যুব আইকনের নাম — বিবেকানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন গরিবগুর্বোদের দেশ-দুনিয়া চেনাতে

থ্য বলছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারত সবচাইতে বেশি যুবদেরও দেশ। অর্থাৎ কিনা এই দেশের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই যুব। বিপুল জনসংখ্যা বা যুবসংখ্যার এই দেশে তিনি কী পেরেছিলেন, ইতিহাসের কাছে তার দায় বা ওজন কতটা, নিশ্চিত করে তার উত্তর আছে ইতিহাসের গর্ভে, ভারতাত্মার মধ্যেই। তা না হলে বিপুল জনসংখ্যার দেশে মনীষীর সংখ্যাও বহু, মহামানবও, সম্ভবামিঃ যুগে যুগে — যুগে যুগে এসেছেন প্রচুর। এক সন্ন্যাসীর জন্মদিন কখনও একটা গোটা দেশের যুব দিবস হতে পারত না, আবেগ উন্মাদনা ও ইতিহাসকে বাদ দিয়ে। চিরায়ত কাল থেকে আজ অবধি এই দেশের তাই, সবচাইতে বড়ো যুব আইকনের নাম — বিবেকানন্দ। যে আইকন, একান্ত অর্থে ভারতীয় ও ভারতের আইকন। কেবল মূর্তি বা মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে বলেননি, বলেছিলেন, গরিবগুর্বোদের দেশ-দুনিয়া চেনাতে। এই সন্ন্যাসী আইকনের মূর্তি পুনঃস্থাপিত যখন হল দেশের অন্যতম সেরা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমরা দেখেছি গোলমাল তখনও চরমে উঠেছিল। গোলমালটি আদতে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত নয়। বরং আমাদের চিন্তা চেতনা ও অভ্যাসেও নিহিত।

১২ জানুয়ারি, জাতীয় যুব দিবস। দেশ‌ জুড়ে আর চার-পাঁচটা বিশেষ দিন বা ছুটির দিনের মতোই আবেগ উন্মাদনা থাকে যথাযথ। বিবেকানন্দ জয়ন্তী বলে কথা! তিনি, যিনি বলেছিলেন, আগামী পঞ্চাশ বৎসর গরীয়সী ভারতমাতাই আমাদের একমাত্র উপাস্য হউক। ফলতঃ স্বভাব-দাসত্বজনিত প্রতিযোগিতা চলে, কে কত বড়ো মিছিল ও সমাবেশ করে স্বামীজির মূর্তির কাছে বা স্বামীজির বাড়ি পৌঁছতে পারে! তারপর কী হয়, জানে শ্যামলাল!

‘তুহুঁ তুহুঁ, ম্যাঁহ ম্যাঁহ’। বক্তৃতার ঘনঘটা, তেজোদৃপ্ত চিৎকার, সুমধুর মাইক্রোফোন-ধ্বনি, স্লোগানের গান পয়েন্ট আর ম্যারাথনের মিষ্টি আমেজে মোটামুটি আমাদের চেনা মৌতাত। এক ঝলকে, জাতীয় যুব দিবস। কোথাও কোথাও বসে আঁকো, ইত্যাদিও, যে হয় না তা নয়। ভাগ্যিস কোথাও এমন কোনো প্রতিযোগিতা হয় না, যার নাম ‘বসে ভাবো’।

বালাই ষাট!

বিবেকানন্দ স্বীকার করেছেন ধর্মের স্ববিরোধিতার কথা। “হিন্দুধর্মের ন্যায় আর কোনো ধর্মই এত উচ্চতানে মানবাত্মার মহিমা প্রচার করে না, আবার হিন্দুধর্ম যেমন পৈশাচিকভাবে গরীব ও পতিতের গলায় পা দেয়, জগতে আর কোনো ধর্ম এরূপ করে না।” তাঁর লেখায় দুটোই আমরা পাই। তাই হয়তো শেষ বিচারে তিনি কেবলমাত্র শিকাগো ধর্মমহাসম্মেলনে কেবলমাত্র হিন্দু ধর্মধব্বজী প্রচারকমাত্র নন। কালের বিচারে তিনি ‘যুগনায়ক’। সমকালের স্পর্ধিত স্পন্দন। নিশ্চিত ভাবে আইকন, নিজের যুগেও। পরবর্তী সময়েও।

