বাংলা কবিতায় ঋতু-পর্যায়ের মধ্যে শীতকে নিয়ে পঙ্ক্তিমালা সজ্জিত হয়েছে প্রধানত দুভাবে

বিশ্বজিৎ ঘোষ 

মানবমনের সঙ্গে প্রকৃতির রয়েছে নিগূঢ় যোগসূত্র। প্রকৃতির বিচিত্র উপাদান ও অনুষঙ্গ মানবহৃদয়ের গোপন উপলব্ধি প্রকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়েই মানুষ আবিষ্কার করেছে নিজেকে। বোঝার চেষ্টা করেছে নিজের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার কথা। প্রকৃতির বিচিত্র উপাদান ও অনুষঙ্গের মাঝে উল্লেখযোগ্য শীত ঋতু। সেই আদিকাল থেকে শীতের সঙ্গে মানুষের গড়ে উঠেছে পরস্পর বিপ্রতীপ দুই সম্পর্ক। শীতের নানা উপহার ও উপাচার মানুষকে দেয় পরম প্রশান্তি; অপরদিকে তীব্র শীত আনে দুঃসহ কষ্ট। প্রশান্তি ও কষ্ট- এই দুই ভাব নিয়ে বাঙালি কবি স্মরণ করেছেন শীতকে; কবিচিত্তের নানা আবেগ আর উপলব্ধি আর অভিজ্ঞানের বাণীমূর্তি শীতকে আশ্রয় করে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলা কবিতার দিকে চোখ ফেরালে আমরা দেখতে পাব, ঋতু-পর্যায়ের মধ্যে শীতকে নিয়ে পঙ্ক্তিমালা সজ্জিত হয়েছে প্রধানত দুভাবে। প্রথমত, শীত ঋতুর বহিরাঙ্গিক বর্ণনা এসেছে কবিদের রচনায়; দ্বিতীয়ত, শীতের অনুষঙ্গে ব্যক্ত হয়েছে মানবহৃদয়ের নিগূঢ় কোনো দার্শনিক প্রত্যয়। বহিরাঙ্গিক বর্ণনার চেয়ে দার্শনিক প্রত্যয়ঋদ্ধ ধারার পঙ্ক্তিমালাই যে শীত-বিষয়ক কবিতার প্রধান সম্পদ- সে কথা লেখাই বাহুল্য। এ ধারায় কবিতায় শীতের আবির্ভাব ঘটেছে মানবহৃদয়ের বিশেষ কোনো উপলব্ধি বা অভিজ্ঞান প্রকাশের অব্যর্থ উৎস হিসেবে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শীতের উপস্থিতি ততটা বেশি না হলেও একেবারে বিরল নয়। বৈষ্ণব পদাবলিতে শীত এসেছে রাধার অভিসার-অনুষঙ্গে। শীতের প্রবল প্রতিক‚লতা উপেক্ষা করে রাধা চলেছে কৃষ্ণ-অভিসারে। চারদিক জনশূন্য, শীতের দাপটে প্রকৃতি স্তব্ধ, চারধারে ঘন কুয়াশা- এসব বৈরী আবহ অতিক্রম করে রাধার কৃষ্ণ-অভিসারের অনুষঙ্গে পদাবলিতে পাওয়া যায় শীতের চকিত বর্ণনা। মঙ্গলকাব্যগুলোও শীতের উপস্থিতি লক্ষণীয়। অধিকাংশ মঙ্গলকাব্যে নায়িকাদের বারো মাসের দুঃখ বর্ণনা-সূত্রে শীত ঋতুর আবির্ভাব। শীত এখানে যত-না আনন্দের অনুষঙ্গ, তারচেয়ে অনেক বেশি বেদনার শোকগাথা। বাঙালির হাজার বছরের দুঃখের কথাই যেন ফুল্লরার মুখ দিয়ে মুকুন্দরাম প্রকাশ করেছেন, নিচের কবিতাংশে শীতের অনুষঙ্গে-

কার্ত্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ।
যগজনে করে শীত- নিবারণ বাস
নিযুক্ত করিল বিধি সভার কাপড়।
অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের ছড়
… … …

