
মন চুরি থেকে হৃদয় হরণ, এমনকি সুশীল কাব্যিক ভাষা দিয়েও লেখা হত বিয়ের পদ্য
বাঙালি পরিবারের বিয়ে উপলক্ষ্যে একসময়ে পদ্য প্রচলিত ছিল। ভাবতে অবাক লাগলেও একথা সত্য যে আজ থেকে অন্তত চল্লিশ বছর আগেও এই সংস্কৃতি বহমান ছিল। এমনকি শুধু কলকাতাতেই নয়; অন্যান্য জেলাতেও এর চল ছিল যথেষ্ট। বিয়েবাড়ির সন্ধেবেলায় অতিথি সমাগম হলে সেখানে হলুদ, গোলাপি, হালকা আকাশি, সবুজ এরকম নানা রংয়ের ছাপানো কাগজ বিতরণ করা হত, সেখানে আবার এক বা একাধিক পদ্যও লেখা থাকত। এমনকি বিয়ের পরে বাসরঘরে রাত-জাগার সময় বরযাত্রীদের মধ্যেই এই পদ্যগুলি সরস ভঙ্গিতে পাঠ করাও হত। কখনও আবার এপিঠ-ওপিঠ কাগজের বদলে বেশ কয়েক পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকাও প্রকাশিত হত। এর শিরোনামও ছিল নানারকম – ‘স্নেহ উপহার’, ‘ভক্তি উপহার’, ‘প্রীতি উপহার’, ‘স্নেহাশীষ’, ‘মিলনোচ্ছ্বাস’, ‘মিলনগীতি’, ‘বধূ আবাহন’ ইত্যাদি।

বাংলা পত্র-সাহিত্যের ধারাকে মোটামুটি অনুসরণ করেই লেখা হত এই পদ্যগুলি। নববধূকে গুরুজনদের আশীর্বাদ দেওয়া, বাড়ির ছোটোদের দাদা বা দিদিকে শুভেচ্ছা বার্তা দেওয়া বা কখনও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নববধূকে নিয়ে পাত্রের কাছে সরল ঠাট্টা-রসিকতা ছিল এর বিষয়বস্তু।
পরিবারের সদস্য ছাড়াও প্রতিবেশীরাও এই ধরনের তাৎক্ষণিক পদ্য রচনা করে দিতেন। তাদের অনেকেরই সেই সময়ে তথাকথিত বর্ণাক্ষর জ্ঞানও ছিল না। অথচ কল্পনার রসে সেই ছড়া বা কবিতাগুলি হয়ে উঠত প্রাণময়। এই প্রচার পত্রিকার অলংকরণ কোনও অংশেই কম ছিল না। ব্রিটিশ যুগের বিয়ের পদ্যে বিদেশি পরীর আদলে দুজন নারীর হাতে সুদৃশ্য মালা-ধরা ছবি থাকত। এছাড়াও কখনও আটপৌরে শাড়ি পরা দুজন স্ত্রী মঙ্গল শঙ্খধ্বনি করছে এমন ছবিও দেখা গেছে। আবার বিয়ের ছাদনাতলায় কলাগাছ এক প্রয়োজনীয় উপকরণ। তাই সেই কলাগাছ, সানাই বাদ্য কখনও না কখনও ছবি হয়ে থেকেছে এখানে। কাগজ ছাড়াও আগেকার দিনে কখনও নকশা-করা ন্যাপকিনের ওপরে এই বিয়ের পদ্য ছাপা হয়ে থাকত। বলাই বাহুল্য যে পাত্র ও কন্যা দু-পক্ষের পরিবারেই এরকম বিয়ের পদ্যের চল ছিল।
বাংলা পত্র-সাহিত্যের ধারাকে মোটামুটি অনুসরণ করেই লেখা হত এই পদ্যগুলি। নববধূকে গুরুজনদের আশীর্বাদ দেওয়া, বাড়ির ছোটোদের দাদা বা দিদিকে শুভেচ্ছা বার্তা দেওয়া বা কখনও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নববধূকে নিয়ে পাত্রের কাছে সরল ঠাট্টা-রসিকতা ছিল এর বিষয়বস্তু। আবার কখনও স্নেহ মেশানো দুঃখের করুণ রসও উঠে আসত। যেমন পাত্রীর শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ার জন্য তার ভাইবোনরা যেন পুতুল খেলার দোসরকে হারিয়ে ফেলছে। আবার নতুন বউকে তার শাশুড়ি মা বলেছে এবার থেকে সংসারের ভাঁড়ারের যাবতীয় দায়িত্ব তারই। যৌথ একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে খুশি রেখে তাকে চলতে হবে। সে-ই হবে সাক্ষাৎ গৃহলক্ষ্মীস্বরূপা। এই ধরনের পদ্যের মধ্যে আরও এক চমক ছিল, রোমান হরফের ব্যবহার। ‘বিয়ে’-কে উচ্চারণের সুবাদে কখনও লেখা হত ‘B.A’। এই ‘B.A’ লেখাপড়ার একটি ডিগ্রি হলেও বাংলা উচ্চারণে ‘বিয়ে’ ও ‘বিএ’র কোনও তফাৎ থাকে না। এছাড়াও দিদিকে ‘DD’, আসি-র বদলে ‘৮০’ লেখা হয়েছে এমনও উদাহরণ মেলে।

‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’-এর মতো বাংলা ছড়ার বদলে রবীন্দ্র-প্রভাবিত সুশীল কাব্যিক ভাষার গাঁথনি দিয়েই কবিতা লেখা হয়েছে সত্তর বা আশির দশকে। অভিরুচি, সংস্কৃতি ও সমকাল এই তিন স্তম্ভ পদ্যের ধরনকে প্রভাবিত করলেও নিজস্বতা হারায়নি ওই রচনাগুলি।
রঙ্গরসের উপাদানে ভরপুর ছিল এই বিয়ের পদ্য। যেমন ধরা যাক ‘মন চুরি’-র কথা। “যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব” মন্ত্রাংশের ভাবনা থেকেই ‘হৃদয় হরণ’। বাংলার যাত্রাপালা বরাবরই অন্যতম প্রিয় লোকরঞ্জন। তাই কোথাও এমনও দেখা গেছে যে ‘কলির ভীষ্ম’ নামাঙ্কিত এক স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটক ৮/৬ মাত্রার ছন্দে লেখা হয়েছে। মহাভারতের ভীষ্ম চরিত্র ছিল অবিবাহিত একজন পুরুষ। তাই জনৈক ব্যক্তির এক সময় প্রতিজ্ঞা ছিল যে সে চিরদিন অকৃতদার হয়েই কাটাবে। অথচ অদৃষ্টের লিখনে তাকেও কোনও নারীর পাণীগ্রহণ করতে হচ্ছে। তাই তাকে উদ্দেশ্য করেই এই সংক্ষিপ্ত নাট্যকাব্যের রচনা ও প্রকাশ। অর্থাৎ সমসাময়িক ভাবনাচিন্তার বিরুদ্ধে যায়নি এই পদ্যগুলি। আবার বাঙালি সংস্কৃতিতে খাজা, মণ্ডা, মিঠাইয়ের নানা উল্লেখ বাংলা ছড়ায় ইতিউতি পাওয়া যায়। মণ্ডা, মিঠাইয়ের মতো সুস্বাদু মিষ্টান্নের কথাও এই ছড়ায় উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়াও হরগৌরীর উপমা তো নানা পদ্যে ছড়িয়ে রয়েছেই নব বরবধূর জন্য। সময় যত এগিয়েছে, পদ্যের বিষয়বস্তুর ধরন ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে।

কবিতার গঠনেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’-এর মতো বাংলা ছড়ার বদলে রবীন্দ্র-প্রভাবিত সুশীল কাব্যিক ভাষার গাঁথনি দিয়েই কবিতা লেখা হয়েছে সত্তর বা আশির দশকে। অভিরুচি, সংস্কৃতি ও সমকাল এই তিন স্তম্ভ পদ্যের ধরনকে প্রভাবিত করলেও নিজস্বতা হারায়নি ওই রচনাগুলি। পরিবারের ছোটোদের খুনসুটি, গুরুজনের প্রশস্ত আশীর্বাণী এবং নবদম্পতির প্রেমসম্ভাষণেই ছন্দোময় ভাষাগুলি লিখিত সাহিত্যের সমান্তরাল পথে হেঁটেছিল। বিয়েবাড়ির পদ্য বা ছড়া বা কবিতা যাই বলা হোক না কেন; তার অনেকখানিই আজ হারিয়ে গেছে। তার মধ্যে নাপিতের আবৃত্তি করা ‘গৌরবচন’ অন্যতম। তবে পারিবারিক যত্ন, সচেতনতা বা ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদেই এই ধরনের বিয়ের পদ্য-এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত আজও সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ফলত বাঙালির আপন সংস্কৃতির এই সুন্দর নিদর্শনগুলিই প্রমাণ করে তার প্রতিভা তথা সাহিত্য-অনুরাগ।
