গঙ্গার ওপারে টুকলি প্রবণতা একটু বেশি

এরা কেউ অপরাধী নয়। শুধু একটা মাধ্যমিক পাস সার্টিফিকেট চায়

প্রতি বছরের মতো এবারও মাধ্যমিক শুরু হয়েছে। এটা হল বাংলার পলাশ আর টোকাটুকির মরসুম। এমন নয় যে টোকাটুকিতে আমরা খুব এগিয়ে আছি। ১৯৯১ সালে উত্তরপ্রদেশে আইন চালু হয়েছিল টুকতে গিয়ে ধরা পড়লে জেল হবে। তখন উত্তরপ্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন রাজনাথ সিং। পরের নির্বাচনে মুলায়মের প্রধান স্লোগান ছিল, ‘সপাকে ভোট দাও, আমরা ওই আইন বাতিল করে দেব’। এবং, মুলায়ম জিতলেন। বাতিল হল টোকা বিরোধী আইন। সিপিএমের এক বিধায়ক টুকতে গিয়ে ধরা পড়েছেন বলে কাগজে খবর বেরয় বছর ২০-২২ আগে। তবে তাঁর কাছে যে কাগজ পাওয়া গিয়েছিল, তা যে তাঁর কাছেই পাওয়া গিয়েছে, তার প্রমাণ কী? এই প্রশ্ন তুলে দলের পছন্দের উপাচার্য সেই সময় তাঁকে ছাড় দেন। তখনই নিয়ম চালু হয় কাগজ পাওয়া গেলে সেই কাগজে পরীক্ষার্থীকে দিয়ে সই করিয়ে নিতে হবে। সিদ্ধার্থ রায় জমানায় বাংলায় টোকাটুকির স্বর্ণযুগ ছিল। পরে বামফ্রন্ট এসে তা ৭০-৮০ শতাংশ কমাতে সফল হয়। ২০ শতাংশ থেকেই যায়। এখনও তা আছে। আর বরাবরই গঙ্গার ওপারে টুকলি প্রবণতা একটু বেশি। মালদা, মুর্শিদাবাদ তার মধ্যে আবার চ্যাম্পিয়ন। এবারে খবরের কাগজে দেখলাম এক টুকলি সাপ্লায়ার সাংবাদিকদের বলছেন, ভাই পরীক্ষা দিচ্ছে, ওকে আমি না দেখলে কে দেখবে! মোটামুটি ভাবে এটা বলা যায়, উত্তর২৪ পরগনা বাদে রাজ্যের সীমান্তবর্তী বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় টোকাটুকি বেশি। কেন? এটা খুবই লজ্জার যে ৩৪ বছরের বাম শাসনেও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা গুলি, শিক্ষার হারে, উন্নয়নে তুলনায় বেশি পিছিয়ে। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর লেখা বই ‘ফিরে দেখা’য়, বুদ্ধবাবু বলেছেন, যারা বলেন সাচার কমিটির রিপোর্ট তাঁদের চোখ খুলে দিয়েছে, তারা ভুল বলে। চোখ নাকি ওঁদের খোলাই ছিল। কিন্তু সংখ্যালঘু জেলার এই পিছিয়ে থাকা, কখনই চোখ খোলা থাকার পরিণাম নয়।

দু’ধরনের টোকাটুকি হয়। প্রথমটা নম্বর বাড়ানোর জন্য। এটা অল্প বিস্তর অনেক জায়গায় সুযোগ থাকলে ঘটে থাকে। দ্বিতীয় হল কোনও মতে পাস করার জন্য। যে গণটোকাটুকির ছবি আমরা দেখি, এ হচ্ছে কোনও মতে পাস করার জন্য। বহু বছর ধরে এ জিনিস চলছে। এই গণ টোকাটুকি যারা করে তাদের মধ্যে পাসের হারও খুবই কম। কেন এই টোকাটুকির প্রবণতা? তার উত্তর মিলবে এই ছাত্ররা যে সব স্কুলে পড়ে সেই সব স্কুলে খোঁজ নিলে। এই ধরনের বেশির ভাগ স্কুলের লেখা পড়ার মান যদি যথাযথ করা যায়, এই টোকাটুকি কমতে বাধ্য। শুধু ১৫-১৬ বছরের এই বালকদের দিকে আঙুল তুলে কোনও লাভ নেই। এরা কেউ অপরাধী নয়। শুধু একটা মাধ্যমিক পাস সার্টিফিকেট চায়। তার জন্য টানা সাড়ে দশ বছর ধরে তারা স্কুলে গিয়েছে। তার পরেও কেন তারা পাস করার উপযুক্ত হচ্ছে না? এর উত্তর কে দেবে?

Developed by DXDasia