শুন দুঃখের কাহিনী শুন দুঃখের কাহিনী।
পুরান দোপাটা গায়ে দিতে করে পানি
পউষে প্রবল শীত সুখী যগজন।
তুলি পাড়ি পাছড়ি শীতের নিবারণ
হরিণী বদলে পাই পুরান খোসলা।
উড়িতে সকল অঙ্গে বরিষয়ে ধূলা
মাঘে কুজ্ঝটিকা প্রভু মৃগয়াতে জায়।
আন্ধারে লুকায় মৃগ দেখিতে না পায়।
(মুকুন্দরাম চক্রবর্তী/‘চণ্ডীমঙ্গল কাব্য’)

শীত ঋতু নিম্নবর্গের অসহায় নারী ফুল্লরার জীবনে এসেছে চরম দুঃখ নিয়ে। ফুল্লরার এই দুঃখের অনুষঙ্গে শীত ঋতু সম্পর্কে বাঙালির একটি লোকসংস্কারের কথাও ব্যক্ত করেছেন মুকুন্দরাম। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে এই লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, মাঘ মাসে ক্ষেত থেকে শাক তুললে গৃহস্থের অকল্যাণ হয়। ফুল্লরার মুখ দিয়ে মুকুন্দরাম তাই বলছেন-

ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক-।
মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক
(মুকুন্দরাম চক্রবর্তী/‘চণ্ডীমঙ্গল কাব্য’।

মধ্যযুগের বাংলা রোমান্সমূলক প্রণয়কাব্যগুলোতেও শীত ঋতুর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সেখানেও শীত এসেছে নায়ক বা নায়িকার বারো মাসের দুঃখ বর্ণনার অনুষঙ্গে। দৌলত উজির বাহরাম খানের ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যে দেখতে পাই শীতের আবহ-

‘এ সুন্দরী দেখ বিরহীর অবশেষ।/প্রবল ষষ্ট ঋতু নাথ বিচ্ছেদ/সরোরুহ ভেল মলিন।/দীরঘ যামিনী দিবস ভএ ক্ষীণী/কাপন তপন তুহার।’ (দৌলত উজির বাহরাম খান/‘লায়লী-মজনু’)।

আধুনিক বাংলা কবিতার শীতের বহুমাত্রিক রূপ অঙ্কিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাতে। শীতের বহিরাঙ্গিক ছবি যেমন পাওয়া যায় তার রচনায়, তেমনি পাওয়া যায় দার্শনিক উপলব্ধি প্রকাশে শীতের অনুষঙ্গ। শীতের বহিরাঙ্গিক রূপ দেখি রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতায়। সেখানে মাঘ মাসের প্রবল শীতে মানুষ যখন কাঁপছে, তখন রাজমহিষী শীত নিবারণের জন্য দরিদ্র মানুষের সামান্য কুঁড়েঘরে আগুন জ্বালাতে কুণ্ঠিত হয় না। এ কবিতা কেবল রাজমহিষীর স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ করে না, বরং প্রকাশ করে উচ্চবিত্ত মানুষ কর্তৃক নিম্নবর্গের মানুষকে শোষণ ও নির্যাতনের কথা। এভাবে রবীন্দ্রনাথ শীত ঋতুর অনুষঙ্গে বহিরঙ্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেন উপলব্ধির অন্তরঙ্গ অনুভূতিকে।

শীত, কখনো কখনো, রবীন্দ্র-কবিতায় দেখা দিয়েছে চিরায়ত প্রেমের অবারিত উৎস হয়ে। শীতের স্পর্শে, উত্তুরে হাওয়ার ছোঁয়ায় কবিচৈতন্য লেগেছে প্রেমের শিহরণ- শীতের আবহ কবিকে করেছে উন্মনা ও আকুল-

ডেকেছো আজি, এসেছি সাজি, হে মোর লীলাগুরু-
শীতের রাতে তোমার সাথে কী খেলা হবে শুরু!
ভাবিয়াছিনু গতিবিহীন
গোধূলিছায়ে হল বিলীন
পরাণ মম, হিমে মলিন আড়ালে তারে হেরি?
উত্তরবায় কারে জাগায়, কে বুঝে তার বাণী-
অন্ধকারে কুঞ্জদ্বারে বেড়ায় কর খানি।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/‘উদ্বোধন’)

এখানে প্রেমিকা এবং দেবী, প্রেম এবং পূজা একাকার হয়ে গেছে। শীতের ভয়ঙ্কর রূপের ছবিও পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, যেমন দেখি ‘বোধন’-এ-

