
রবীন্দ্রনাথকে একভাবে চেয়েছিল চিন, অন্যভাবে চিনেছিলেন জু
১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘সব পেয়েছির দেশ’ বিশ্বভারতীতে এলেন জু, কলাভবনের প্রথম চিনা অধ্যাপক হিসেবে। প্রতিকৃতি আঁকলেন ‘বন্ধু’ রবীন্দ্রনাথের। আর আঁকলেন ঘোড়া। রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য শুনে চিনে প্রতিবাদে উত্তাল হল ছাত্ররা। আর জু তাঁকে চিনলেন অন্যভাবে। মাও ৎসে তুং-এর নেতৃত্বে চিনে যখন সাংস্কৃতিক বিপ্লব হচ্ছে, তখন জু তার পুরোভাগে। অথচ, এই মানুষটিই রবীন্দ্রনাথকে আজীবন ভেবেছেন ‘রত্নভাণ্ডার’।
তিনি নাকি শুধুই ঘোড়া আঁকেন! চিড়িয়াখানায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে, জু পিওঁ স্কেচ করেছেন একমনে। সামান্য কালি-জলে সাদা ক্যানভাস চিরে টগবগায় তেজিয়ান টাট্টু। তাঁর ছবি নিয়ে প্রথমদিকে নিন্দায় সরব হয়েছিলেন সমালোচকরা। জু খাঁটি চিনা পদ্ধতিতে নাকি আঁকতে পারেন না। তবুও তুলি থামছে না তাঁর। শুধু ঘোড়া নয়, চীনের বিভিন্ন লোকগাথা। ‘বোকা বুড়োর গপ্প’, ‘তিয়ান হেং আর ৫০০ যোদ্ধা’-র মতো ছবি, চার হাজার বছরের সভ্যতাকে দাঁড় করাচ্ছে বিশ্বের দরবারে।
অন্যদিকে আরো একজন, সেই বীরভূমের মাটিতে গড়ে তুলেছেন ‘সব-পেয়েছি’-র ইস্কুল। সে ইস্কুলে পড়াতে আসেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নামি-দামি সব মানুষ। আসবেন নাই বা কেন! ইতিহাসের মহা সন্ধিক্ষণে যখন পৃথিবীটাকে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিতে উঠে পড়ে লেগেছে ফ্যাসিবাদী-ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো, ঠিক সেই সময়জুড়ে এক বাঙালি কবি দেশে দেশে বিশ্বমৈত্রীর বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন। কখনো সোভিয়েত, কখনো জাপান। রবীন্দ্রনাথ রত্ন খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁর নতুন পাঠশালার জন্য। ডাক পাঠাচ্ছেন সর্বত্র…

১৯৩৯ সালে বিশ্বভারতী এলেন জু, কলাভবনের প্রথম চিনা অধ্যাপক হিসেবে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হব হব। ইতিমধ্যেই জাপানি সৈন্য প্রবেশ করেছে চিনে। তাদের অকথ্য অত্যাচারে ধুঁকছে আমজনতা। মুক্তিফৌজ জোট বাঁধছে পাহাড়ের আনাচে কানাচে। কবি জাপান ঘুরে এসেছেন কিছু বছর আগেই। কিন্তু তাঁকে নিয়ে এখন ‘আসাহি শিনবুন’-এর মত কাগজেও কড়া সমালোচনা বেরোয়। কারণ, তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের বিপক্ষে ধরেছেন কলম। চিনা মানুষদের উপর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব তাঁর কন্ঠ। জু এমন একটি মানুষকে সমব্যথী হিসেবে পেয়ে মনের জ্বালা জুড়োলেন। প্রতিকৃতি আঁকলেন ‘বন্ধু’-র।
