জয়দেবের গীতগোবিন্দমের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়ছেন দুই বঙ্গললনা

বোলপুরে শুরু হচ্ছে গীতগোবিন্দম্‌ শেখানোর ব্যবস্থা

অজয়ের স্রোত এমন ধুঁকত না সেই সময়ে। অজয়ের পাড়ে বসেই নাকি জয়দেব গোস্বামী গাইতেন ‘গীতগোবিন্দম্‌’। শুধু গান না, তার পাশাপাশি চলত নৃত্যাভিনয়ও। কথিত, জয়দেবের স্ত্রী পদ্মাবতীও যোগ দিতেন সেই নৃত্যে। সংস্কৃত সাহিত্যের গৌরব তখন ক্ষীণতর হচ্ছে। কিন্তু গীতগোবিন্দমের মায়ায় প্লাবিত হতেন আপামর মানুষ। এই ভাষা তো দুরূহ সংস্কৃত নয়। আহা, কানে যেন মধু ঢেলে দিল কেউ। বাংলার সংস্কৃত না-পড়া মানুষরাও দিব্যি ভাসতে লাগলেন রাধার বিরহ যন্ত্রণায়, মাধবের সঙ্গে মিলনের ঘোরে। সেইসব দ্বাদশ শতাব্দীর কথা।

গীতগোবিন্দমের সূত্র ধরে রাধা-কৃষ্ণলীলা-বিষয়ক যে নাটগীতির ধারা জন্ম নিল বঙ্গভূমিতে, তা কীভাবে যেন হারিয়ে গেল। অথচ, এই বাংলাই বৈষ্ণব পদাবলী, রসকীর্তনের ভিত্তিভূমি। স্বয়ং চৈতন্যদেব বুঁদ হতেন যে পদের সুরে, তারই গুরুত্ব হারাতে লাগল বাংলায়। অথচ, প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশায় গীতগোবিন্দম্‌ নাটগীতি আজো জীবিত। বাংলা থেকেই তা পৌঁছেছিল ওড়িশায়। তারপর, রাজা প্রতাপ রুদ্রের আদেশে প্রতিদিন জগন্নাথ মন্দিরে গীতগোবিন্দম্ গাওয়া হতে লাগল। সেই থেকেই এর জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেল।

ধর্ম তো বাইরের পোশাক, গীতগোবিন্দমের নাটগীতি তো আমাদের ঐতিহ্য। এমন ‘মধুরকোমলকান্তপদাবলী’ পাঠ ও শ্রবণের ঘরানাটাই যদি না থাকে, তাহলে তো বাংলার ইতিহাসও মুছে যাবে অনেকটাই। আসলে মুছছে রোজ। এবং, এরই বিরুদ্ধে একটা জোর লড়াই দিতে চাইছেন দুই বঙ্গললনা। অহনা বিশ্বাস এবং পারমিতা ভট্টাচার্য। সঙ্গে অবশ্যই রয়েছেন দীপক সংরাগের মতো আরো অনেকেই। ‘গীতগোবিন্দম্‌’-এর গান শেখানোর ব্যবস্থা করছেন তাঁরা। চাইছেন একটা মৃতপ্রায় অথচ অসামান্য ইতিহাস যেন বেঁচে থাকে।

অহনা বিশ্বাস বাংলার অধ্যাপিকা। বোলপুরের বল্লভপুরডাঙায় তাঁরই উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একটি অসামান্য মাটির বাড়ি। তার নাম দেওয়া হয়েছে- ‘দেশের বাড়ি’। এখানেই স্থানীয় কয়েকজন বস্ত্রশিল্পীর সাহায্যে প্রাকৃতিক রঙে তৈরি থান-কাপড়, নানা পোশাক তৈরির কাজ চলে। আর চলে নানা অভিনব বিষয় নিয়ে আলোচনা, ওয়ার্কশপ, চর্চা। এই ‘দেশের বাড়ি’-তেই আগামী ১০ ও ১১ আগস্ট সারাদিন ধরে চলবে ‘গীতগোবিন্দম্‌’ শেখার পাঠশালা। শেখাবেন প্রসিদ্ধ গায়ক অনাথবন্ধু ঘোষ। এই উদ্যোগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছেন পারমিতা ভট্টাচার্যও। পেশায় সরকারি চাকুরে। কিন্তু চাকরিজীবনের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে অন্যভাবে বাঁচতে চাইছিলেন তিনি। সেই থেকেই এমন নানা উদ্যোগে জড়িয়ে পড়া।

গীতগোবিন্দম্‌ শেখার পাশাপাশি গীতগোবিন্দমের পদ নিজের কানে শোনাও যে কম সুখকর নয়, বলাই বাহুল্য। অন্যতম উদ্যোক্তা দীপক সংরাগ জানালেন, আপাতত কুড়িজন শিক্ষার্থী যোগ দিতে পারবেন এই বিশেষ ক্লাসে। সাধারণ শ্রোতাদেরও উপস্থিতি নিষিদ্ধ নয়, তবে রবিবার সন্ধে ৬ টা থেকে ৮ পর্যন্ত সময় বরাদ্দ তাঁদের জন্য। সাড়া মিললে, এই উদ্যোগকে বাঁচিয়ে রাখতেই চান উদ্যোক্তারা। চান বাংলার এই অসামান্য নাটোগীতির ঘরানাটি যেন বেঁচে থাকে। এ কিন্তু কম বড়ো চাওয়া নয়। 

Developed by DXDasia