নির্মম শীত তারি আয়োজনে এনেছিল বনপারে,
মার্জিয়া দিল শ্রান্তি ক্লান্তি- মার্জনা নাহি কারে।
জ্ঞান চেতনার আবর্জনায়
পান্থের পথে বিঘ্ন ঘনায়,
নবযৌবনদূতরূপী শীত দূর করি দিল তারে।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/‘বোধন’)

নজরুলের কবিতায় শীতের বহিরাঙ্গিক রূপে লেগেছে প্রসন্নতার আলপনা। শীতের পাতা-ঝরা রিক্ততার মধ্যেও নজরুল খুঁজে পান এক ধরনের আনন্দ, নতুনের আবাহন গীত- ‘পউষ এলো গো!/পউষ এলো অশ্রু-পাথার হিম-পারাবার পারায়ে।/ঐ যে এলো গো-/কুজ্ঝটিকার ঘোমটা পরা দিগন্তরে দাঁড়ায়ে।/সে এলো আর পাতায় পাতায় হায়/বিদায়-ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়,/অস্ত-বধূ (আ-হা) মলিন চোখে চায়।/পথ-চাওয়া দীপ সন্ধ্যা-তারায় হারায়ে/পউষ এলো গো-/এক বছরের শ্রান্তি পথের, কালের আয়ু ক্ষয়,/পাকা ধানের বিদায়-ঋতু নতুন আসার ভয়।’ (কাজী নজরুল ইসলাম/‘পউষ’)।

শীতে ঝরে যায় প্রকৃতির সব আভরণ- গাছপালা হয়ে পড়ে পত্রপুষ্পশূন্য। শীতের এই বেশ কবি জসীমউদ্দীনের কাছে তপস্যারত ঋষির মতো মনে হয়- প্রকৃতি যেন ধ্যান করতে বসেছে তার সব আভরণ পরিত্যাগ করে- ‘সে কি ওই চরে দাঁড়ায়ে দেখিবে বরষার তরুগুলি,/শীতের তাপসী কারে বা স্মরিছে আভরণ গার খুলি?/হয়তো দেখিবে, হয় দেখিবে না, কাল সে আসিবে চরে,/এপারে আমার ভাঙা ঘরখানি, আমি থাকি সেই ঘরে।’ (জসীমউদ্দীন/‘কাল সে আসিবে’)।

শীতের উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ কুয়াশা। শীতের কুয়াশা কবির কাছে সংশয়চেতনা প্রকাশের অব্যর্থ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় পাওয়া যায় এমন ভাবনার প্রকাশ- ‘ঘোচে না সংশয়/তোমারে নেহারি কি না প্রসারিত মাঠে/প্রত্যুষের কুয়াশায় ঢাকা খেয়াঘাটে/গৃহগামী কৃষকেরা যাবে সন্ধ্যাবেলা/জটলা পাকায়’ (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত/‘অনিকেত’)। পক্ষান্তরে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কবিতায় শীত এসেছে তপস্যারত সন্ন্যাসীর প্রলয়-সাধনের প্রতীকে- শীতকে তিনি আহ্বান করেছেন মহাঋত্বিক রূপে-

বিশ্বের বিরাট বক্ষে পাতি শবাসন,
সাধিতেছ প্রলয়-সাধন-
কে তুমি সন্ন্যাসী!
বর্ণ-গন্ধ-গীত-বিচিত্রিত জগতের নিত্য প্রাণস্পন্দ,
কি স্বতন্ত্র মায়ামন্ত্র বলে পলে পলে হয়ে আসে বন্ধ।
মরণের আবাহন তরে কেন এই তীব্র আরাধন-চেষ্টা
সর্বনাশী
বর্ষপরে বিশ্বজুড়ে বসিলে আবার, হে রুদ্র সন্ন্যাসী।
(যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত/‘শীত’)

বুদ্ধদেব বসু শীত-অনুষঙ্গকে ব্যবহার করেছেন দার্শনিক উপলব্ধির উপাদান-উৎস হিসেবে। শীতের রিক্ততা কবির কাছে প্রত্যাশিত, কারণ তা মানুষকে সংসার থেকে দিতে পারে আকাক্সিক্ষত মুক্তি। শীত কবির কাছে মৃত্যুর প্রতিমসত্তায় উপস্থিত হয়েছে-

আমি যদি মরে যেতে পারতুম
এই শীতে,
গাছ যেমন মরে যায়,
সাপ যেমন মরে থাকে
সমস্ত দীর্ঘ শীত ভ’রে।
… … … …