“হিন্দুধর্মের ন্যায় আর কোনো ধর্মই এত উচ্চতানে মানবাত্মার মহিমা প্রচার করে না, আবার হিন্দুধর্ম যেমন পৈশাচিকভাবে গরীব ও পতিতের গলায় পা দেয়, জগতে আর কোনো ধর্ম এরূপ করে না।” বিবেকানন্দের লেখায় দুটোই আমরা পাই। তাই হয়তো শেষ বিচারে তিনি কেবলমাত্র শিকাগো ধর্মমহাসম্মেলনে কেবলমাত্র হিন্দু ধর্মধব্বজী প্রচারকমাত্র নন। কালের বিচারে তিনি ‘যুগনায়ক’।

যে ধর্ম দুবেলা দুমুঠো ভাত দিতে পারে না, বিধবার অশ্রুমোচন করতে অক্ষম, তাতে তিনি আস্থাশীল নন, বলেছেন বারবার। আবার একথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বারবার‌ যে ধর্মই হল এদেশের প্রাণ। এই কথাগুলির মর্মবাণীকে যথার্থভাবে উদ্ধার ও অনুধাবন করাই তাই এখন আমাদের অবধারিত জরুরি কাজ।

তিনি কোথায় কোন মাংস ভক্ষণ করে কী বলেছিলেন, তাঁর সেই কাজকেই আমরা অনুকরণ করব, যেহেতু বিবেকানন্দ মানতেন না, এই-ই আমাদের যুগাভুমূখী ‘সহজপাচ্য বোধগম্যতা’।

মগজের দৌড়!

তাঁর অসাধারণ মেধা, পরিশ্রমী সাধনজীবন, বেদান্ত ও নানা শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি, সর্বোপরি দেশপ্রেম ও জীবের মঙ্গলের জন্য অনন্য প্রয়াস, এ সবের চর্চা আমরা অত করবো না! করলেও তা নেহাত ক্যামেরার সামনে। মাল্টিমিডিয়া স্ক্রিন‌ বা ফুটেজ সুশোভিত অনলাইনে।

যেটুকু আমাদের ভোগী জীবন যাপনের সমর্থনে উদাহরণ হিসেবে খাড়া করলে আমাদের সুবিধে হবে, সেটুকুই মানব— একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীদেরও এহেন মত ও আচরণও হতাশার। বিবেকানন্দই বোধহয় সবচেয়ে ভ্রান্ত ভাবে উদ্ধৃত হন। মাছি যেমন বর্জ্যতেই বসতে পছন্দ করে, কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীও তেমন দেশের সংস্কৃতি ও শিক্ষার অসারতা বা অপ্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করার জন্য যুগপুরুষ মহাত্মাদের অনর্থক বৃথা আলোচনায় সমধিক আগ্রহী ও মগ্ন।

১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩। সে দিন স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম মহাসভায় দুই ব্যাঙের গল্প বলেছিলেন। কুয়োর ব্যাঙ আর সমুদ্রের ব্যাঙের এক সত্যি উপকথা। সমুদ্রের ব্যাঙ কুয়োয় এসে পড়েছে। কুয়োর ব্যাঙ তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথা থেকে আসছ হে?’ ‘সমুদ্র থেকে।’ এ কথা শুনে কূপমণ্ডূক বললে, ‘কত বড়ো তোমার সমুদ্র? আমার কুয়োর মতো বুঝি?’ সমুদ্র থেকে আসা ব্যাঙ তো অবাক। বললে, ‘ভাই, সমুদ্রের সঙ্গে কি কুয়োর তুলনা চলে?’ কুয়োর ব্যাঙ অবশ্য এ কথা বিশ্বাস করল না, রেগে গেল। শেষে বলল, ‘যাও যাও। আমার কুয়োর থেকে কোনও কিছুই বড়ো হতে পারে না। মিথ্যেবাদী তুমি। যাও বেরিয়ে যাও।’ আমাদের গোলমাল বা সমস্যার যাবতীয় মূল বিন্দু এখানেই নিহিত। আসুন, বিবেকানন্দকে যদি সত্যি সত্যিই, আমরা জনা কয়েক অন্ততঃ প্রকৃত ক্যাপ্টেন বলে মেনে থাকি, মনের আশৈশব অধিনায়ক বলে বরণ করে থাকি, তবে তাঁকে সামনে রেখে শ্রেষ্ঠ ভারত গড়ার লক্ষ্যে মাঠটাকে বড়ো করবার চেষ্টা করি।

জাতীয় যুব দিবসে তথা বিবেকানন্দ জয়ন্তী-তে, তাঁকে অনুসরণই হোক প্রকৃত স্মরণ। যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য।

Developed by DXDasia