স্কুল পালানো দুই শিশু, সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা

কেন শিশুদের ছবি, নাম ছাপা হল?

দিন দু’য়েক আগে খবরের কাগজে পড়ি খবরটা। হাওড়ার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দুই খুদে পড়ুয়া স্কুল বাস থেকে নেমে স্কুলে না ঢুকে হাত ধরাধরি করে হাঁটা দিয়েছিল জিটি রোডের দিকে। বেশ কয়েক ঘণ্টা নিখোঁজ থাকে আট আর দশ বছরের এই দুই শিশু। বাড়ি স্কুল ও পুলিশের তৎপরতায় অবশেষে তারা বাড়ি ফেরে। খুব আনন্দ হল শিশু দুটি তাদের বাড়িতে ফিরে এসেছে জেনে। কিন্তু রিপোর্টটি পড়ে এবং রিপোর্টের সঙ্গে ওই দুই শিশুর একাধিক ছবি দেখে মনে কিছু প্রশ্ন জাগল।

সংবাদ মাধ্যম কেন তাদের ছবি প্রকাশ করল? তাদের তো খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। ওই ছবি প্রকাশের জন্য শিশু দুটিকে পাড়ায়, রাস্তা ঘাটে, বাসে ট্রামে নানা অসুবিধের মুখে পড়তে হতে পারে। আঙুল তুলে কেউ তাদের দেখিয়ে বলতে পারে, ওই যে ওই দুই স্কুল পালানো ছেলে! কেনই বা তাদের আসল নাম ছাপা হল।  শিশুদের প্রতি এই অবমাননার প্রয়োজন ছিল কী? জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টে কিন্তু বলা আছে এই ধরণের ঘটনায় শিশুর ছবি ছাপা যাবে না। নামও প্রকাশ করা যাবে না।

অন্তত একটি সংবাদপত্রে নাম দিয়ে লেখা হয়েছে ওদের মধ্যে এক জন দত্তক নেওয়া সন্তান। দত্তক সন্তানের কিছু বাড়তি সমস্যা থাকতেই পারে। সে যে দত্তক পুত্র, এটা যদি শিশুটির বাবা মা এখনও না বলে থাকেন, সে ক্ষেত্রে এই তথ্যটি তার উপর প্রবল মানসিক চাপ ফেলতে পারে। ক্ষতি হতে পারে শিশুটির মনের।

রিপোর্ট পড়ে জানলাম, ওই দু’জনের মধ্যে যে একটু বয়সে বড়ো সে আগেও একবার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বাবা মা বসে না থেকে মনোচিকিৎসকের সাহায্য নিয়েছেন।বাবা মাকে শুভেচ্ছা জানাই। তবু মন খারাপ হয়, বিষন্ন লাগে। একজন শিক্ষক হিসাবে আমার বারবার মনে হচ্ছে আমাদের শিক্ষণ প্রণালিতে কী ওর মন সায় দিচ্ছে না? নাকি নতুন ক্লাসের দিদিমণি/ মাষ্টার মশাইকে সে বন্ধু মনে করতে পারছে না। শিক্ষকদের উপর এত চাপ থাকে যে আলাদা করে প্রতিটি শিশুমনকে বোঝার সময় থাকে না। এই সরকারের সিলেবাস কমেটিতে আলোচনায় শোনা গিয়েছিল প্রত্যেক শ্রেণি কক্ষে পাঠ্য বই ছাড়া নানা গল্পের বই থাকবে।বই নাড়াচাড়া করবে শিশুরা ।যার মন যেদিকে যেতে চায় সেদিকে তার মনকে নিয়ে যেতে হবে গল্পের মাধ্যমে, খেলার মাধ্যমে পড়ার মাধ্যমে। অনেক স্কুলে এই পরিকাঠামো নেই, যেখানে আছে, সেখানে যে মানের বই রাখা আছে দেখেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার ছবি, কাহিনি শিশুমনকে আকৃষ্ট করে না।ফলে শিশু মন তার খাবার পায় না।তখনই হয়তো কারও মন চলে যেতে চায় অন্য কোনও খানে।

বাংলা শিশু সাহিত্যেও এমন কিছু চরিত্র কিন্ত খুঁজে পাই। ‘অতিথি’ গল্পের তারাপদ বারবার চলেছে নিরুদ্দেশের টানে। বাড়ির  স্নেহ ভালোবাসাও তুচ্ছ করে। তাই মনে হয় মনোচিকিৎসক বন্ধুরা যদি বাবা মাকে আরও আরও সচেতন করে তোলেন ভালই হয়। এর খুব প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, আমাদের শিক্ষকদেরও অভিভাবকের সঙ্গে এক হয়ে বিষয়টি নিয়ে আরও ভাবলে ভালো হবে। খগেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘ভোম্বোল সর্দার’কে মনে আছে? বাড়ি থেকে পালিয়ে পালিয়ে ভোম্বোল যখন আবার তার বাড়ি ফিরে এল, তার বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলেন কী করবেন? প্রধান শিক্ষক বলেছিলেন, বাঁধন আলগা করতে।

Developed by DXDasia