
‘সবকিছুর পর যে জিনিসটা দরকারি হয়ে দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে নির্জনতা’
তুমি জানতে চেয়েছিলে তোমার কবিতাগুলো আদৌ কিছু একটা হয়েছে কিনা। তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ছাড়াও আরো অনেকের কাছেই জিজ্ঞেস করেছো এই প্রশ্ন। তুমি ম্যাগাজিনে পাঠিয়েছো তোমার কবিতা, তুলনা করেছো অন্যদের সাথে, আর হতাশ হয়েছো নিশ্চয়ই যখন প্রকাশকেরা ফিরিয়ে দিয়েছে তোমাকে। এখন (যখন তুমি আমার উপদেশ চাইছো) আমি মিনতি করছি তুমি এসব করা বন্ধ করো। তুমি নিজের বাইরে তোমাকে খুঁজেছো, আর এই জিনিসটাই তোমাকে বন্ধ করতে হবে। কেউ তোমাকে উপদেশ দিতে পারবে না, কেউ সাহায্য করতে পারবে না, কেউ না। তোমায় শুধু একটা কাজ করতে হবে। নিজের ভেতরে তাকাও। খুঁজে বের করো সেই কারণ যেটা তোমায় লিখতে আদেশ করে; তোমার হৃদয়ে শেকড়ের মতন ছড়িয়ে পড়েছে কিনা সেই প্রণোদনা; নিজের কাছে এই বলে স্বীকারোক্তি আদায় করো যে যদি তোমার জন্য লেখালেখি নিষিদ্ধ হয় তবে কি মৃত্যুই তার চেয়ে ভাল নয়? তারপরেও, গভীর রাতের নির্জনতায়, একাকী প্রহরে, নিজেকে প্রশ্ন করো – “আমায় কি লিখতেই হবে?” চলে যাও মনের অতলে, খুঁড়ে বের করো গভীর কোন উত্তর। যদি প্রতিধ্বনি আসে সম্মতির, যদি এই ভাবগম্ভীর প্রশ্নের জবাবে বের হয় বলিষ্ঠ অথচ সরল উত্তর “অবশ্যই”, তবে নিজের জীবনকে বানাও সেভাবে; তোমার সম্পূর্ণ জীবন, এমনকি তোমার জীবনের সবচেয়ে নগণ্য আর উদাসী মুহূর্তগুলোও যেন হয়ে ওঠে এই তাড়নার সাক্ষী আর প্রতীক। তারপর প্রকৃতির কাছে এসো আর – ‘এইরকম কেউ চেষ্টা করেনি’ – এমনটা ভেবে তুমি উচ্চারণ করো তোমার দর্শন, তোমার অনুভূতি, তোমার ভালোবাসা, তোমার ভীতি। ভালোবাসার কবিতা লিখবে না, সেই ফর্মগুলো এড়িয়ে চলো যেগুলো খুব বেশি সহজ সাধারণ – এগুলো নিয়ে কাজ করা খুবই কঠিন। মহিমান্বিত ঐতিহ্যময় প্রাচুর্যতায় ভরা স্বতন্ত্র এসব কাজের সৃষ্টি করতে বিশিষ্ট গুণশক্তিসম্পন্ন আর পরিপক্ক মানসিকতার প্রয়োজন। তাই নিজেকে উদ্ধার করো এসব সার্বজনীন বিষয়বস্তু থেকে আর লিখতে থাকো তোমার প্রতিদিনের চারপাশকে নিয়ে, ওরা তোমায় কী দিচ্ছে; তোমার দুঃখ, তোমার কামনা, যে চিন্তাগুলো হঠাৎ এইমাত্র তোমার মন ছুঁয়ে গেলো, কোন সৌন্দর্যে বিশ্বাস করা। এইসবকিছু ধীরে ধীরে বর্ণনা করো হৃদয়ানুভূতি দিয়ে, নীরব বিনয়ী অকৃত্রিম আন্তরিকতা দিয়ে। যখন প্রকাশ করছো নিজেকে, মনে রেখো তোমার চারপাশের কথা, স্বপ্নে দেখা সেই প্রতিচ্ছবিগুলো, অথবা স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা কিছু। যদি তোমার চারপাশের পরিবেশ ফকিরী হয়, তবে চারপাশকে দোষ দিও না, দোষ দাও নিজেকে; স্বীকার করে নাও যে তুমি যথেষ্ট কবি নও চারপাশের রত্নভাণ্ডারকে খুঁজে নিতে; কারণ স্রষ্টা তো দরিদ্র নন; দারিদ্র্য এবং মামুলি নিস্পৃহতা তো তাঁকে ছোঁয় না। যদি তুমি কখনও