পড়ুয়ার অভাবে ধুঁকছে বাপ্পি লাহিড়ী’র স্মৃতি বিজড়িত টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাইস্কুল

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩৫

৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা অনুমোদন পাওয়া স্কুল হচ্ছে টালিগঞ্জ এইচ ই স্কুল। ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫১-তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের সিদ্ধান্তে এই স্কুলের নাম বদল হয়ে হয় টালিগঞ্জ বাঙ্গুর এইচ ই স্কুল। কেননা তখন বাঙ্গুর সংস্থা এই স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, স্কুলের জন্য জমি দিয়েছে। ১৯৩৩ সালে, শুরুর সময় এই স্কুলটি ছিল আনোয়ার শাহ রোডের কোনও এক জায়গায়। পশ্চিমবঙ্গ স্কুল বোর্ডের অধীনে স্কুলটি আসে ১৯৬০-’৬১ সালে। তখন এই স্কুলটির আবার নাম বদলে হয় টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাইস্কুল। পুরোনো নিয়মে ৯ থেকে ১১ ক্লাস পর্যন্ত হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। স্কুলটি মাধ্যমিক স্কুলের মর্যাদা পায় ১৯৭৭–’৭৮ সালে। ২০০০ সালে স্কুলটি একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাঠক্রম অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিক স্কুল হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের অনুমোদন পায়। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ভালো-খারাপ মিলিয়ে চলছে টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাইস্কুল।

সেই অর্থে এখন স্কুলের খারাপ সময় চলছে। একটা নদী যেমন তীরবর্তী জায়গা-জমিকে গ্রাস করে নেয়, নদীর তীরবর্তী মানুষেরা তখন যেমন সেই জায়গা-জমিকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাইস্কুল-এর অবস্থা এখন অনেকটা তেমন। এখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকারা এখন আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন স্কুলটাকে বাঁচিয়ে রাখার। কথা হচ্ছিল স্কুলের শিক্ষক নিশিকান্ত বিশ্বাসের সঙ্গে। ১৯৯৯ সালে তিনি এই স্কুলে চাকরি নিয়ে আসেন। তিনিই স্কুলের ইতিহাস জানালেন। জানালেন স্কুলের দীর্ঘ সময়ে জুড়ে ভালো-খারাপের এই সকরুণ কাহিনি। 

এই স্কুলের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল খুব ভালোই হয়েছে এক সময়। ১৯৯৫-’৯৬ সালে মনোরঞ্জন রায় স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে আসেন। তিনি যখন স্কুলের দায়িত্ব নিয়ে আসেন তখন সাকুল্যে স্কুলের ছাত্র সংঘ ১০০ জনের মতো হবে, সেই সময় স্কুলের অবস্থা ভালো ছিল না। তার পর প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্কুলের ছাত্র সংখ্যা ২৫০-তে পৌঁছয়, সঙ্গে অবশ্যই অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহযোগিতা ছিল। মনে হতে পারে একটা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ২৫০ জন ছাত্র সংখ্যা হলে সেই স্কুলটি ভালো স্কুলের তকমা পায় কী ভাবে? স্কুলে ছাত্র সংখ্যা কম থাকার কারণ প্রথম থেকেই স্কুলের ক্লাসরুম কম, স্কুল ভবনটি সেই অর্থে বড়ো নয়। তাই শুরু থেকেই এই স্কুলের ছাত্র সংখ্যা কম। মনোরঞ্জন রায়ের উদ্যোগেই স্কুলটি ২০০০ সালে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের অনুমোদন পায়। তারপর ধীরে ধীরে স্কুলের উন্নতি হতে শুরু করে। মনোরঞ্জন রায় যখন ২০১৪ সালে অবসর নিলেন, তখন স্কুলের ছাত্র সংখ্যা ৩৫০-এর বেশি। তার পর স্কুলের টিচার-ইন-চার্জ হয়ে এলেন সত্যসুন্দর রানা। তিনি এখনও একই পদে আছেন। সত্যসুন্দর রানা ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত স্কুল চালাতে চালাতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে স্কুল নতুন প্রধান শিক্ষক পেল, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে আসলেন স্বদেশ সামন্ত। মনোরঞ্জন রায় প্রশাসনিক দিক থেকে স্কুলটিকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন স্বদেশ সামন্তর আমলে স্কুল সেই প্রশাসন পায়নি। ফলে স্কুলের অবনমন শুরু হয় স্বদেশ সামন্তর আমল থেকেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলের এক কৃতী প্রাক্তন ছাত্র এই কথা জানালেন। তিনি বলছিলেন, “চোখের সামনে দেখলাম আমাদের স্কুলটা ক্ষয় হতে শুরু করল। তাও এখন যাঁরা শিক্ষক হিসেবে স্কুলে কাজ করছেন তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন যাতে স্কুলটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। তবে জানি না এই লড়াইয়ে বর্তমান শিক্ষকরা জয়ী হবেন কিনা!”

