
যখন কিচ্ছু ভালো লাগে না, মরে যেতে ইচ্ছে করে… তখনই তো দৌড়ে পালিয়ে আসি দিকশূন্যপুরে!
আমার এইবার খুব মেজাজ খারাপ| অনেকবার নীলুকে বলেছিলাম,
— সাত বছর পর কলকাতায় এলাম| চল না… ক'টা দিন ঘুরে আসি!
অমনি মিচকি হেসে বলল,
— আবার বন্দনাদি? খুব দেখতে ইচ্ছে করছে বুঝি? আমার কিন্তু ট্যাঁক গড়ের মাঠ! তোর ব্যাপারটা কী, বল তো! আমি তো এতদিন জানতাম মেয়েরা একে অন্যকে সহ্য করতে পারিস না… তা হঠাৎ তুই এত অন্যরকম হয়ে গেলি কেন?
আমি রেগেমেগে বললাম,
— নিয়ে যাবি কি যাবি না… ঝেড়ে কাশ! এত ভ্যানতাড়া পোষায় না! আর আমি আবার বন্দনাদিকে হিংসে করলাম কখন রে… হতচ্ছাড়া? আমি তো হিংসে শুধু একজনকেই করি… নীরাকে… আর দিকশূন্যপুর? আমার কাছে যে কোনো অচেনা, অজানা, অনামা জায়গা মানেই দিকশূন্যপুর| সেখানে যখন ইচ্ছে চলে যাওয়া যায়… মনে মনে… তোর হাত ধরে! দু:খ নেই, অভিমান নেই, অভাব-অভিযোগ- অনুযোগ কিচ্ছুই নেই… শুধু অপার মুক্তি আছে… চারিদিকেই শুধু খোলা আকাশ… শেষ দেখা যায় না স্থলভূমি, জলভূমি বা বনভূমির… সেটাই দিকশূন্যপুর! vastness কথাটা পড়েই এসেছি, শুনেই এসেছি… বুঝিনি কখনো… দিকশূন্যপুর! মনের দরজা জানালা হাট করে খুলে দিলে… দিকশূন্যপুর! মন খুব ভালো থাকলে দিকশূন্যপুর… মন খুব খুব খারাপ থাকলেও!
এখানে ট্রেন দাঁড়ায় বটে, কিন্তু স্টেশন নেই… সিগনালও নেই… টিমটিমে রাতবাতি জ্বলে… এখানে আসতে টিকিট লাগে না, টাকাপয়সা দরকার নেই, বাড়তি জামাকাপড় চাই না… শুধু খুব দু:খী নীলচে সবুজ মন চাই| এ হল মন ভালো করার হাসপাতাল| বন্দনাদি আছে… সব্বাইকে আগলে রাখার জন্য|
আরও পড়ুন
সুনীল মুহূর্তরা
আমি তো মাঝে মাঝেই ভাবি, চলে আসি| এখানে সবজেটে সাদা জলে শালুক ফুল, এখানে ফিঙে আর বুলবুলির মেলা, এখানে কাচপোকা টিপ, এখানে গাছের পাতার জাফরিকাটা জানালা দিয়ে রোদ্দুর আর ছায়ার খেলা| আকাশে গোলাপি মেঘ, হালকা রামধনু, বড় বড় ঝুপসি কৃষ্ণচূড়া, পলাশ… আর… ওই গাছের নিচে দাঁড়ালেই দমকা ধুলোর ঝড়… আর মাথা, মুখ, বুক… শরীর, মন… ভরে যায় ঝুরো ফুলে… এখানকার ঋতুতে বারোমাসই বসন্ত, এখানকার আকাশে বারোমাসই পুষ্পবৃষ্টি!
আমার যখন কিচ্ছু ভালো লাগে না, খালি খালি মরে যেতে ইচ্ছে করে… তখনই তো দৌড়ে পালিয়ে আসি দিকশূন্যপুরে! আমার মনে যে অস্থিরতার পাখিটা ঠোকরায়, ডানা ঝাপটানি দেয়.. তাকে দানাপানি দিয়ে শান্ত করতে দিকশূন্যপুর !
