
১৯১০ সালে রথীন্দ্রনাথ বিয়ে করেন প্রতিমাদেবীকে, এটিই ছিল ঠাকুরবাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ
জীবন সত্যিই এক রঙ্গমঞ্চ। কোন মুহূর্তে কার জীবন কীভাবে বদলে যাবে, কেউ জানে না। এমনই নিয়তির শিকার ছিলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র। সারাজীবনের অসম্ভব নিষ্ঠা ও শ্রম দিয়ে গড়ে তুললেন বিশ্বভারতী (Visva-Bharati)। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের রূপকার ছিলেন তিনি। অথচ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নাড়িয়ে দিল তাঁর সারাজীবনের উপার্জিত সম্মানের ভিত। ব্রাত্য হয়ে গেলেন তাঁদের সাধের বিশ্বভারতী থেকেও।
অল্পকথায় রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rathindranath Tagore) সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই মনে হয় তিনি ছিলেন একজন কৃষিবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং লেখক। অসম্ভব ভালো মূর্তি গড়তে এবং ছবি আঁকতে পারতেন। কারুশিল্প, উদ্যান তৈরি এবং বৃক্ষের উৎকর্ষবিধানে তাঁর প্রবল পারদর্শিতা ছিল। কয়েকটি বই লিখেছিলেন তিনি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বই ‘পিতৃস্মৃতি’। জন্ম জোড়াসাঁকোতে হলেও শান্তিনিকেতনেই সমাপ্ত হয়েছিল তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। তারপর আমেরিকায় কৃষিবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। দেশে ফিরে রবীন্দ্রনাথের সহচর হয়ে শান্তিনিকেতন (Shantiniketan) ও শ্রীনিকেতনের উন্নতির জন্য মগ্ন হয়ে যান। ১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথের কথায় বিয়ে করেন প্রতিমাদেবীকে (Pratima Devi)। ঠাকুরবাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ ছিল রথীন্দ্র-প্রতিমার বিয়ে। ১৯৫১ সালে যখন বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় তখন তিনিই হয়েছিলেন প্রথম উপাচার্য। রবীন্দ্রসংগ্রহশালার সিংহভাগ তিনি নাজে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। রথীন্দ্রনাথের জীবনের গল্পটা যদি ঠিক এমন স্বপ্নের মতো হত, তাহলে বেশ হত।

রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কিন্তু জীবন বড়ো খামখেয়ালি। ইচ্ছেমতো গল্প তৈরি করে। রথীন্দ্রনাথের জীবনও তাই ঠিক রূপকথার মতো হল না। তাঁকে নিয়ে তৈরি হল বিতর্ক এবং তারই জেরে ঘরছাড়া মানুষের মতো রথীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী ছেড়ে চলে গেলেন দূরে। আত্মীয় পরিজন সকলের থেকে দূরে। শেষজীবনে সঙ্গে ছিলেন এক বন্ধুপত্নী। প্রতিমাদেবীর একাকী তপস্যার মতো জীবন ও নীরব আকুতিও তাঁকে ফেরাতে পারেনি।
১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথের কথায় বিয়ে করেন প্রতিমাদেবীকে। ঠাকুরবাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ ছিল রথীন্দ্র-প্রতিমার বিয়ে। ১৯৫১ সালে যখন বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় তখন তিনিই হয়েছিলেন প্রথম উপাচার্য।
রথীন্দ্রনাথ অসম্ভব প্রতিভাবান ছিলেন। অথচ নিজের প্রতিভা বিকাশ করার কোনো সুযোগ তাঁর হয়নি। বিখ্যাত বাবার প্রবল দীপ্তির আড়ালে রথীন্দ্রনাথের প্রতিভা ডানা মুড়িয়েই রইল। ছোটোবেলায় মাকে হারিয়েছেন রথীন্দ্রনাথ। একে একে মৃত্যু হয়েছে ছোটো ছোটো ভাইবোনের, বাবাকে শোকের আঘাতে নির্লিপ্ত হয়ে যেতে দেখেছেন। একটা সময় তরুণ বয়সে বাবাকে খুশি করার নেশায় ব্যক্তিগত ইচ্ছে অনিচ্ছের কথা তেমন ভাবেননি। ১৯০৯ সালে শিলাইদহ থেকে নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে একটি চিঠি লিখেছিলেন রথীন্দ্রনাথ, সেখানে রবীন্দ্রনাথের জন্য তাঁর আবেগ বেশ স্পষ্ট—
