
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জল রেখে যেতে হলে ভাবুন এখনই
অরুনকান্তি বিশ্বাস (পরিবেশ বিজ্ঞানী, নিরী)
কথায় আছে পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ জল এবং বাকি টুকু স্থল। তবুও আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপদ জলের জন্য ভাবতে হচ্ছে, ভবিষ্যত প্রজন্মদের সুষ্ঠুভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং জীবজগতকে সুস্থ্ পরিবেশে টিকিয়ে রাখার জন্য। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ জলের মধ্যে ব্যবহারযোগ্য জল অর্থাত পানীয়, কৃষিকাজ, গৃহস্থালি বা অন্যান্য কাজের জন্য কতটা জল লাগে ও লবণাক্ত জল কতটা তার কথা বলতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে মোট জলের শতকরা সাড়ে সাতানব্বই ভাগ (৯৭.৫%) জল লবনাক্ত আর শতকরা আড়াই ভাগ (২.৫%) জল ব্যবহার যোগ্য। তার মধ্যে আবার সাড়ে চুয়াত্তোর ভাগ (৭৪.৫%) জল রয়েছে বরফে ঢাকা ও তুষার শৃঙ্গে আটকে আছে। আর মাত্র শতকরা শূন্য তিন ভাগ (০.৩%) জল পাওয়া যায় নদীতে, জলাশয়, পুকুরে, বাঁধে বা ঝিলে এবং শতকরা মাত্র এক ভাগ (১%) জল মাটির নীচে আটকে আছে।
সাধারণভাবে জলকে আমরা গৃহস্থালী – যেমন পানীয়, রান্না, স্নান, শৌচ কাজ, জামা কাপড় কাচা, বাসনপত্র ধোয়া, গৃহপালিত জীবজন্তু প্রতিপালন, কৃষিকাজ ও কল কারখানার কাজে ব্যবহার করি। দেখা যাচ্ছে কৃষিকাজে, খাদ্যশস্য উত্পাদনের জন্য কমপক্ষে শতকরা আশিভাগ (৮০%) জল, কলকারখানা ও তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রের জন্য শতকরা দশ ভাগ (১০%) জল, পানীয় হিসেবে শতকরা পাঁচ ভাগ (৫%) জল ও বাকিটা অন্যান্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।
ভূপৃষ্ঠের জলকে পরিশোধনের মাধ্যমে পানীয় জলে রূপান্তরিত করার বিশেষ পদ্ধতির মধ্যে ধীরগামী পাতন (Slow Sand Filter) ও দ্রুতগামী পাতন (Rapid Sand Filter) প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্য। সাথে থাকে জীবানু মুক্ত করার জন্য ক্লোরিনেশন বা ব্লিচিং পাউডারের ব্যবহার। ভূগর্ভস্থ জল শুধুমাত্র জীবানুমুক্ত করা হয়ে থাকে। তবে ইদানিংকালে জলে কিছু ধাতুকল্প যেমন ফ্লুরাইড, আর্সেনিক পাওয়া যাচ্ছে, এবং তার উপস্থিতি ভীষণভাবে ক্ষতিকারক, যা পরিশোধনের খুবই দরকার।
পরিকল্পনাহীন ভাবে ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার করার দরুন জলের তল নেমে যাচ্ছে। কিভাবে তা সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায় তা আমাদের ভাবতে হবে। জল সমস্যার মধ্যে প্রধান সমস্যা হল তার গুণগতমান। কারণ পৃথিবীতে রোগের সংখ্যা যদি একশো হয় তাহলে তার মধ্যে আশিটি রোগের বাহক হচ্ছে জল। শিল্প কারখানায় ও মানুষের বসতিতে ব্যবহৃত অপরিশোধিত জল দূষিত করে চলেছে ব্যবহারযোগ্য জলকে। থাকছে ব্যাকটেরিয়া, লোহা, তামা, সীসা, পারদ দস্তা, ক্যাডমিয়াম, ফ্লোরাইড, কার্বোনেট ইত্যাদি এবং তাপবিদ্যুত কেন্দ্র থেকে নির্গত গরম জল। গুণগতমানে ভূগর্ভস্থ জলে আরও কয়েকটা যৌগ থাকছে যেমন- আর্সেনিক, ফ্লুরাইড। ব্যবহারযোগ্য জলকে সরকারী উদ্যোগে পরিশোধন করা ছাড়াও আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে জল পরিশোধন ও সংরক্ষণের জন্য।
ব্যক্তিগতভাবে ভূপৃষ্ঠ বা ভূগর্ভস্থ জলকে ফিটকিরি ও কলসীর মাধ্যমে পাতন প্রক্রিয়ার পদ্ধতিতে ও সমষ্টিগত ভাবে ধীরগামী পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জল পরিশ্রুত করা সম্ভব। অবশ্য দুটি ক্ষেত্রেই ব্লিচিং পাউডারের মধ্য দিয়ে জীবানুমুক্ত করা হয়ে থাকে। ফ্লুরাইড বা আর্সেনিকের ক্ষেত্রে ফিটকিরির মাধ্যমে থিতানো বা ভূগর্ভস্থ জলকে সরাসরি পানীয় জল হিসেবে ব্যবহার না করে, অপেক্ষা করে বাসী করে পান করা – তাতে আর্সেনিক বা ফ্লুরাইড দুটোর প্রভাবই অনেকাংশ কমে যায়।
ভূপৃষ্ঠ বা ভূগর্ভস্থ জল যা পাওয়া যাচ্ছে তার পরিমান কিন্তু অসীম বা অনন্ত নয়। জলের তল নেমে যাওয়া ছাড়াও আর্সেনিক, ফ্লুরাইড জাতীয় যৌগকল্পের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে ফলে ধান, গম এবং সব্জীতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এখন দরকার ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্নবীকরণ ও সংরক্ষণ। বৃষ্টির জল রাখার সুষ্ঠু পরিকল্পনা – কখনো পুকুর, কখনো ইঁদারা বা কুয়ো, কখনও ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে, এমনকি বাড়ির ছাদের ক্ষেত্রটিকেও বৃষ্টিধারা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। পাহাড়ি ঝরণার ক্ষেত্রে ছোট ছোট বাঁধের মাধ্যমে জলকে ধরে রেখে ভূগর্ভস্থ জলের পরিমান বাড়ানো যেতে পারে। এই রকম বিভিন্ন পদ্ধতিতে জলের সংরক্ষণ ও পরিচালনের মাধ্যমে জলের জীবনদায়ীনি শক্তিকে আমরা পরম্পরায় সচল রাখতে পারি।
*ইন্ডিয়া ওয়াটার পোর্টাল থকে