যদি আমিও মরে থাকতে পারতুম-
যদি পারতুম একেবারে শূন্য হয়ে যেতে,
ডুবে যেতে স্মৃতিহীন, স্বপ্নহীন অতল ঘুমের মধ্যে-
তবে আমাকে প্রতি মুহূর্তে মরে যেতে হতো না
এই বাঁচার চেষ্টায়,
খুশি হবার, খুশি করার,
ভালো লেখার, ভালোবাসার চেষ্টায়।
(বুদ্ধদেব বসু/‘এই শীতে’)

শীত কখনো কখনো বুদ্ধদেব বসুর চিত্ততলে জন্ম দেয় নিঃসঙ্গতাবোধ। তিনি মনে করেন, শীত মানুষের চেতনায় যে অনন্বয় ও নির্বেদ সৃষ্টি করে, পরিণতিতে যা জন্ম দেয় মহার্ঘ্য নিঃসঙ্গতা- তা-ই কবির কাছে সৃষ্টিশীলতার আদি উৎস, প্রতœ প্রেরণা। অতএব, শীত বুদ্ধদেব বসুর কাছে নিয়ে এসেছে সৃষ্টিশীলতার অন্তহীন আহ্বান-

মৃত্যুর নাম অন্ধকার, কিন্তু মাতৃগর্ভ- তাও অন্ধকার,
ভুলো না,
তাই কাল অবগুণ্ঠিত, যা হয়ে উঠছে তা-ই প্রচ্ছন্ন;
এসো, শান্ত হও; এই হিম রাতে, যখন বাইরে-ভিতরে
কোথাও আলো নেই,
তোমার শূন্যতার অজ্ঞাত গহŸর থেকে নবজন্মের জন্য
প্রার্থনা করো, প্রতীক্ষা করো, প্রস্তুত হও।
(বুদ্ধদেব বসু/ ‘শীতরাত্রির প্রার্থনা’)

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাছে শীত এসেছে দুঃখের বার্তা নিয়ে। দরিদ্র মানুষের কাছে শীতের ভয়াবহতা কবিকে চিন্তিত করেছে। তাই নিম্নবর্গের মানুষের জন্য সূর্যের কাছে তার প্রার্থনা, সূর্য যেন শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাদের উত্তাপ দেয়। সুকান্তের ভাষায়-

সূর্য!
তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও,
আর উত্তাপ দিও
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে
(সুকান্ত ভট্টাচার্য/‘হে সূর্য’)

শীতকালে খেজুর গাছ কেটে রস-সংগ্রহ বাংলার এক চিরচেনা দৃশ্য। কবির কাছে খেজুরের রস নয়, বরং গাছটার বেদনাই বড় হয়ে উঠেছে। এই বোধের প্রকাশ ঘটেছে সানাউল হকের ‘দুটি গাছ’ কবিতায়-

‘পাশেই খেজুরগাছ/সতেরটি শীতাতঙ্কের/সতেরটি অস্ত্রোপচারের/ক্ষতচিহ্ন-ইতিহাস/কালো-কালো দীর্ঘশ্বাস/বুকে-পিঠে নিয়ে নিরালে ঝিমায়/তার দিকে কে তাকায়?’ কবির পঙ্ক্তিতে কখনো বা উঠে আসে পৌষ মাসের পিঠা-উৎসবের কথা- ‘পৌষমাস বিস্মরণ-ডুবি পানপিঠা পানিপিঠা/একদার গল্পসল্প- লুপ্তগৃহে সুপ্তপ্রায়/বাঁচি কি বাঁচি না।’ (সানাউল হক/ ‘বিরাশির কবিতা’)।

শীত আর শীতের অনুষঙ্গ কিংবা শীতের পাখি কবির চেতনায় জন্ম দেয় লিবিডোসজল ভাবনা। আকাক্সক্ষার নারীকে কবি শীত-অনুষঙ্গ দিয়ে তাই আলিঙ্গন করেন এভাবে-

শীতের সমূহ পাখি ক্ষিপ্ত লাফ
দিয়েছে তোমারই অমল যোনির পানে।
একটি স্বর্ণপাত পুড়ে উত্তরোত্তর ঘন-ধোঁয়া
ঠামহীন নিঃস্ব স্বর্গচূড়ে যায়
নীলিম বরফে বন্ধ অনাদিকালের সাইবেরিয়া-
পায়ের উপর থেকে ক্রমে শাল উড্ডীন মরালসম।
তোমার উজ্জ্বল ঊরু দেখে মনে হয় মরে যাবো।
(শক্তি চট্টোপাধ্যায়/‘বৃক্ষের প্রতিটি গ্রন্থে’)

