বিদ্যাসাগরের নুন খেয়েও গুণ গাইলেন না বঙ্কিম

‘না হে না, বঙ্কিমের সূর্যমুখী আমার মতো মুর্খ দেখেনি’

১২৭৯ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গদর্শন’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’। বিষবৃক্ষের সূর্যমুখী একটি চিঠিতে লিখছে, ‘ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে না কি বড় পণ্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহের বহি বাহির করিয়াছেন। যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত, তবে মূর্খ কে?’

বর্ধমানে তারকনাথ বিশ্বাসের বাড়িতে ভোজ দিয়েছেন বিদ্যাসাগর। নিজের হাতে রেঁধে বেড়ে খাওয়াবেন। মেনু-ভাত, পাঁঠার ঝোল আর আম আদা পাঁঠার মেটের অম্ল। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে রয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র। তিনি অবশ্য জানতেন না রান্নাটা কে করেছেন। খেতে খেতে বঙ্কিম বলে উঠলেন, এমন সুস্বাদু অম্ল তো কখনও খাই নাই। উপস্থিত সঞ্জীবচন্দ্র বললেন, হবে না কেন, রান্নাটা কার জানো তো, বিদ্যাসাগরের। বিদ্যাসাগরও হাসি মুখে বলে উঠলেন, না হে না, বঙ্কিমের সূর্যমুখী আমার মতো মূর্খ দেখেনি। বঙ্কিম কোনও উত্তর দেননি, তবে একটা হাসির রোল উঠেছিল।

তো বিদ্যাসাগরের হাতে নুন, থুরি রান্না খেলেন বঙ্কিমচন্দ্র। কিন্তু সারা জীবনে তাঁর গুণ খুব একটা গাননি। বিদ্যাসাগর যখন নতুন আইন চেয়ে বহুবিবাহ প্রথা বিলোপসাধনের জন্য লড়াই করছেন, তখন প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছিলেন সাহিত্যসম্রাট। তাঁর ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রবন্ধ লিখে রীতি মতো কড়া ভাষায় নিন্দা করেছিলেন বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহ সম্পর্কিত দ্বিতীয় পুস্তকটির। প্রথমত, বঙ্কিমচন্দ্রের আপত্তি ছিল, বহুবিবাহের অশাস্ত্রীয়তা প্রমাণ নিয়ে। বিদ্যাসাগর তখন রীতিমতো শাস্ত্রবিচার করে যুক্তি দিয়ে হিন্দুসমাজকে দেখাতে চাইছেন বহুবিবাহ হিন্দু শাস্ত্র সম্মত নয়। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্বৎসমাজকে পাশে পেতেই তাঁর যুক্তিজাল রচনা। আর বঙ্কিমের মত হল, শাস্ত্রে থাকলেই কি সবাই সব কিছু মেনে চলে? শাস্ত্র বাদ দিয়েও মানুষ আপন বিচার বুদ্ধিতেই বহুবিবাহ বিষয়টা খারাপ, এটা বুঝতে পারবে। বহুবিবাহকে আলাদাভাবে কুপ্রথা রূপে তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে লড়াই করাকে খুব একটা জরুরি এবং যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি বঙ্কিমের। তাঁর মতে এই প্রথা বিলোপের মুখে এবং আপনা-আপনিই এই প্রথা নাকি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তার জন্য বিদ্যাসাগরের ওকালতি অর্থহীন।

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে লিখছেন, ‘…এই কুপ্রথার যাহা কিছু অবশিষ্ট আছে, তাহা আপনা হইতেই কমিবে। এমত অবস্থায়, বহুবিবাহ রূপ রাক্ষস বধের জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায় মহারথীকে ধৃতাস্ত্র দেখিয়া, অনেকেরই ডন্‌কুইক্সোটকে মনে পড়িবে’।

এখানেই থামছেন না বঙ্কিম। বহুবিবাহ রোধ নিয়ে বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। বিদ্যাসাগর বহুবিবাহ সংক্রান্ত প্রথম বইয়ে যে যুক্তিজাল তৈরি করেছিলেন পণ্ডিতরা সেই যুক্তি খণ্ডন করার চেষ্টা করেছিলেন। সেকালের কুলীন ব্রাহ্মণ সন্তানেরা স্বাভাবিকভাবেই চাননি তর্কযুদ্ধে জিতুন বিদ্যাসাগর। তাহলে তো ব্রাহ্মণ সমাজের স্বার্থ ধাক্কা খাবে।  দ্বিতীয় বইয়ে তাঁদের প্রতিযুক্তিরও বিদ্যাসাগর কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। যাঁরা ভারতীয় দার্শনিক যুক্তি এবং তর্কের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা জানেন, এই ধরণের তর্কে ব্যঙ্গ ইত্যাদির অনুপ্রবেশ নিত্য নৈমিত্তিক। বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। অন্য পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগরের ব্যঙ্গাত্মক উক্তিকেও বাঙালি ভদ্রলোকের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে লাইসেন্স দেননি বঙ্কিম।

বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন আইন করে বহুবিবাহের মত কুপ্রথাকে বিলোপ করতে। শেষ পর্যন্ত সফল না হলেও তিনি সরকারি স্তরে বহু চিঠি-চাপাটি, দরবার পর্যন্ত করেছেন। তাঁর এই পদক্ষেপকেও সমর্থন করেননি সাহিত্যসম্রাট। তাঁর মতে এই প্রথা নাকি এমনি এমনিই বিলুপ্ত হবে।

এ প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষ তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ’ বইয়ে লিখছেন, ‘সেই প্রথার(বহুবিবাহ) আচরণের ফলে সমাজের যদি দ্রুত অবনতি হতে থাকে, তাহলে কেবল সাধারণের শুভবুদ্ধির ক্রমবিকাশের উপর নির্ভর করে কালক্ষেপ করা যায় না। সেক্ষেত্রে সেই প্রথার সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রীয় বিধানের সাহায্য নেবার প্রয়োজন হয়’। বিদ্যাসাগরও এমনটাই মনে করেছিলেন। কোনও কুপ্রথার অবসান ঘটাতে একদিকে যেমন তার নৈতিক শিরদাঁড়া (পড়ুন শাস্ত্রীয় নিয়মতন্ত্র) ভাঙা দরকার, সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন নতুন আইন প্রণয়ন।

কেবল বহুবিবাহরোধ আন্দোলনই নয় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধাচারণ তাঁর স্বভাবজাত হয়ে গিয়েছিল। গৌরহরি সেনের ‘সার গুরুদাসের জীবন্সমৃতি’-তে পাই বঙ্কিম বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে বলছেন, ‘তিনি খান কতক ছেলেদের বই লিখেছেন বই ত নয়’। ভাবুন সেই ছেলেমানুষদের বইয়ের একটি ‘বর্ণপরিচয়’, আজও আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে পড়াই মাতৃভাষা শিক্ষার প্রথম পাঠ হিসাবে। বিদ্যাসাগরের অমর সৃষ্টি সীতার বনবাসকে তিনি ‘কান্নার জোলাপ’ বলেছেন। আর বিপিনবিহারী গুপ্তর ‘পুরাতন প্রসঙ্গ’ বইয়ে পড়ি বাংলা গদ্যের রূপকার বলে খ্যাত বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে বঙ্কিম বলছেন, বিদ্যাসাগর বড় বড় সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ করে বাংলা ভাষার ধাতটা গোড়ায় খারাপ করে গেছেন।

আর বিদ্যাসাগর কী বলছেন বঙ্কিম প্রসঙ্গে? এক ভদ্রলোক বঙ্কিমের নিন্দা করছেন বিদ্যাসাগরের কাছে। তিনি বঙ্কিমের চরিত্র সম্পর্কে খারাপ কথা বলছেন। বলছেন কী কদর্যভাবে রাত কাটান বঙ্কিম। ইঙ্গিত খুব নোংরা। এসব শুনে বিদ্যাসাগর বললেন বলো কী? সারাদিন এত বড় সরকারি দায়িত্ব পালন করেও এভাবে রাত কাটায়, তাহলে লেখে কখন! আমার তো একটা সেলফ তাঁর বইয়ে ভরে গেল। যাই বল তোমার কথা শুনে বঙ্কিমচন্দ্রেরর প্রতি শ্রদ্ধা আমার বেড়ে গেল।

তবে সবসময় যে বিদ্যাসাগরের সমালোচনাই করেছেন বঙ্কিম এমন নয়। হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর বিদ্যাসারকে পড়তে গিয়ে মত পালটেছিলেন বঙ্কিম। নাহলে প্যারীচাঁদ মিত্রের গ্রন্থাবলীর ভূমিকায় কেনই বা লিখবেন, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর। তাঁহার পূর্ব্বে কেহই এরূপ সুমধুর বাঙ্গালা গদ্য লিখিতে পারে নাই, এবং তাঁহার পরেও কেহ পারে নাই’। আর চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিদ্যাসাগর’-এ পড়ি, খোদ বঙ্কিম বলছেন – ‘বিদ্যাসাগর মশায়ের রচিত ও গঠিত বাঙলা ভাষাই আমাদের মূলধন। তাঁরই উপার্জিত সম্পত্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি।’

বড়মানুষের খেয়াল, কখন যে কে মত পালটায় কে খবর রাখে তার!

Developed by DXDasia