছবিটি ছিল সাদা-কালো, ৩৫ মিমি-এ তোলা এবং পর্দায় দেখাতে সময় লাগত ১২০ মিনিট। ইন্টার টাইটেলগুলি ছিল বাংলা ভাষায় । এটা কোনও রিমেক নয় কিংবা নাটকের ছবি তুলেও বানানো হয়নি। এটাই যে প্রথম বাংলা কাহিনিচিত্র তা নিয়ে আজ আর কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই এবং একই সঙ্গে কলকাতায় তৈরি প্রথম কাহিনিচিত্রও বটে। সিনেমাটির নাম, সত্যবাদী রাজা হরিশচন্দ্র ( ইংরেজি নাম–ট্রুথফুল কিং হরিশচন্দ্র)।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবর্তিত(১৮৭৯) ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক, দ্য বেঙ্গলি পত্রিকায় ২৪-৩০ মার্চ ১৯১৭ প্রতিদিন(ছয়-এর পাতায়) ছায়াছবিটির বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল। বয়ান ছিল (সঙ্গের ছবি), দ্য গ্রেট ড্রামাটিক সাকসেস অফ দ্য ইনডিয়ান স্টেজ। অ্যাডাপটেড ফর দ্য স্ক্রিন ফ্রম দা ফেমাস ড্রামা অফ দা সেম নেম অ্যান্ড ফিচারিং দা মোস্ট¬¬¬ বিউটিফুল অ্যান্ড ইমোশনাল স্টার“ মিস সাভারিয়া ” অ্যান্ড সাপোর্টেড বাই দা “আরভিং ” অফ দা ইনডিয়ান স্টেজ “মি. হরমুসজি তান্ত্রা” (এই হরমুসজি ছিলেন বোম্বের থিয়েট্রিকাল কোম্পানির তান্ত্রা সাহেব, এঁকে আরভিং অফ ইনডিয়া বলা হত এবং হরিশচন্দ্রের ভূমিকায় সুন্দর অভিনয় করেছিলেন বলে জানা যায়)। বিজ্ঞাপনে আরও লেখা হয়েছিল, “দিস প্লে হুইচ হ্যাজ হ্যাড এ মোস্ট সাকসেসফুল রান অন দা ইনডিয়ান স্টেজ ফর দা লাস্ট ফর্টি ইয়ারস। ইট ইস এ প্লে হুইচ পিকচার্স দ্যা লাইফ অফ এ হিন্দু কিং হু সারাউনডেড বাই অল দা গ্র্যানজারস অ্যান্ড লাক্সারি দ্যাট ওয়েলথ কুড গিভ, ইয়েট লিভড্ দা লাইফ অফ নোবিলিটি অ্যান্ড পিওরিটি টু হুম ফলসহুড অ্যান্ড ইনজাসটিস ওয়ার অ্যাস স্ট্রে়ঞ্জারস অ্যান্ড হুস ভেরি ভারচুস এক্সাইটেড দা ওয়ান্ডার অ্যান্ড দা এনভি অফ দা গডস অ্যাবাভ। সত্যবাদী রাজা হরিশচন্দ্র অ্যান এলফিনস্টোন ফোটো প্লে । অলসো ইন অ্যাডিশন টু দা ফিল্ম মাস্টারপিস এ সেনসেশনাল অ্যান্ড থ্রিলিং ড্রামা এনটাইটেলড ফর দা সেক অফ হার চাইল্ড প্রোডিউসড বাই “ড্যানমার্ক ফিল্ম কোম্পানি ” ইন থ্রি রিলস-১০০০ ফিট লং উইল বি স্ক্রিনড ফর দা ফার্স্ট টাইম ইন ইন্ডিয়া (অর্থাৎ সঙ্গে আরেকটি ছবি ফ্রি দেখানো হত)।”

চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন নিত্যবোধ বিদ্যারত্ন, ক্যামেরা চালিয়েছিলেন জ্যোতিষ সরকার। ইনি ছিলেন সেকালের বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান এবং ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ছিল বলে সবাই চাচা ডাকত। তান্ত্রা ও সাভারিয়া ছাড়াও ছবিতে অভিনয় করেছিলেন গহরজান ও বেহরামশ। পরিচালক ছিলেন রুস্তমজি ধোতিওয়ালা। এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন ও সুভদ্র। একজন সাধারণ কর্মচারী থেকে হয়ে উঠেছিলেন ম্যাডানের ডান হাত ক্রমে ম্যানেজার এবং পরে জামাই। বিল্বমঙ্গল (১৯১৯) ও মহাভারত(১৯২০) ছিল তাঁরই পরিচালনা।

ছবিটির প্রযোজক এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ এবং ডিস্ট্রিবিউটর ম্যাডান থিয়েটার। আদতে এই দু’টোই ছিল জে এফ ম্যাডান বা জামসেদজী ফ্রামজি ম্যাডানের কোম্পানি। পার্সি এই ব্যবসায়ী ১৯০৫ (মতান্তরে ১৯০১) সাল থেকে প্যারিসের প্যাথে বা প্যাথে ফেরিস ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে বিদেশি ছবি এনে গড়ের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে সিনেমা দেখাত কারণ কলকাতায় তখন কোনও সিনেমাহল ছিল না। তো এ রকমই একটি টেন্টের নাম ছিল ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ’। এসপ্ল্যানেডে, এখন যেখানে মনোহর দাস তড়াগ তার উত্তর দিকে ছিল ম্যাডানদের তাঁবু। ক্ষতির চোটে প্যাথে ফেরিস কলকাতার ব্যবসা গুটিয়ে রেঙ্গুন চলে গেলে ম্যাডান স্বাধীন ভাবে ইউরোপ আমেরিকা থেকে সরাসরি ছবি এনে দেখাতে শুরু করল। এলফিনস্টোনকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।  ১৯১৭ থেকে ম্যাডান যৌথ মুলধনী কোম্পানি হিসেবে কাজ শুরু করে জগৎ জোড়া খ্যাতি অর্জন করে। অবিভক্ত ভারত, ব্রম্ভদেশ,সিংহল প্রভৃতি জায়গায় তাদের দু-শোর বেশি প্রেক্ষাগৃহ ছিল। প্রদর্শন থেকে প্রযোজনার যাত্রাপথে এই সিনেমাটি ছিল প্রথম।

গোটা দুনিয়ায় সে-বছর(১৯১৭)মুক্তি পেয়েছিল চ্যাপলিনের-দ্য অ্যাডভেঞ্চারার, দা কিওর, ইজি স্ট্রিট, দা ইমিগ্র্যান্ট ; জন ফোর্ডের–বাকিং ব্রডওয়ে, দা টর্নাডো;  সিসিল বি ডেমেলির-এ রোমান্স অফ দা রেডউডস, সুইডেনে ভিক্টর সোস্ট্রমের এ ম্যান দেয়ার ওয়াজ, বাস্টার কিটনের-ও ডক্টর, দা বুচার বয়; জার্মানিতে-দা পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে প্রভৃতি।

দেশের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লি চলে গেছে সাড়ে পাঁচ বছর আগে কিন্তু জালিয়ানওয়ালবাগের হত্যাকাণ্ড হতে তখনও দু-বছর বাকি ওদিকে গান্ধি বিহারের চম্পারন জেলা থেকে সত্যাগ্রহ শুরু করেছেন আর ১৫ মার্চ ১৯১৭ জারের ১৯৬ বছরের রাশিয়ান সাম্রাজ্যের(জার) পতন ঘটিয়ে একটা মিলিজুলি সরকার গড়ে উঠছে যেটা আবার লেনিনের নেতৃত্বে(বলশেভিক) নভেম্বর বিপ্লবে পরাজিত হবে এবং এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

এক-শো বছর আগে এমন এক কালসন্ধিতে প্রথম বাংলা সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল।

গবেষণা সহায়তা : অভিজিৎ গোস্বামী
কৃতজ্ঞতা – কালীশ মুখোপাধ্যায়ের বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস, গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষের সোনার দাগ, ফ্ল্যাশব্যাক(টাইমস প্রকাশনা), বেঙ্গলি ফিল্ম ডায়েরি এবং জাতীয় গ্রন্থাগারের নিউজপেপার সেকশন ।

Written by