শীতের আগমনে কবির চেতনায় জাগ্রত হয় বিরহবোধ- প্রসন্নতার জন্য তিনি হয়ে ওঠেন আকুল। এই ভাবনার প্রকাশ দেখি কবি বিজয়চন্দ্র মজুমদারের কবিতায়- ‘প্রকৃতির প্রফুল্লতা, সুখগাথা, লুকাল কোথায়/শীত-ক্লিষ্ট নিস্তব্ধ বিজনে?/যৌবন গিয়াছে মরে, মর্মভরা প্রেমের ব্যথায়,/জরা আজি বিচরে জীবনে।/আসিবে না সে যৌবন, ফিরে নিয়ে সুখ-উন্মাদনা।’ (বিজয়চন্দ্র মজুমদার/‘শীত বাসরে’)।

শীতের উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ আগুন জ্বেলে সম্মিলিতভাবে উত্তপ্ত হওয়া- এ দৃশ্য গ্রামবাংলায় অতি পরিচিত। শীতের এই অনুষঙ্গ কবি মানুষের সঙ্গে মানুষের পরস্পর বিচ্ছিন্নতার সূত্রে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। আবু হেনা মোস্তফা কামালের কবিতায় আমরা এ বোধেরই বিশিষ্ট প্রকাশ লক্ষ করি-

সারারাত গাঢ় কুয়াশার ভেতরে মাতাল জাহাজের মতো
আমাদের ঘর গৃহস্থালি;
বস্তুত এ রকম অবাঙালি শীত আমরা অনেক অনেক দিন
আদৌ দেখিনি; আত্মরক্ষার জন্যে কোনো আশ্রয় নেই।
এমনকি ভোর হলেও আকাশ উপচে নামে সোনালী তরল।
তাছাড়া, গোল হয়ে বসে একসাথে
সহৃদয়, আগুনে হাত সেঁকে নেয়ার মতো সম্প্রীতি কোথায়?
(আবু হেনা মোস্তফা কামাল/‘পূর্বপুরুষের মতো’)

কেবল বিশেষ কোনো ভাব-প্রকাশের জন্যই নয়, শীত ও তার নানাবিধ অনুষঙ্গ কখনো কখনো কবিরা ব্যবহার করেছেন অলঙ্কার সৃষ্টির উপকরণ হিসেবেও। কখনো উপমা, কখনো চিত্রকল্প সৃষ্টিতে শীত ঋতু পালন করেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যেমন-

ক. আলু থালু, হায়, তবে কবরীবন্ধন!
আভরণহীন দেহ, হিমানীতে যথা
কুসুমরতন-হীন বন-সুশোভিনী
লতা!
(মাইকেল মধুসূদন দত্ত/‘মেঘনাদবধ কাব্য’)

এখানে পুত্রশোকে কাতর চিত্রাঙ্গদা দেবীর আভরণহীন দেহকে পত্র-পুষ্পহীন শীত-প্রকৃতির উপমানচিত্রে শিল্পিত করা হয়েছে।

খ. ঘর-দুয়ার আজ বাউল যেন শীতের উদাস মাঠের মতো,
ঝরছে গাছে সবুজ পাতা আমার মনের-বনের যত।
(কাজী নজরুল ইসলাম/‘উন্মনা’)

বিরহের বেদনায় কবির হৃদয় শূন্য, উদাস বাউলের মতো রিক্ত তার মনের আকাশ, তার ঘর-দুয়ার। এই চেতনাকে কবি রিক্ত শীতের পাতা-ঝরা প্রাণসুপ্ত বৃক্ষের রূপকে চিত্রিত করেছেন।

শীত ও শীতের অনুষঙ্গ নিয়ে অনেক বাঙালি কবিই কবিতা লিখেছেন। শীত আমাদের কবিদের রচনায় এসেছে বিভিন্ন বোধ ও অভিজ্ঞানের সৃষ্টি-উৎস হিসেবে। শীত বাঙালি কবিদের সৃষ্টিশীল চৈতন্য বিকাশে পালন করেছে দূরসঞ্চারী এবং বহুমাত্রিক ভূমিকা।

Developed by DXDasia