“—ভগবান আমাদের অদৃষ্টে আরও কি লিখেছেন, কে জানে? বাবাকে যত দেখছি, ততই কষ্ট হচ্ছে — তিনি অবশ্য কিছু বলেন না — কিন্তু স্পষ্টই দেখছি তাঁর মনে আর কোনো সুখ নেই। আমার কষ্ট আরও বেশী হয় এই জন্য যে, আমি তাঁকে সুখী করতে পারব, এ বিশ্বাস আমার নেই। এখন থেকে নিজেকে যদি একটু কাজের মানুষ গড়ে তুলতে পারি, তাহলেই যা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারব একটু।”
এই যে ক্রমাগত বাবাকে সন্তুষ্ট করার ইচ্ছা, রথীন্দ্রনাথকে নিজের মনের খবর নিতে দেয়নি। প্রতিমাদেবীর সঙ্গে দাম্পত্যজীবনও তেমন সুখের হয়নি। রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমাদেবীর নিঃসন্তান বিবাহিত জীবনের একটাই অবলম্বন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একজন শ্রম দিয়ে আর অন্যজন সেবা দিয়ে শুধু রবীন্দ্রনাথকেই সুখী করার চেষ্টায় মগ্ন হয়ে গিয়েছেন। খুব কর্কশ শোনালেও এটাই সত্যি যে রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর মনোযোগ রথীন্দ্র-প্রতিমার দাম্পত্যজীবনকে অন্তরঙ্গ হতে দেয়নি। রথীন্দ্রনাথ ও হয়তো চেষ্টা করেননি প্রতিমাদেবীকে যথার্থভাবে বুঝতে। তরুণ বয়সের আবেগ চলেত যাওয়ার পর রথীন্দ্রনাথেরও নিশ্চয়ই মনে হয়েছে একটা জীবন শুধু পিতার সহচর হয়েই দিন গড়িয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) কি ছেলের এই অতৃপ্তি আর নিঃসঙ্গতার খবর রাখতেন? ১৯৩৮ সালের ২৭ নভেম্বর রথীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে একটি কবিতা লিখে উপহার দিয়েছিলেন। সেই কবিতার শেষ পংক্তিগুলিতে লিখেছিলেন, “বিদায় প্রহরে রবি দিনান্তের অস্তনত করে/ রেখে যাবে আশীর্বাদ তোমার ত্যাগের ক্ষেত্র পরে।”

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রতিমাদেবী
রথীর কাহিনি এখানেই শেষ হলে ভালো হত। কিন্তু রথীন্দ্রনাথ সত্যিই জানতেন না, এত ত্যাগ ও শ্রমের পর নিয়তি তাঁর জন্য অপমান ও অপযশ রেখে দিয়েছে। তাতে তাঁর নিজের দায়ও অস্বীকার করা যায় না। প্রতিমাদেবী ছিলেন ব্যক্তিত্বময়ী। রথীন্দ্রনাথ প্রথমজীবনে তাঁর রূপে মুগ্ধ ছিলেন। সে মুগ্ধতার প্রকাশও তিনি করেছিলেন নানা ভাবে। ভগ্নিপতি নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন, “প্রতিমা এখন আমার—সে কী চমৎকার মেয়ে তোমাকে কী করে লিখি।” একবার প্রতিমাদেবীকেই লিখেছিলেন, “আমি কখনই একজন কুশ্রী মেয়েকে সম্পূর্ণ ভালোবাসতে পারতুম না— আমার সে দুর্বলতা আমি স্বীকার করছি।” ১৯২২-এ রথীন্দ্রনাথ-প্রতিমাদেবী একটি কন্যাসন্তান দত্তক নিলেন, নাম রাখলেন নন্দিনী। রবীন্দ্রনাথ ডাকতেন পুপে বলে। কিন্তু রথীন্দ্রনাথ তখন নির্দিষ্ট নিয়তির দিকে ছুটে চলেছেন। পতঙ্গ যেমন ছুটে চলে আগুনের দিকে। রথীন্দ্রনাথের জীবনের সেই আগুনের নাম মীরা চট্টোপাধ্যায় (Meera Chattopadhyay)।
প্রতিমাদেবীর সঙ্গে দাম্পত্যজীবনও তেমন সুখের হয়নি। রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমাদেবীর নিঃসন্তান বিবাহিত জীবনের একটাই অবলম্বন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একজন শ্রম দিয়ে আর অন্যজন সেবা দিয়ে শুধু রবীন্দ্রনাথকেই সুখী করার চেষ্টায় মগ্ন হয়ে গিয়েছেন।