কারাগারের অন্ধকার দেয়ালে আটকা পড়া কোনো প্রাণ হও, তখন কি তোমার অমূল্য ছেলেবেলা তোমার সাথে থাকে না? তোমার মহামূল্যবান সেই স্মৃতিঘর কি অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে? মনোযোগ দাও। ডুবে যাওয়া সেই অনুভূতিগুলো কেচে তুলে আনো অতীতের সেই বিশালাকায় হ্রদ থেকে; তোমার ব্যক্তিত্ব শক্তিশালী হবে, তোমার নির্জনতা বেড়ে যাবে, প্রসারিত হবে, তুমি নিজেকে খুঁজে পাবে এমন এক জায়গায় যেখানে তুমি বাঁচতে পারবে সন্ধ্যার সেই গোধূলিলগ্নে, সেখানে অন্য মানুষের শব্দগুলো তোমায় আলতো ছুঁয়ে চলে যাবে, অনেক দূরে, বহুদূরে; আর ডুবে যাওয়া এই সময় থেকে, ডুবে যাওয়া এই নিজস্ব জগত থেকে যদি কখনও কবিতা আপনমনে নিজেই বেরিয়ে আসে, তখন তুমি ভুলেও আর অন্য কাউকে এটা জিজ্ঞেস করার কথা চিন্তাও করবে না যে কবিতাগুলো উত্তম হয়েছে, নাকি অধম। তুমি পত্রিকাগুলোকেও আর এগুলোর প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চাইবে না কারণ এগুলো তখন তোমার সহজাত সম্পদ, তোমার জীবনের একটা অংশ, তোমার কন্ঠস্বর। প্রয়োজন হতে উদ্ভূত শিল্পই উত্তম। বিচারের জন্য শুধু এই একটি মাপকাঠিই যথেষ্ট। তাই এখন, জনাব, আমি তোমাকে আর কোন উপদেশ দিতে পারছি না, শুধু বলবো – নিজের অতলে হারিয়ে বহমান জীবনের সন্ধানে পথে নামলেই কোনো এক সময় এর উৎসে তুমি তোমার উত্তর পেয়ে পাবে, সেই প্রশ্ন, যে তোমায় আদৌ কোনকিছু সৃষ্টি করতে হবে, নাকি না।
সবকিছুর পর যে জিনিসটা দরকারি হয়ে দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে নির্জনতা, বিস্তীর্ণ অন্তরের নির্জনতা। নিজের পাশে হাঁটা আর কারও সাথে দেখা না করা, ঘন্টার পর ঘন্টা। নবজাতকের মতন নিঃসঙ্গ যখন প্রাপ্তবয়স্করা চারপাশে হেঁটে যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপ করতে করতে। সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ বটে কারণ তাদের দেখাতো ঠিক তেমনই ব্যস্ত। তুমি তাদের কর্মকাণ্ডের কোনকিছু একটা ফোঁটাও বুঝতে পারতে না। আর তারপর যখন তুমি বুঝতে পারলে যে তাদের কর্মকাণ্ডগুলো সবই জীর্ণ ছেঁড়াখোঁড়া হীন; যে তাদের কাজের ঝোঁকগুলো সবই শীতল ফসিল হওয়ার দিকে; যে তারা আর জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়; তখন কী ক্ষতি যদি জগতের প্রতি তোমার দৃষ্টিভঙ্গি হয় একটা শিশুর মতন? অচেনা কোনকিছুর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার মতন? নিজের নির্জনতার সেই জগত থেকে সবকিছুকে দেখার মতন, সে জগতটাই তোমার কর্ম, তোমার স্ট্যাটাস, তোমার অনুপ্রেরণা। রক্ষণশীলতা আর অবজ্ঞার বিনিময়ে কেন তুমি ফিরিয়ে দেবে তোমার সেই শিশুসুলভ জ্ঞানী-না-বোঝা চরিত্র, কারণ ওই সবকিছুকে না বুঝতে চাওয়াই তো সেই একাকী নির্জনতার পথে হাঁটা…
(রাইনার মারিয়া রিলকে-র Letters To A Young Poet-এর নির্বাচিত অংশ। অনুবাদ – আকাশ অম্বর)
