
একটি ভূখণ্ডের বহুভাষিক চরিত্র আঁকড়ে থাকার ইতিহাস বরাকের ভাষা আন্দোলন
প্রশ্ন হল একের কথা না অনেকের? একের দেশ নাকি অনেকের দেশ? একের ভাষা না অনেক ভাষা? হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের স্বপ্নে যারা বিভোর, অনেকের মুখে একের ভাষা, অনেকের মনে একের আশা জাগানোর এই আধিপত্য কি চুকে যাবে সামান্য ভোট-পরবে? এক জাতি, এক রাষ্ট্র, এক নেতার প্রচারে ভোটের ফল টক হলেও, একমুখি একান্ত ভাবনা কি শুকিয়ে যাবে এত তাড়াতাড়ি? এখন রাষ্ট্র ছাড়িয় বিশ্বায়নেরও একই ডাক। একমেবাদ্বিতীয়ম্ বিশ্ব।
এরকমই একের আধিপত্য বনাম অনেকের অধিকারের প্রশ্নে আসামে বরাক উপত্যকায় রক্তে লেখা হয়েছিল একটি ভূখণ্ডের বহুভাষিক চরিত্র আঁকড়ে থাকার ইতিহাস। ষাট সালে আসাম সরকার পাশ করে ‘সরকারি ভাষা আইন ১৯৬০’। বলা হয়, আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হবে অসমিয়া। অথচ সেই রাজ্যে বাঙালি, খাসি, জয়ন্তিয়া, বড়ো রাভা, ডিমাসা, মিকির, মিসিং, নাগা, মণিপুরি, সাঁওতাল প্রভৃতি ভাষা-পরিবারের বসবাস। তাদের কথা-বার্তা, গান-বাজনার বিচিত্র ধ্বনিতে ভরপুর আসামের শব্দ-বিশ্ব। তবু সরকারি আজ্ঞা হল বাড়ি-ঘর। খেত খামারে যা খুশি বলো, স্বীকৃত সরকারি ভাষা একটাই। অসমিয়া। ক্ষুব্ধ অন-অসমিয়া জনতা দাবি তুলল, ভাষা বিল বাতিল করো।
নওগাঁ জেলার হোজাইতে অনুষ্ঠিত হল নিখিল আসাম বঙ্গ ভাষাভাষী সম্মেলন, উত্তর কাছাড়ের হাফলং-এ পার্বত্য জেলার মানুষেরা জড়ো হল এক বিশাল জনসভায়। এদিকে-ওদিকে চলতে থাকল সভা-সমিতি, সম্মেলন। তবে আন্দোলন সবচেয়ে তীব্র হল বরাক উপত্যকায় (তৎকালীন কাছাড় জেলা)। মিছিল, ধর্না, সত্যাগ্রহ, হরতাল, সব মিলিয়ে জনজীবন উত্তাল। দাবী উঠল, শুধু অসমিয়া নয়, বাংলা ভাষাকেও মর্যাদা দিতে হবে। অন্য ভাষার প্রতিও চাই যথাযোগ্য সম্মান। বরাক উপত্যকার শতকরা আশি ভাগ মানুষ বাংলা ভাষায় ধারণ করে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব। এই উপত্যকা এক সময় বাংলারই ছিল, বলা হত সুরমা উপত্যকা।
কাছাড়ে ষোলো সতেরো শতক থেকেই ডিমাসা রাজসভায় দলিল, দানপত্র ইত্যাদি লেখা হচ্ছে বাংলায়। তাই, সেখানকার মানুষের পক্ষে এই ভাষিক আগ্রাসন অসহ হয়ে দাঁড়াল। মণিপুর ছাত্র সমাজ বলল, মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে তারাও শরিক। এগিয়ে এল ডিমাসা, খাসি, জয়ন্তিয়া সহ পাহাড় অঞ্চলের নানা ভাষাভাষী মানুষ।
অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ভাষা দাঙ্গায় শিকার হল নিরস্ত্র ভাষিক সংখ্যালঘুরা। ষাট পেরিয়ে একষট্টি রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ। আন্দোলন তখন দুর্বার। আঠারো যে মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ দিনে উপত্যকাময় মিছিল। উপত্যকার মূল দুটি শহর শিলচর ও করিমগঞ্জ। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর দখলে। গ্রেফতার শয়ে শয়ে। ১৯ মে সর্বাত্মক হরতাল। মানুষ আইন অমান্য করতে নেমে পড়ল পথে। শিলচর স্টেশনে লাইন অবরোধ করল সত্যাগ্রহীরা। হঠাৎ ঝাঁকে-ঝাঁকে গুলি নিরস্ত্র সংগ্রামীদের ওপর। শহিদ হলেন তমাল ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, হিতেশ বিশ্বাস, সুকোমল পুরকায়স্থ, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, বীরেন্দ্র সূত্রধর, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, সুনীল সরকার, কুমুদ দাস।
শ্যামাপদ ভট্টাচার্য গান লিখলেন, ‘শোন ডাকে ওই একাদশ শহীদের ভাই/ আর দেরি নয় দেরি নয়।
