
আজ থেকে ১৪০ বছর আগে মোট দুইবার তিব্বত অভিযান করেছিলেন এই বাঙালি
দার্জিলিং থেকে পেমিয়াংচি, তারপর কাঞ্চনজঙ্ঘা ধরে জোংরি। সেখান থেকে চাংথাং গিরিপথ। বরফে পা ডুবে যাচ্ছে, এক এক জায়গায় উগ্যেন কোমরের কুকরি দিয়ে বরফ কেটে তৈরি করছেন পায়ে চলার ধাপ। গাছের শাখাপ্রশাখা কেটে তৈরি করছেন রাস্তা। পাহাড়ের পাথর নেমে আসছে। ১৯০০০ ফুট উচ্চতায় দুজনেরই নিশ্বাস পড়ছে ঘন ঘন। রাতে থাকার জায়গা বলতে পাহাড়িগুহা। চাং থাং পেরিয়ে তাঁর প্রবেশ করলেন তিব্বতি সীমানায়। শরৎ ছ’মাস থাকলেন পাঞ্চেন লামার তাশি লুনপো মঠে। তিব্বতি ভাষায় সুদক্ষ শরৎ পাঞ্চেন লামার মঠে খুঁজে পেলেন তিব্বতি হরফে দণ্ডীর কাব্যাদর্শ, কাশ্মীরি কবি ক্ষেমেন্দ্রের ‘অবদানকল্পলতা’ ও চান্দ্র ব্যাকরণের প্রাচীন পুঁথি। সেগুলি নকল করে দেশে ফিরলেন তিনি।
এর ঠিক দু’বছর পর শুক্লপক্ষের একরাতে ফের দার্জিলিং থেকে রওনা দিলেন শরৎচন্দ্র ও উগ্যেন। দ্বিতীয় যাত্রায় তিনি খোদ রাজধানী লাসায় পৌঁছে প্রধান লামার আতিথ্য গ্রহণ করেন। তাশি লুনপোয় ফের পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হল তাঁদের। পাঞ্চেন লামার দরবারে এক মন্ত্রীর স্ত্রী সিকিমের রাজকন্যা। মেয়েরা নাচগানে অভ্যর্থনা জানাল অতিথিদের। তাশি লুনপোয় পাঁচ মাস থেকে শরৎচন্দ্র গেলেন লাসা শহরে। শরৎ দেখলেন ‘রাগ্যিবা’দের। ‘রাগ্যিবা’রা মূলত ভিক্ষা করে খায়। লাসার সমাধিস্থলে মৃতদেহগুলি টুকরো টুকরো করে কুকুর, শকুনদের খাওয়ানো হয় তা দেখে অবাক হলেন। বহুবিবাহ দেখে প্রশ্ন করলে স্থানীয় এক তিব্বতি মেয়ে শরৎকে জানাল, “নেপাল বা চিন থেকে যাঁরা তিব্বতে ব্যবসা করতে আসেন, তাঁদের অনেকেরই দেশে একটি স্ত্রী থাকে আর তিব্বতে আর একটি স্ত্রী থাকে।” দু’মাস লাসায় থাকতে থাকতে একদিন সকালে পরিচিত এক তিব্বতি লামা শরৎকে নিয়ে গেলেন তিব্বতের বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদের অভ্যন্তরে। দলাই লামাকে দর্শন করলেন শরৎ। বিশাল হলঘরের প্রতিটি আসবাবে সোনার আবরণ। ছয় ফুট লম্বা, চার ফুট উঁচু সিংহাসনে বাবু হয়ে, করজোড়ে বসে তখনকার আট বছর বয়সী শিশু ত্রয়োদশ দলাই লামা। মাথায় হলুদ চাদর। সোনার বাটিতে জাফরান মেশানো হলুদরঙা জল নিয়ে একজন এগিয়ে গেল সেই শিশুর কাছে। তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘ওম মণিপদ্মে হুম।’ তারপর লামার সোনার কাপে মাখন চা ঢেলে দিলেন একজন, শরৎচন্দ্র প্রণামী হিসেবে শিশুর কোলে রেখে দিলেন একতোলা সোনা। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় শরৎচন্দ্রকে এক লামা পরিয়ে দিলেন লাল রঙের ‘খাদা’ বা চাদর।

দুর্গম এই সফর শরৎকে কখনও ক্লান্ত করেছে, কখনও বা হতবাক। তিনি একদিন দেখলেন নীল পোশাকে, ঘোড়ায় চড়া ‘তেসি’-দের। ‘তেসি’-রা আমাদের এখানকার ক্যুরিয়ারবাহক বা পোস্টম্যানের মতো। হলুদ ব্যাগে চিঠিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ নিয়ে লাসা থেকে পিকিং যাতায়াত করেন। এই ঘোড়সওয়ার, ডাকহরকরাদের অন্য খাতির রয়েছে তিব্বতে। একটি সরাইখানায় পৌঁছেই বন্দুক উঁচিয়ে আকাশে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করেন তিনি, যাতে পরবর্তী সরাইখানা তাঁর জন্য ঘোড়াদের সাজিয়ে রাখতে পারে। প্রতি সরাইখানায় ‘তেসি’-দের জন্য পাঁচটি করে ঘোড়া মজুত থাকে, মধ্যরাতে তেসি বসে তিন ঘণ্টা ঝিমিয়ে নেন, তারপরই সরাইওয়ালা তাঁকে ডেকে দেয়। তেসি-র চাকরিতে শুয়ে ঘুমোনো বারণ। পেঁয়াজ, রসুন, শুকনো লঙ্কা ও দুধ খাওয়াও একেবারে নিষিদ্ধ।
(চলবে…)
তথ্য ঋণঃ
Three Years in Tibet- Ekai Kawaguchi
The Indian Spy Who Fell for Tibet. New York Times 20 March 2016
Autobigraphy Incident of my early life- Sarat Chandra Das
Journey to Lhasa and Central Tibet- Sarat Chandra Das
Bengali Pundits in Himalaya- Sarat Chandra Das
Journal of Asiatic Society
