
সাল ১৭৩০। রাজার সঙ্গে ঐতিহাসিক বিরোধ গ্রামবাসীদের
সময়ের খোঁজহীন সংলাপে রাজপুতনার কল্পকথা পার করে – সতী পদ্মাবতী সিনেমা হলে, ফেসবুকে, লোকাল ট্রেনে উপস্থিত। আরোপিত ধর্মরীতিতে নারী আগুনে পুড়বেন, সতী হবেন, আবার পূজিতাও হবেন। সীতার বয়ানে মিথ্যার মাপজোক মেপে দেবে রাম-আদেশের আগুন। ‘ধন্য মহাকাব্য’ একদিন জন্মভূমি নির্মাণ করে মন্দির সাজাবে বলে সময়ের গায়ে ছুঁড়ে দেবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সেই অগ্নিশলাকা। সময় জ্বলতে থাকবে। জ্বলে পুড়ে খাক হবে ভিন্নমত, বিধর্মী বা ভিনধর্মী। প্রযোজক সামাজিক ও রাজনৈতিক সময় মাপবেন, পরিচালক খুঁজে নেবেন বাজার সফল ছবির ফর্মুলা। রাজস্থান ছাড়িয়ে মহারাষ্ট্র থেকে মেঘালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে নতুন সতী-আইকন। রামায়ণের দেশে নতুন করে প্রয়োজন হবে রামমোহনের।
পুরুষ নির্মিত নারী আইকন পদ্মাবতীর ঊষর দেশের অমৃতা দেবী ছিলেন বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ। সময়টা ১৭৩০। মোগল শাসন পার করে ক্রমেই ব্রিটিশের সাম্রাজ্য বিস্তার হচ্ছে। মাড়োয়ার যোধপুরের সিংহাসনে সদ্য রাজা হয়ে এলেন রাজপুত অভয় সিং। প্রাসাদ আর ইমারতের রাজপুতনায় নতুন কেল্লা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। প্রয়োজন হল প্রচুর কাঠের। সেবার ভাদ্রে রাজাজ্ঞা মাথায় নিয়ে সেনা চলল যোধপুর থেকে ২৬ কিমি দূরে বিষ্ণোই’এর খেজার্লি গ্রামে। এখানকার শক্তপোক্ত খেজরি গাছ এনে বানানো হবে কেল্লা। নামমাত্র জলে জন্মানো খেজরি গাছ মরুদেশে ছায়ার সঙ্গে জুটিয়ে দেয় বিন জাতীয় ফল। যা স্হানীয় মানুষ ও পশুর আহার।
দখল, খতম ও রক্তপাতের দুনিয়ায় বিষ্ণোই সম্প্রদায় আজও প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে বাঁচায় বিশ্বাসী। গাছপালা ও জীবজগৎ বাঁচিয়ে বেঁচে থাকার এই জীবনদর্শনও শিখিয়েছে জলহীন রাজপুতনা। লুন্ঠন, কেড়ে খাওয়া বা ফসলের জন্য রাজ্যবিস্তারের পরম্পরার উল্টোপথে হেঁটে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে বাঁচার দর্শনে গাছ কাটার পথে রুখে দাঁড়ায় খেজার্লি গ্রাম। টানা ১০ দিন রাজপুত সেনার সামনে অস্ত্রহীন প্রতিরোধে সামিল হয় ৮৩টি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের গ্রাম। নতুন কেল্লা বানানোর জন্য কাঠ আনতে গিয়ে রাজসেনার চেষ্টা বিফলে যাওয়ায় অজয় সিংয়ের রাজপুত-ক্রোধ বাড়ে। যে কোনো মূল্যে গাছ কেটে আনার নির্দেশ দেন তিনি। শেষে ১০ দিনের প্রতিরোধের পর একদিন সকালে রাজপুত সেনা আসতে দেখে গাছ জড়িয়ে ধরলেন মধ্যবয়সী অমৃতাদেবী। সঙ্গে তাঁর তিন মেয়ে আসু, রত্নি ও ভাগু। সরাসরি সেনার উদ্দেশ্যে বললেন, – গাছ কাটতে হলে তাঁদেরও কেটে ফেলতে