আমি ঠিক করেছি, আমি আর থাকব না… চেনা গণ্ডির বাইরে চলে যাব… আমার দমচাপা ঘরে আকাশ ধরা পড়ে না, আমার ভোরের আকাশ ভরা ম্লান ধূসর আলো, সকালগুলোতে দুঃখের রোদ্দুর, দুপুরভর বুকে পাথরচাপা নির্জনতা, বিকেলে মন কেমনের মেঘ, সন্ধেরা আসে হার্মাদের মতো… আমার বুকভরা ভয় আর ভয়… আর রাতের আকাশে এক বিন্দুও চাঁদের জল লেগে থাকে না। তাই… দিকশূন্যপুর, তাই… দিকশূন্যপুর!
— মরেছে, তোকে দেখছি কাব্যিরোগে ধরেছে। এত হিংসে তোর নীরাকে?
— বেশ, তাই যদি তো তাই… আমি হিংসুটি! আমার কেন অমন কেউ নেই? অমন ভালোবাসার জন? অমন প্রেমিক… যে আকুল হয়ে বলবে "ভ্রূপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে"…
— মরে যাই, মরে যাই, নিজের শ্রীমুখ আয়নায় দেখেছিস কখনো?
— আর তুই? তোরই বা কী আছে রে সাতরাজার ধন? ওই তো “বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট” আর “ফুসফুসভরা হাসি”-টুকুই সম্বল!
— আছে তো! হৃদয়ের অঢেল বিত্ত আছে… আমার জন্য “ভুবনডাঙার” মাঠের “আদিগন্ত মেঘলা আকাশ’ আছে, “দু:খবিহীন দু:খ” আছে… আর আছে “জানালার পাশে… বালিকার প্রতি বারবার ভুল"
–বালিকা? বলিসনি তো এতদিন! ডুবে ডুবে জল?
— তুই কি ঝগড়াই করবি? আমার আর সময় নেই… “আমি এখন পেরিয়ে মজা দিঘির কোণ, প্রণাম করে
অরণ্যের সিংহাসন,
দিগন্তের চেয়েও একটু দূরে যাবো…"
— তুই না এই কিছুদিন আগেই অসুখ থেকে উঠলি!
–"এখন অসুখ নেই, এখন অসুখ থেকে সেরে উঠে
পরবর্তী অসুখের জন্য বসে থাকা…"
— নীলু, তুই কি সত্যি বুঝিস না… আমি শুধু দিকশূন্যপুরে যাবার জন্যই বারে বারে প্রবাস থেকে কলকাতায় ছুটে আসি না… তোর জন্যেও মনটা…
— জানি তো!
“সকাল নয়, তবু আমার সকাল দেখার ছটফটানি
বিকেল নয়, তবু আমার
বিকেল দেখার ক্ষুৎপিপাসা
তুমি ছিলে না, তবুও যেন
তোমার কাছেই বেড়াতে আসা…"
আমার দু'চোখ ভরে ওঠে জলে| তর্জনী দিয়ে চোখের কোলের জলের রেখা আলতো করে মুছিয়ে দিয়ে নীলু ফিসফিস করে বলে,
–"নীরার চোখের জল, চোখের অনেক
নিচে
টলমল…"
— তোর জন্য কষ্টে থাকি নীলু… খুব কষ্টে থাকি। আমার ঠিক কঠিন অসুখ করবে… মরেই যাবো… তুই জানতেও পারবি না…
— পাগলি একটা! জানতে পারব না কী রে!
“নীরার অসুখ হলে কলকাতার সবাই বড় দুঃখে থাকে
আবার বকুলমালার তীব্র গন্ধ জানায় নীরা আজ খুশি
হঠাৎ উদাস হাওয়া এলোমেলো পাগলা ঘন্টি বাজায় আকাশ জুড়ে…
নীরা বেড়াতে গিয়েছে…"
–কিচ্ছু দাম নেই তোর কাছে… আমার চোখের জলের…
আমি পাগলের মতো দুমদাম এলোপাথাড়ি মারতে থাকি নীলুর শীর্ণ বুকে| নীলু ক্লিষ্ট হেসে বলে,
-''তোমার চোখের জলে ঝলসে ওঠে
শিল্পের কিরণ
যে শিল্প মধুর কিন্তু ব্যক্তিগত…''
নীলু আমার দু'টি হাত ধরে অবসন্ন গলায় বলে,
–"আমার দু'চোখে যদি
ধুলো পড়ে
আঁচলের ভাপ দিয়ে
মুছে দেবে?"
— নীলু, এই যে আমি তোকে দেখতে এভাবে যখন তখন… তোর আমাকে একটুও আদর করতে ইচ্ছে হয় না? আমি কি এতই ফ্যালনা? taken for granted? এত অবহেলা? এত তাচ্ছিল্য?
— ছিঃ, এভাবে বলিস না… আমি মনে মনে তোকে দেখলেই বলি…
“নীরা, তুমি কেমন করে করলে আমায় এমন লোভহীন
শুধু ও দুটি চোখ, শুধু ও দুটি চোখ দেখতে এতদূর
ছুটে এলাম?"
— তুই আগে আমাকে চিঠি দিতিস নীলু… আমাকে “নীরা” বলিসনি তো কখনো… কবিতা… আর কবিতা… ওই নামেই…
–“শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার
জন্য কিছু খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধেবেলা
ভুবন পেরিয়ে আসা…
…শুধু কবিতার জন্য, আরও দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়
মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা, শুধু কবিতার
জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।"
— নীলু, কী হয়েছে তোর? আমাকে বলবি না? কীসের জন্য তোর নিজেকে এত কষ্ট দেওয়া?
— তোর জেনে কী হবে? থাকবি তুই আমার কাছে? সারা জীবন? বললাম তো… তুই আমার যত যন্ত্রণার উৎস| কী করবি তুই? আসবি সব ছেড়েছুড়ে এই বাউণ্ডুলে নীলুচন্দরের কাছে? কোনো প্রতিকার আছে তোর হাতে, এই মনখারাপের রোগের? আমি যদি তোকে এখন বলি…
“অরুন্ধতি, জীবনসর্বস্ব, নাও চোখ নাও, বুক নাও,
ওষ্ঠ নাও, যা তোমার ইচ্ছে তুলে নাও
তুলে নাও, নষ্ট করো, ভাঙ বা ছড়াও, ফেলে দাও, অরুন্ধতি…”
পারবি তুই? আমি যা চাই… দিতে?
–একটিবার আমায় “যমুনা” বলে ডাকবি না… নীলু? বলবি না…
"যমুনা, আমার হাত ধরো! স্বর্গে যাব,
এস, মুখে রাখো মুখ, চোখে চোখ, শরীরে শরীর
নবীনা পাতার মতো শুদ্ধরূপ, এসো
স্বর্গ খুব দূরে নয়…"
নীলু চোখ বুজে আমার চিবুকে আঙুল ঠেকিয়ে উচ্চারণ করছিল,
–"দেখা হয়, কথা হয়, তবু বিচ্ছেদের কথা মনে পড়ে
খুঁড়ে তোলা মাটি থেকে জমে ওঠে নিকৃষ্ট পাহাড়
চোখের সম্মুখে তুমি দাঁড়ালেও স্বচ্ছ বাতাসের ব্যবধান
আমার এমনই রাগ, আমি সেই স্বচ্ছতাকে শত্রু বলে ভাবি!"
আমি আর পারছিলাম না… ভেসে যাচ্ছিলাম… দুকুলপ্লাবী আবেশে, আবেগে… নীলু আমার অস্তিত্বে মিশে গেছে… নীলুকে অস্বীকার করা মানে আমার অস্তিত্বকে অনস্তিত্বে বিসর্জন দেওয়া… চুলোয় যাক সব… আমি মনে মনে মন্ত্রোচ্চারণ করি…
–"আমরা সবাই রূপ চেয়েছি
ধর্ম অর্থ কাম চেয়েছি
তোমার হাতেই শুধু দু'মুঠো বালি…"
আমি নীলুর হাত দুটি তুলে নিই আমার ভিজে ভিজে ঠান্ডা হাতের মুঠিতে|
আজ থেকেই তবে… আমরা দুজনেই…
— "নশ্বরতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ি
তোমার বাদামী মুষ্টিতে গুঁজে দিই স্বর্গের পতাকা…"
আমার গ্রীবায় ঠোঁট ছুঁইয়ে এই প্রথম নীলু বলে ওঠে,
–''এ-রকম পূজা হয়, দেখো ত্রিশিরা ছায়ায় কাঁপে ইহকাল
এমন ছায়ার মধ্যে রূপ তুমি, রূপের কঠিন ঋণ বিশাল মেখলা
আমি ঋণী, আমি ক্রীতদাস নই, আরাধনা মন্ত্রে আমি
তোমাকে সম্পূর্ণ করে যাবো|”