নিশিকান্ত বিশ্বাস জানালেন, “আমাদের স্কুলটা ভালোই ছিল। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিকে ফল খুব ভালোই হচ্ছিল। ২০১৭ সালে সৌপ্তিক সিংহরায় ১৭তম  স্থান পায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়। ২০১৮ সালে এই স্কুল থেকে রওশন রহমান উচ্চমাধ্যমিকে ১৩তম স্থান পায়। ওই বছরই সৌরজ্যোতি মাইতি ১৪তম স্থান পায় উচ্চমাধ্যমিকে। এই ছাত্ররা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। কেউ চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। এটা স্কুলের গৌরবের কাহিনি। অথচ একদা গৌরবোজ্জ্বল সেই স্কুলের ছাত্রসংখ্যা আজ তলানিতে থেকেছে। এই স্কুলে পড়তেন অলোকেশ লাহিড়ী, যিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় সংগীত জগতে বাপ্পি লাহিড়ী নাম খ্যাতি লাভ করেছিলেন।”

স্কুলের তিনতলা ভবন জুড়ে রয়েছে ১৪-১৫টি ক্লাসরুম। ১৯৯৯-তে ২৪ থেকে ২৫ জন শিক্ষক ছিলেন। এখন ৪ জন শিক্ষিকা ও ১২ জন শিক্ষক আছেন স্কুলে। ছাত্র সংখ্যা ১২০ জন, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। পঞ্চম শ্রেণি এখন প্রাথমিক শিক্ষার তালিকায় থাকায় পঞ্চম শ্রেণি নেই, এই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। স্কুলের কোনও মাঠ নেই। ল্যাবরেটরি আছে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, কম্পিউটার বিভাগের জন্য। ল্যাবরেটরি যথেষ্ট উন্নতমানের, তবে ছাত্র সংখ্যার ঘাটতিতে সবই এখন থমকে রয়েছে, সেই অর্থে স্কুলটি চলার মতো সরকারি রসদ পেলেও উৎসাহ পাচ্ছে না শিক্ষক ও ছাত্ররা। ক্লাসরুমে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না ছাত্রসংখ্যা কম হওয়ার জন্য। যে ক্লাসরুমে কম করে ৩০ জন ছাত্র থাকার কথা, সেখানে মেরেকেটে ১০/১২ জন ছাত্র আছে ক্লাস পিছু।

স্কুলের ছাত্র কমে যাওয়ার মূল কারণ—ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি ও তার পাশাপাশি বাংলা মাধ্যমে পড়ার প্রবণতা হ্রাস। দ্বিতীয়ত টালিগঞ্জ এলাকা, টালিগঞ্জ সংলগ্ন নেতাজি নগর খালের ওপারের নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের এই স্কুলে পড়তে আসা, তৃতীয়ত লকডাউনের প্রকোপ ইত্যাদির সম্মিলিত কারণে ছাত্র সংখ্যা ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। করোনার পরবর্তীতে মানুষের, বিশেষ করে যাঁরা দিন আনেন দিন খান, তাঁরা এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। এর ফলে এই স্কুলের বহু ছাত্র লেখাপড়া ছেড়ে কাজে যোগ দিয়েছে। “এদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলেও আমরা কিছু করতে পারিনি”, বলছিলেন নিশিকান্ত বিশ্বাস। প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়ার সংখ্যা এই স্কুলে অনেক বেশি। তার মধ্যে ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু ছাত্র। 

নিশিকান্তবাবুর কথায়, “এদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে উঠলেই বাড়ির অভিভাবকরা এদের কাজে পাঠিয়ে দিচ্ছে জীবনজীবিকার জন্য। ফলে স্কুল ছেড়ে বাচ্চারা অর্থ উপার্জনের দিকে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাসপাতালের নতুন ভবনের পিছনে এই স্কুলটি অবস্থিত। সেই অর্থে এটি সম্ভ্রান্তদের বসবাসের এলাকা। এই এলাকা থেকে ছাত্ররা টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাইস্কুল-এ পড়তে আসে না। ফলে যারা এখন এই স্কুলে পড়তে আসছে তাদের বেশির ভাগটাই বস্তি এলাকার প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর। এরাই পড়াশোনা ছেড়ে কেউ টলিগঞ্জ এলাকার সম্ভ্রান্তদের বাড়ির কুকুর দেখাশোনা করছে, কেউ গাড়ি ধুয়ে দিচ্ছে, কেউ গল্ফের মাঠে বল কুড়িয়ে উপার্জন করছে। কঠিন জীবনের লড়াইয়ের মুখে পড়ে পড়াশোনাটা এদের কাছে এখন বিলাসিতা।”

তবে স্কুল থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা স্থানীয় এলাকায় গিয়ে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার কাজ করছেন, যাতে পরিবারের অভিভাবকরা বাচ্চাদের এখনই কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠান। স্কুলে ভর্তির টাকা মকুব করে দিয়ে ছাত্র ভর্তি করতেও প্রস্তুত এই স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে সেটা হয়ে উঠছে না। তাই টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাইস্কুলের খুবই খারাপ অবস্থা। এখন স্কুলের শিক্ষকদের চিন্তা একটাই, ১৯৩৩ সালে যে স্কুলের যাত্রা শুরু, ২০২৩ সালে স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের সময় পৌঁছে কি সেই স্কুল থমকে যাবে?    

তথ্য সূত্র : নিশিকান্ত বিশ্বাস, শিক্ষক, টালিগঞ্জ বাঙ্গুর হাইস্কুল এবং কিছু প্রাক্তন ছাত্র
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia