বেলঘরিয়ার ইতিহাসে যা লেখা নেই – ৯

আসত জিপসিরাও, ছুরি কাঁচি ইত্যাদি মনোহারী জিনিস বিক্রি করতে

গত তিনবছরে একটা জিনিস অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। বেলঘরিয়ার কোনো রাস্তা বা এলাকা দিয়ে যেতে যেতে, সে-জায়গার সত্তর-আশি-নব্বই বছর আগেকার চেহারা কল্পনা করা। তখন কি দীর্ঘশ্বাস ফেলি? মনে-মনে সে-সময়ের চরিত্রদের হাতড়ে বেড়াই আমি? ইতিহাস খুঁজতে নেমে, বহু প্রবীণ মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। শুনেছি তাঁদের শৈশব-কৈশোর-যৌবনের বেলঘরিয়ার কথাও। কোনো কোনো বৃষ্টির সন্ধ্যায়, আমার চোখের সামনে থেকে মুছে যায় এখনকার চাকচিক্য, আভিজাত্য। বরং ভেসে ওঠে ১৯৪৩, বেলঘর গ্রামের মধ্যে আমেরিকান সৈন্যদের যাতায়াত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন। বিভা-র কাছে, গণনাথ সেনের বাগানবাড়িতে বসেছে মিলিটারিদের ক্যাম্প। মাঝরাতে, অন্ধকারের বুক চিরে গোরা সৈন্যভর্তি ট্রাকের চলাচল আমাকে রোমাঞ্চ দেয়। ভীত করে এই বেলঘরিয়ারই তিন-চার জায়গায় বোমা পড়ার খবর। চারদিকে ব্ল্যাক আউট। ঘরের আলো জ্বালানোও মানা। আমি জানলার খড়খড়ি সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিই রাস্তায়। ভারী বুটের আওয়াজ। স্টেশন থেকে ভেসে আসে সাইরেন। জাপানি প্লেনের শব্দ শুনে, আঁকড়ে ধরি বাবার দুটো হাত। যেন আর ভয় নেই কোনো, এই যুদ্ধও একদিন কেটে যাবে।

যুদ্ধ শেষ হলে, ক্যাম্প গুটিয়ে সৈন্যরাও চলে গিয়েছিল। কিন্তু একটা রাস্তার নাম এখনও বহন করছে সেই দিনগুলোর স্মৃতি। ‘মিলিটারি রোড’। নীলগঞ্জ রোড থেকে ৪ নং গেট পেরিয়ে চলে গেছে যে-রাস্তা। ৪ নং গেটের পূর্বদিকেও মিলিটারিদের একটা ক্যাম্প ছিল। সেই ক্যাম্পে যাতায়াতের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল এই রাস্তা।

নামের দিক দিয়ে, আরেকটি আকর্ষণীয় রাস্তা হল ‘রাইফেল রেঞ্জ রোড’। যতীনদাসনগর কলোনির মধ্যে একটা রাস্তার নাম হঠাৎ এমন হতে গেল কেন? আসলে, স্বাধীনতার পরে যে-জায়গাটা দখল করে কলোনি তৈরি হল, সেটি ছিল চাঁদমারি। অর্থাৎ, ফায়ারিং প্র্যাকটিসের জায়গা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার মিলিটারিদের জন্য তৈরি নয় কিন্তু। অনেক আগে থেকেই ছিল এই চাঁদমারি। এমনকি, যৌবনে সুভাষচন্দ্র বসুও সামরিক শিক্ষা ও ফায়ারিং প্র্যাকটিস করেছিলেন এখানে এসে। সে-কথা তাঁর ‘ভারত পথিক’ বইয়ে লেখাও আছে। পুরো এলাকাটাই পরিচিত ছিল ‘টার্গেট ময়দান’ বা ‘চাঁদমারি ময়দান’ নামে।

বেলঘরিয়া স্টেশন থেকে নিমতার দিকে যেতে যেতে, ডানদিকে এখন কতই না বাড়িঘর। এই মধুসূদন ব্যানার্জি রোডের ডানদিকে, কালচার মোড় পর্যন্ত ছিল পনেরো-ষোলো ফুট উঁচু পাঁচিল। ফায়ারিং প্র্যাকটিসের সময়, পথচারীদের গায়ে যাতে গুলি ছুটে এসে না লাগে, তার জন্যই এ-ব্যবস্থা। চাঁদমারিতে উঁচু উঁচু তিনটে টার্গেটও ছিল, যা লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হত। আজকের যতীনদাসনগরে গেলে এসব ইতিহাসের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। হ্যাঁ, যে দিন গেছে, একেবারেই গেছে। কিছুই নেই বাকি।

সেই দিনের কথা টুকরো-টুকরো শুনলে, অবাক লাগে। আমি জ্ঞান হওয়া ইস্তক স্টেশনের পাশে ফিডার রোডের ওপর ব্রিজ দেখছি। সেখানে এককালে ১ নং রেলগেট ছিল। এই ১৯৯৩-৯৪ পর্যন্তও। আরও বহু-বহুকাল আগে, রূপমন্দির সিনেমা হলের পিছনে যে জোড়া শিবমন্দির, তার সামনে প্রতি রোববার হাট বসত। গরুর গাড়িতে করে লোকজন চাল, গুড়, ফলমূল নিয়ে হাজির হত বিক্রির জন্য। আশেপাশেই দেখা যেত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পাদ্রিদের। খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করতেন এবং লিফলেট বিলোতেন তাঁরা। বেলঘর বাজারে আসত জিপসিরা, ছুরি কাঁচি ইত্যাদি মনোহারী জিনিস বিক্রি করতে। এ-সবই তিরিশ-চল্লিশের দশকের কথা। এসব জানানোর কি আজ আর কোনো প্রয়োজন আছে? ভাবি। না-জেনেও তো দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায়। আমি শব্দে-শব্দে যে ছবি আঁকি, কতজনের কাছেই বা পৌঁছোয়? জনপদ তো নিজের মতো চেহারা বদলিয়েই চলেছে। চলবেও। পিছনে ফিরে তাকানোর সত্যিই সময় নেই তার। আমি কেন খামোকা টানাহ্যাঁচড়া করে মনে করিয়ে দিই?

থামার সময় হয়ে এল প্রায়। এবার রেহাই দেব বেলঘরিয়াকে। কিংবা, অন্য কোনো দিক দিয়ে আরও তীব্র হবে টান। যা-কিছু দোষ, বৃষ্টির সন্ধ্যার। চাইলেও যেতে দেয় না। আটকে রাখে। গল্প শুনতে চায়। ঠিক যেমন, চল্লিশের দশকে আমিও যুদ্ধের গল্প শুনতে চাইতাম। পঞ্চাশের দশকে, ঝিলের পাড় ঘেঁষে ছুটে বেড়াতাম সাপের লেজ ধরে। আরও একশো কুড়ি বছর আগে, ব্যাকরণ পড়তে যেতাম জয়গোপাল বিদ্যাবাগীশের টোলে। আসলে, নিজেরই গল্প ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন আমি-র। আশ্চর্য, সেগুলো বেলঘরিয়ার কথাও হয়ে ওঠে। এটুকুই। এর বেশি কিছুই কি পারলাম?

(ক্রমশ)

Developed by DXDasia