শান্তিনিকেতন জু’-র কাছে ‘তীর্থক্ষেত্র’। মন কেড়েছিল হলদে রঙা বাড়ি। তুলি কালিতে ডুবিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন হিমালয়, কিংবা ছুটন্ত ঘোড়া। মোট ৯টি পূর্ণাঙ্গ ছবি এঁকেছিলেন আশ্রমের দিনগুলিতে। অনেকেই বলেন জু’র ‘ঘোড়া’ পূর্ণতা পেয়েছিল ভারতে এসে। তাঁর অঙ্কনশৈলীতে ছাপ ফেলেছিল এক সম্পূর্ণ নতুন দর্শন।
১৯৪০-এ দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। আরোগ্যের খবর পেয়েই জু আঁকেন তাঁর বিখ্যাত ছবি, ‘ঘোড়া’। ‘মনের মানুষকে-ই উপহার দিয়েছিলেন সে ছবি। কবি ছাড়াও জু’র অন্তরঙ্গ চিনা ভবনের প্রতিষ্ঠাতা, অধ্যাপক তান ইউশান, রানী চন্দ এবং অনিল চন্দ।
কবির মৃত্যুর আগেই জু পিওঁ ফিরে যাচ্ছেন দেশে। মাও ৎসে তুং-এর নেতৃত্বে চিনে ঘটছে সাংস্কৃতিক বিপ্লব। মুক্তিফৌজ হটিয়ে দিয়েছে জাপানিদের। জু’র নেতৃত্বে গড়ে উঠছে চিনা চিত্রশিল্পীদের নিজস্ব সমিতি। বিপ্লবের আঙ্গিকে পাল্টাচ্ছে শিল্পভাবনা। পথিকৃৎ হিসেবে রয়ে যাচ্ছেন জু।
১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন চিন সফরে। অস্থির সময়ে, চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝে কারো কারো কাছে একপেশে ঠেকেছিল কবির আধ্যাত্মিকতা। সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন মহলে। তাঁর বক্তৃতার পরে ছাত্ররা বিক্ষোভও দেখিয়েছিল। তাদের সেই হ্যান্ডবিল থেকে খানিক অংশ রাখলে ছবিটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
“আমাদের কৃষি চাষির ক্ষুধা নিবারণে অক্ষম, আমাদের শিল্প কুটির শিল্প মাত্র, আমাদের নৌকা, আমাদের যান বাহন দিনে কয়েক মাইলের বেশি যেতে অসমর্থ… আমাদের পথঘাট আমাদের শৌচাগার, আমাদের রন্ধনশালা পৃথিবীর চোখে হাস্যকর। অথচ রবীন্দ্রনাথ বস্তুসভ্যতার আধিক্যের জন্য আমাদের তিরস্কার করছেন। তাই আমরা তাঁর প্রতিবাদ করতে বাধ্য।… রবীন্দ্রনাথ বলছেন ব্রহ্মের কথা আত্মার মুক্তির কথা। এই অকর্মণ্য তত্ত্বের বিরুদ্ধে আমাদের আপত্তি।’ (শিশিরকুমার দাশের অনুবাদ)
সাংহাই পৌঁছবার দু’দিন পরে মাও একটি পত্রিকায় ‘রবীন্দ্রনাথের কাছে আমাদের প্রত্যাশা’ প্রবন্ধে লিখলেন, “রবীন্দ্রনাথের কাছে যে উপহার আমরা প্রত্যাশা করি তা আধ্যাত্মিক জীবনসাধনা নয়, সেই শূন্যগর্ভ গীতাঞ্জলি নয়, বরং সেই বেদনা ও উৎসাহ জাগানো ‘একলা চলো রে’।”
তবুও সমাজ-রাজনীতির বাঁধন ভেঙে জু এসেছিলেন শিল্পের কাছে নতজানু হয়ে। ফিরেও গিয়েছিলেন, তাঁর নিজের জবানিতে ‘রত্নভান্ডার’ হাতে।
ঋণ : ১ .Discovering My Father Artist Xu Beihong’s Experience in Santiniketan, India : Xu Fangfang
২. Xu Beihong : Liao Jingwen
৩. আনন্দবাজার পত্রিকা
