ইদের লেখা কেন জাফরুল হককেই লিখতে হবে?

ইদের সঙ্গে পুজোর লেখাও মন দিয়ে লিখি

গত শনিবার ছিল ইদ উল আযহা। চলতি কথায় বলা হয় বকরা ইদ বা কুরবানি র ইদ। এই ইদ খুশির নয়, এটা দুঃখের ইদ। এদিন সমস্ত খারাপ কাজ পরিত্যাগ করে নতুন করে জীবনের পথে এগিয়ে চলতে হয় মুসলমানদের। ধর্মে বলা হয়, হজরত ইব্রাহিমকে তাঁর প্রিয় বস্তু কুরবানি  করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আল্লা। তিনি একের পর গবাদি পশু কুরবানি  দিয়েছিলেন, কিন্তু আল্লা তাঁকে বারবার বলেছিলেন, আরও প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতে।কিন্তু তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে নিজের ছেলেকে তিনি আল্লার উদ্দেশে কুরবানি  দিতে মনস্থির করলেন, তারপর ছেলে ইসমাইলকে নিয়ে গেলেন জবাহ্ করবেন বলে। কিন্তু ছেলেকে কীভাবে কুরবানি  করবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। স্ত্রীকে বললেন আল্লার হুকুমের কথা। ছেলে ইব্রাহিমকেও বললেন সব। ছেলের সম্মতি পেলেন। এরপর ইসমাইলকে নিচে শুইয়ে দিয়ে তিনি ছুরি চালালেন। ছেলে বাবাকে বললেন চোখ বেঁধে নিতে। ছেলের ইচ্ছায় তাই করলেন নবী ইব্রাহিম। তারপর ছেলের গলায় ছুরি চালালেন। আল্লার নির্দেশ এল। চোখ খুলে দেখলেন ছেলে ইসমাইলের বদলে নিচে শুয়ে আছে একটি দুম্বা। সে থেকেই গবাদি পশু কুরবানি  করেন মুসলমানরা। ধর্মে বলা আছে, বকরি বা ভেড়া হলে তাকে বাড়িতে রাখতে হবে একবছর, দুম্বা হলে ৬ মাস, গরু বা মহিষ হলে দু বছর, উট হলে পাঁচ বছর। অর্থাৎ তাকে পোষ মানিয়ে প্রিয় করে তুলতে হবে। বলা হচ্ছে, যে পরিমাণ মাংস হয় গবাদি পশুর তার মধ্যে দুভাগ বিতরণ করে দিতে হবে গরিব মানুষকে। একভাগ বাড়িতে এনে তার মধ্য থেকেও দিতে হয় প্রতিবেশীদের। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আজ ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে এত বিতর্ক কেন? কোরাণের বহু আয়তে বলা হয়েছে নিজে খাও কিন্তু মনে রেখ প্রতিবেশী খেতে পাচ্ছে কিনা, সেটা দেখতে হবে। যার সামর্থ্য আছে কেবলমাত্র তার জন্য কুরবানি । এ বছর এরাজ্যেরও বেশ কিছু গ্রামে ইদ পালিত হয়েছে ঠিকই, তবে কুরবানি  হয়নি, অনেক মানুষ ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকলেও, সারা দেশে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে, অনেকেই গরু কিনতে পারেনি। খাস কলকাতায় বেশ কিছু জায়গায় গরু হাট এবার নানা কারণে  হয়নি, মালদা, নদিয়া, দুই ২৪ পরগনা, কোচবিহারে গরু হাট থেকে গোরু কিনে আনার সাহস দেখান নি অনেকেই, দেশের রাজনৈতিক আবহের জন্য। মালদায় পাচারকারী সন্দেহে পেটানো হয়েছে দু’দফায় ২৪ জন নিরীহ ক্রেতাকে। ফলে আজ ইদের দিনও আতঙ্ক কাজ করেছে পাড়ায় পাড়ায়। আতঙ্ক কাজ কাজ করছে দেশ জুড়ে। এটা ঠিক, এই রাজ্যে পুলিসি নিরাপত্তা আজ ছিল সর্বত্র।  প্রতি বছর নোংরা, ছেঁড়া শাড়ি পরে শীর্ণ ছেলেটাকে কোলে নিয়ে যে মাকে দেখতে পেতাম মাংসের মহল্লায়, তাদের অনেকে এই ভয়ের জন্য থলেতে করে মাংস বাড়ি নিয়ে গেছেন তার ওপর কাঁচা সবজি চাপা দিয়ে।  অনেকে দিনের বেলায় বাড়ি না ফিরে বসে থেকেছেন রাতের অপেক্ষায়।

এ তো গেল ইদের কথা, কুরবানি র কথা। এবার একটু নিজের কথা বলি।  ২৬ বছর সাংবাদিকতা করছি, নিজের পেশাতেই দেখেছি, সহকর্মীদের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সহমর্মিতা, বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ানো সব আছে, কিন্তু তবু একটু যেন আলাদা, সাংবাদিক পরিচয়ের থেকেও ব্ড় পরিচয় হয়েই থেকে গেল আমার মুসলমান সাংবাদিক পরিচয়। সবাই সাংবাদিক। জাফরুল হক মুসলমান সাংবাদিক। আজও ইদের লেখা আমাকেই লিখতে হয়।  আমি কিন্তু পুজোর লেখাও লিখি। খুব মন দিয়ে লিখি।

বন্ধুরা ক্ষমা করবেন, একটু আবেগতাড়িত হয়ে দু’টো মনের কথা বলে ফেললাম।

Developed by DXDasia