
তোমাকেই চাই আধুনিক বাংলাগানের অগনিত শ্রোতাদের স্বার্থে, নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে। ইতিহাস সৃষ্টি হল
সাল ১৯৮৯। প্যারিস থেকে ট্রেন এসে পৌছল জার্মানির কোলন শহরে। যে মানুষটার জন্য এখানে আসা, সমুন চট্টোপাধ্যায়, তখন জার্মান রেডিওর বাংলা বিভাগে চাকরিরত। কথামত স্টেশনে হাজির সুমনদা। তারপর ট্যাক্সি চড়ে তাঁর বাড়ি। নিজে ট্যাক্সি ডাইভারের পাশে বসলেন এবং আমার সাথে কথাবার্তার মধ্যে অবলীলাক্রমে মাতৃভাষার মত জার্মান ভাষায় ড্রাইভারের সাথে হাসিঠাট্টা। এরপর একসাথে কয়েকটা দিন সুমনদার সাথে সুমনদার বাড়িতে তুমুল আতিথেয়তার মধ্যে দিন কেটেছিল। মারিয়া তখন সুমনদার বান্ধবী এবং একসাথে থাকতেন। প্রতি সন্ধ্যাবেলা কাজ থেকে ফিরে বসতো আমাদের বাংলাগানের আড্ডা। ভারতবর্ষে ফেরার পরিকল্পনা চলছে কিন্তু একের পর এক যুগান্তকারী বাংলা গান সৃষ্টির প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছিলেন সুদূর জার্মানিতে বসে। ‘বিরোধীকে বলতে দাও’; ‘আগামী দিনগুলিকে সামনে রেখে সমঝে চল বন্ধুরা’; ‘জন্ম নিয়ন্ত্রনের বড়ি আছে’ ইত্যাদি আরও কতগান একেপর এক শুনিয়েছিলেন মনে আছে। তার ভিতর ‘তোমাকে চাই’ গানটি কতরকম ভাবে যে গেয়ে শুনিয়েছিলেন তার সবটা মনে না থাকলেও অবাক চোখে চেয়ে থাকতাম মানুষটার দিকে। সুদূর জার্মানিতে বসে বাংলা গান নিয়ে ভাবনা এবং রচনা করে যাওয়ার এই অদম্য ইচ্ছে নাড়া দিয়েছিল আমায়।
একটা বাংলাগানের দল তৈরি করেছিলাম ১৯৮৩ তে। নাম- নগর ফিলোমেল। মনে হয়েছিল বাংলাগানে বিশেষভাবে উপেক্ষিত শহর। সেই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছিল নগর ফিলোমেল এবং তার গান ‘শহর সংগীত।’ গানের বিষয় এবং প্রেক্ষাপট ছিল নাগরিক জীবনযাত্রা, নাগরিক মনের আশা- নিরাশা আর জয়-পরাজয়ের কথা। গানের তৈরি করতে বেছে নেওয়া হয়েছিল নাগরিক ভাষা এবং শব্দ সঞ্চালন পদ্ধতি। একসময় সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-র অন্তরঙ্গ সংগীতে পাওয়া গিয়েছিল গভীর আন্তপ্রত্যয়, সংবেদনশীলতা আর সদার্থক জীবনের প্রতিচিত্র। সেই উৎসারিত দৃশ্যমান সংগীত এর দিকেই নগর ফিলোমেল- এর নজর ছিল।
আমার বয়স তখন কুড়ির কোঠায়। গ্রহণ বর্জনের চৌকাঠে হোঁচট খাওয়া আমাদের প্রজন্মের তখন নিত্যনৈমেত্তিক ঘটনা। আর সেইখানেই এসে ধাক্কা মেরেছিলে সুমন চট্টোপাধ্যায়, উনি বিশ্বাস করতেন এবং আমাকে বলেছিলেন ‘Music is a Political act ‘। তাঁর কথাবার্তায়, গান রচনার শৈলীতে, পরিবেশনায় মনে হয়েছিল যে উনি এটা বিশ্বাস করেন। বাংলাগানে তখন একধরনের খরার পরিবেশ। মহীনোত্তর গানে সেরকমভাবে নাগরিক ছোঁয়া মিলছিল না। সেই রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ নজরুল সুধীরলাল, শচীনকর্তা ঘিরে ছিল বাংলা গানের উঠোন। আমরা যারা সামান্য গান বাজনা করতাম, আমাদের মধ্যে ইচ্ছে ছিল ষোলোআনা কিন্তু মন পড়ে থাকতো নেহাতই যান্ত্রিক পটুতায়।
‘তোমাকে চাই’ গানটা আমাকে তাড়িয়ে বেরাচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম। অ্যালবাম রিলিজের অনেক আগে থেকেই আমাদের বন্ধুদের নিবিড় আড্ডায় এই গানটা প্রায় জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়েছিল। দেশে ফেরার পর এই গানটা ১৯৯০ সালের নভেম্বরের কোনও এক সকালে বহরমপুরের রবীন্দ্রসদনে পরিবেশন করেছিল নগর ফিলোমেল। গানের ভাবনা কথা ও সুর সেদিন উপস্থিত শ্রোতাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল, স্টেজে দাঁড়িয়ে সেটা বুঝতে পেরেছিলাম।
১৯৮৯ সালে জার্মানির কোলনে সুমনদার কথায় গানে প্রত্যয় উপলদ্ধি করেছিলাম। অস্ফুটেই সুমনদার দিকে তাকিয়ে বলে ফেলেছিলাম ‘তোমাকে চাই’।
সুমনদা, তোমাকেই চাই আধুনিক বাংলাগানের অগনিত শ্রোতাদের স্বার্থে, নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে। ইতিহাস সৃষ্টি হল। আজও হয়ে চলেছে। সুরের এ পথের কোনও শেষ নেই।