হবে। বচসা বাড়ে। নাছোর মা ও মেয়েদের মতই ধীরে ধীরে গাছ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষজন। এরপর ইতিহাস টুকে রাখে এক অচেনা গল্প। রাজক্রোধে সেনা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামনে গাছ আগলে ছিলেন মা অমৃতা ও তারপর মেয়েরা। মানুষ কুপিয়ে একে একে কাটা হয় খেজরি গাছ। সেদিন মাড়োয়ার রাজ্যের রাজপুত ক্রোধের বলি হয় ৩৬৩ জন প্রকৃতিপ্রেমী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ।
কী সেই জীবনবোধ! জীবন তুচ্ছ করে গাছ আগলে অমৃতা দেবী বলেছিলেন -"সর সান্তে রুখ রহে তো ভি সস্তা জান।" মানে, -মানুষের মাথার চেয়ে ঢের মূল্যবান একটি গাছ। অমৃতা দেবীর নেতৃত্বে শহিদ হওয়া বিষ্ণোইদের স্মৃতিতে পরবর্তীকালে খেজার্লিতে স্মৃতিসৌধ গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরে রাজস্হান ও মধ্যপ্রদেশের বন-দফতর অমৃতা দেবীর নামে 'অমৃতা দেবী বিষ্ণোই স্মৃতি পুরস্কার' চালু করে। মানপত্রের সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হয় ২৫ হাজার টাকা। এসব স্বত্বেও কল্পকথার পদ্মাবতীকে সামনে এনে রাজপুত, থুড়ি হিন্দু-স্বাভিমানের প্রচার ও প্রসার বাড়ে রাজস্হানের বাইরে। আর অমৃতা দেবী সহ বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ৩৬৩ জন শহিদের গল্প আগ্রাসনের ভিড়ে হারিয়ে যায়।
শিয়রে দ্রুত ঘনাবে ভোট। পদ্মাবতী হয়ে ধর্ম-জাতপাতের হিসাব থমকাবে অযোধ্যায়। 'অ-যুধ্' অর্থাৎ – যেখানে যুদ্ধ মানা। সেই অযোধ্যা কেন্দ্র করে বিদ্বেষের মন্ত্রে ঘৃণা বাড়বে। সতী পোড়ানোর স্মৃতি বাড়িয়ে পদ্মাবতী, থুড়ি পদ্মাবতের সফল রথ বলে দেবে – একটু দূরেই 'রামের অযোধ্যা'। আর ততই রাম নয়, প্রয়োজন হবে রামমোহনের (রায়)। জহরের নামে জ্বলতে থাকা পদ্মাবতীর মিথের ওপর দাঁড়িয়ে জঙ্গলে-নগরে নির্যাতিতা হবেন অমৃতা দেবীরা। রাস্তা আর যানের তোড়ে রোজ কাটা পড়বে অজস্র গাছ। ফুটপাত দখল নেবে হরেক দেবতা। বিষ্ণোইরা আজও জানেন – মানুষের মাথার চেয়ে গাছের মূল্য বেশি। তাদের যাপনে ও বিশ্বাসে জগতে সব জীবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এই গল্প নতুন করে লেখার সময় হয়তো কাটা পড়ল আরেকটা গাছ। হয়তো সেখানে ধর্মস্হান হবে। হয়তো সেখানে পুজো পাবেন পদ্মাবতী বা সে রকমই কেউ। কল্পকথা ইতিহাসে বদলে ফেললে, বাস্তবিক ইতিহাসকে বানিয়ে দেওয়া হবে রটনা। যেমনটা হয়ে এসছে অতীতব্যাপী! এতশত আরোপিত অদলবদলের সময় গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে জ্বলজ্বল করে – 'হিন্দু' রাজা অভয় সিং আর 'বিষ্ণোই' অমৃতা দেবীর নাম। ১৭৩০-এর বৈষ্ণোইদের এই আন্দোলন আধুনিক ইতিহাসের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন বলে ধরা হয়।