১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথের ডাকে সাড়া দিয়ে বিশ্বভারতীতে পড়াতে এসেছিলেন আশ্রমেরই প্রাক্তন ছাত্র নির্মল চট্টোপাধ্যায়। তাঁরই স্ত্রী মীরার সঙ্গে এক অসমবয়সী বন্ধুত্ব তৈরি হয়। প্রতিমাদেবী আর রথীন্দ্রনাথ তখন একত্রে থাকেন না আর। রবীন্দ্রনাথের তিরোধান হয়েছে। শান্তিনিকেতনে উপাচার্য তখন রথীন্দ্রনাথ। এই পদে থেকে বিশ্বভারতীর মধ্যে এই সম্পর্ক বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। রথীন্দ্রনাথও হয়তো সারাজীবন কঠোর কঠিন নিয়ম মানতে মানতে ক্লান্তি অনুভব করছিলেন নিশ্চয়ই। মীরা চট্টোপাধ্যায় প্রবীণ রথীর জীবনে একঝলক মুক্ত বাতাস হয়ে এসেছিলেন। বন্ধুত্ব কখন তার সীমারেখা পার করে, কেউই হয়তো বোঝেননি। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে গল্প থেকে গুজব ছড়িয়ে পড়তে লাগল। স্বয়ং জওহরলাল নেহেরু, নির্মল চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রীকে আশ্রম থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। রথীন্দ্রনাথ এই প্রস্তাব শুনে নিজেই পদত্যাগ করেন এবং রবিঠাকুরের সাধের বিশ্বভারতী, স্ত্রী কন্যা সকলকে ত্যাগ করে চলে যান দেরাদুন। সঙ্গে গেলেন মীরা চট্টোপাধ্যায়, রথীন্দ্রনাথের ‘মীরু’।
খুব আশ্চর্য, মীরার স্বামী নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের পূর্ণ সম্মতিতেই এই ঘটনা ঘটে। নির্মল চট্টোপাধ্যায় মেয়েকে নিয়ে আশ্রমেই রয়ে যান আর রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে যান মীরা ও তাঁর ছেলে জয়ব্রত। ১৯৫৩ সালের ২২ অগাস্ট রথীন্দ্রনাথ সারাজীবনের উপার্জিত সম্মান ধুলোয় ফেলে চলে যান দূর দেরাদুনে। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত মীরাকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেন রথীন্দ্রনাথ। লিখেছিলেন, “আমার কেবল মীরু আছে– সে-ই আমার সমস্ত জগৎ ব্রহ্মাণ্ড। তাকে ছাড়া আমি কিছুই নই— আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তাকে আমার সবকিছু দিয়েছি।” মীরা ও রথীন্দ্রনাথের সম্পর্ক বেশ রহস্যময়। কারণ মীরার মা, মীরার স্বামী নির্মলচন্দ্র মাঝে মাঝে ঘুরে যেতেন তাদের দেরাদুনের বাড়িতে। প্রতিমাদেবীর ব্যক্তিত্ব তাঁকে নীরবই রেখেছিল। তাঁর অন্তর ব্যথায় ভেঙে পড়লেও শোকে বিহ্বল হননি। রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, “ভালো আছ এই খবর পেলেই খুশি হব।” মৃত্যুর আগে ১৯৬০ সালে প্রতিমাদেবীকে লিখছেন রথীন্দ্রনাথ, “আমরা দুজনেই এখন জীবনের সীমান্তে এসে পড়েছি। এখন আর কারো প্রতি রাগ বা অভিমান পুষে রাখা (শোভনীয়) হয় না। সেই জন্য জেনো আমার মনে কোনো রাগ নেই— আমি সব ঝেড়ে ফেলেছি। আমাদের মধ্যে প্রীতি সম্বন্ধ অক্ষুণ্ণ থাক এই নতুন বছরে তাই কামনা করি।”
প্রতিমাদেবীর অভিমান বোঝার ক্ষমতা রথীন্দ্রনাথের ছিল না। হয়তো নিজের অনেক অব্যক্ত অভিমানের তলায় সে বোধের পৃথিবী চাপা পড়ে ছিল। ভাঙাচোরা সম্পর্কের মতো ভাঙাচোরা অনুভূতি হয়ে। ১৯৬১ সালে একবার ফিরেছিলেন শান্তিনিকেতনে। রতনপল্লীতে মেয়ের কাছে বলেছিলেন দুটো ঘর তৈরি করে থেকে যাওয়ার কথা। আবেগে আতপ্ত সে মুহূর্তের স্মৃতিচারণ নন্দিনী পরে করেছিলেন। এরপর সেই বছরই তেসরা মে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন রথীন্দ্রনাথ। জীবনের কলঙ্কিত শেষ অধ্যায়টি গ্রাস করে নিল তাঁর সারাজীবনের ত্যাগ ও তপস্যাকে। কেউ মনে রাখল না সেই পরিশ্রমী তরুণকে, যিনি তাঁর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে লিখেছিলেন, “কতদিন বোলপুরের মাঠে একলা পড়ে যে কেঁদেছি তা কেউ জানে না। তুমিও না।” রথীন্দ্রনাথের অভিমানের তল পাওয়া গেলে তাঁর জীবনের জটিল রহস্যের সমাধান সহজ হত।
সহায়ক গ্রন্থঃ
পিতৃস্মৃতি, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপনি তুমি রইলে দূরে – সঙ্গ নিঃসঙ্গতা ও রথীন্দ্রনাথ, নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
সহায়ক প্রবন্ধঃ
পিতা-পুত্র রবীন্দ্রনাথ ও রথীন্দ্রনাথ, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য
