
প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর নিজের "সবার প্রধানমন্ত্রী" মুখটাকে রক্ষা করতে চান, তাহলে সংঘের চাপ উপেক্ষা করেই তাঁকে এটা করতে হবে
সব রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতামত, যাবতীয় বুথফেরত সমীক্ষাকে নাকানি চোবানি খাইয়ে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোটের ফল প্রমাণ করল, গত তিন বছরে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তায় কোনও ক্ষয় ধরেনি। বা বলা যায়, যদি ক্ষয় ধরেও থাকে, তা মুছে দিয়েছে মহা বিতর্কিত বিমূদ্রায়ণ কর্মসূচি। অমর্ত্য সেনদের কথা নিচুতলার মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। নরেন্দ্র মোদির বক্তৃতায় মানুষ আস্থা জ্ঞাপন করেছে। খড় এবং কুটোর মতো ভেসে গেছে সপা, বসপা আর কংগ্রেসের ‘আলালের ঘরের দুলাল’। গণধোলাইয়ে পর্যুদস্ত তিন দলের নেতা নেত্রীদের মধ্যে অখিলেশ বুদ্ধিমান। হয়তো ভয় ছিলই। তাই তিনি ভোটেই দাঁড়াননি।
২০১২ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি এই রাজ্যে ভোট পেয়েছিল ১৫ শতাংশ। ২০১৪ তে তা মোদি সম্মোহনে বেড়ে হয় ৪৩ শতাংশ। এবার? প্রায় কাছাকাছি। ৪০ শতাংশ। সপা এবং বসপা, দুই দলই পেয়েছে ২২ শতাংশ করে ভোট। কংগ্রেস ৬ শতাংশ। সম্প্রতি মুম্বই-সহ বিভিন্ন রাজ্যের পুরসভা ভোটের ফল থেকে নরেন্দ্র মোদির পাঞ্চজন্যের আওয়াজ কানে আসছিল। উত্তর প্রদেশের ভোটের পর তার শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়।
উত্তর প্রদেশের এই ফল বলছে, আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রার্থী বাছাইয়ে বা সংসদে কোনও বিল পাশ করানো, মোদি এবং তাঁর দলের সামনে আর কোনও বাধা রইল না। এমনকী সংঘকেও সমঝে চলতে হবে নরেন্দ্র মোদিকে। অনেকে নরেন্দ্র মোদির এই জয়কে ১৯৭১ সালে ইন্দিরার জয়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। মিল অনেক আছে, সে কথা ঠিক। কিন্তু অমিলও কম নয়। ইন্দিরা ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, রাজন্যভাতা বিলোপের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্টকে অগ্রাহ্য করে, অধ্যাদেশ জারি করে। নরেন্দ্র মোদিকে এমন কোনও বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়নি। বিমূদ্রায়ণকে যদি বড় সিদ্ধান্ত বলাও হয়, তার সুফল চোখে দেখা যায়নি। বিশ্বাস করতে হয়েছে। এ হল অনেকটা, বিশ্বাসে মিলায় সুফল, তর্কে বহু দূর। আসলে তিনিই নেতা যিনি মানুষকে বিশ্বাস করাতে পারেন। যাঁর গণ-সম্মোহনের ক্ষমতা আছে। এবং মানতেই হবে, নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির সেই ক্ষমতা আছে।
ভোটের ফল বেরোনোর পর সাংবাদিকরা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহকে বার বার প্রশ্ন করছিলেন, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে পরিকল্পনা কী? অমিত প্রতিবারই এড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘আমাদের ম্যানিফেস্টো দেখে নিন’। এখনও সব তথ্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি। তবু বিজেপির সাফল্য দেখে এ কথা বলাই যায় যে, এই নির্বাচনে বিজেপি বিপুল ভাবে দলিত এবং নিম্ন বর্গের মানুষের ভোট পেয়েছে। এবং, শুধু তাই নয়, অনেক কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটও পেয়েছে। ভোটে এমন হয়। ১৯৮৪ সালে শিখ বিরোধী দাঙ্গা করেও পাঞ্জাবে যেমন ক্ষমতায় আসতে পারে কংগ্রেস (এবার তো বটেই, দশ বছর আগেও কংগ্রেস এই রাজ্য শাসন করেছে)। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, বিজেপি যে ভাবে ধর্ম এবং জাত-পাতের বেড়া ভেঙে ভোট পেয়েছে, তাতে এত দিন যেভাবে বিজেপির গায়ে মনুবাদী, হিন্দুত্ব বা সাম্প্রদায়িক তকমা এঁটে দেওয়া হত, যার পেছনে সঙ্গত কারণও রয়েছে, দেখার আছে, বিজেপি তার সেই জোব্বার গেরুয়া রং কিছুটা ফিকে করতে বাধ্য হয় কি না! নরেন্দ্র মোদি যদি তাঁর নিজের ‘সবার প্রধানমন্ত্রী’ মুখটাকে রক্ষা করতে চান, তাহলে সংঘের চাপ উপেক্ষা করেই তাঁকে এটা করতে হবে। আর তা যদি হয়, সেটা হবে ভারতের গণতন্ত্রের শক্তির জয়। নরেন্দ্র মোদির সামনে এই সকলের নেতা হয়ে ওঠাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। দেখার আছে তিনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন কি না!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির নাম না করে সব ক’টি বিজয়ী দলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, চাঁদ সওদাগর যেমন বাঁ হাতে ফুল দিয়েছিলেন মনসাকে। মানতেই হবে এটাও, যত হালকা ভাবেই হোক না কেন, গণতন্ত্রের প্রতিই আস্থা জ্ঞাপন। অটলবিহারী যেবার প্রধানমন্ত্রী হলেন, মহাকরণে সাংবাদিকরা জ্যোতি বসুকে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কি না? জ্যোতিবাবুর উত্তর ছিল, ‘জানাইনি, জানাবোও না’।
বিজেপির এই ফলে কি রাজ্যে কোনও প্রভাব পড়বে? বিজেপি রাজ্যের প্রায় সব জেলায় নিজেদের অফিস খুলতে চলেছে, এমন খবর ছিলই। গত ৫-৬ বছরে আরএসএসের শাখার সংখ্যা অনেক বেড়েছে এই রাজ্যে। কংগ্রেস এবং সিপিএম দুর্বল হয়ে পড়ায় যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, বিজেপির লক্ষ্য, তা পূরণ করা। তৃণমূলের নেতারা যে ভাবে ক্রমাগত কংগ্রেস এবং বামেদের ঘর ভাঙিয়েছেন, তাতেও ওই শূন্যস্থান প্রসারিত হয়েছে। সেখানেও অ্যাডভানটেজ বিজেপি। তবে তৃণমূলের সব থেকে বড় সুবিধে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারে এমন কোনও নেতা এই রাজ্যে বিজেপির একশো মাইলের মধ্যেও নেই।
