ধ্রুপদে সুরের সাজে উত্তরের চা-বাগান

মাদল, ধামসার সঙ্গে মিশছে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত

অবাক হওয়ার মতো ঘটনা হলেও এটাই সত্যি যে উত্তরবঙ্গের চা বাগানের মেয়েরা এখন মাদল, ধামসার ঐতিহ্য বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে ভারতনাট্যম ও কত্থক শিখছে। তার সঙ্গে শিখছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত । একদিকে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে, তার সঙ্গে সংস্কৃতি অন্য মাত্রা পাচ্ছে। আর সেই সংস্কৃতিতে পালের হাওয়া নিয়ে এসেছেন আদিবাসী ঘরেরই শিল্পী কল্যাণ কিশোর তিরকি।

ঝাড়খণ্ডের রাঁচি অঞ্চলের গুমলা গ্রামের বাসিন্দা কল্যাণ কিশোরের বাবা মা কৃষিকাজ করেন। গ্রাম ছেড়ে তিনি উত্তরবঙ্গে চলে আসেন ১৯৮৬ সালে। স্কুলের পড়াশুনা দার্জিলিং-এ। কিন্তু তার ছোট থেকেই মাদল, ধামসার সঙ্গে টান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আর শাস্ত্রীয় নৃত্য যেমন ভারতনাট্যম, কত্থকের প্রতি তাঁর ভালবাসা অনেক দিনের। তার সঙ্গে বাঁশি, কি বোর্ড, ধামসা সবই বাজাতে পারেন। বাঁশিতে যে কত সুর তুলতে পারেন তা তাঁর নিজেরও অজানা। বেনারস থেকে ১৯৯৭ সালে মিউজিকে তিনি এম এ পাশ করেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের তালিম নিতে গিয়ে তিনি বেনারসেই ভারত বিখ্যাত দেবানন্দ পাঠক, অধ্যাপক ঋত্বিক সান্যাল, পদ্ম বিভূষণ পণ্ডিত ছুন্নুলাল মিশ্রের সংস্পর্শে আসেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের দেশের অন্যতম সেরাদের সংস্পর্শে এসে তিনি নিজেকে আরও উন্নত করে তোলেন। আর সেই বিদ্যা রপ্ত করেই তিনি শপথ নিয়ে নেন, উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া চা বাগানের আদিবাসী ছাড়াও অন্যদের মধ্যে খুব করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্য ছড়িয়ে দেবেন। 

সেই অনুযায়ী ২০০৪ সালে উত্তরবঙ্গে ফিরে এসে ডুয়ার্সের বানারহাটের কলাবাড়ি চা বাগানে ছোট স্কুল খুলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখানো শুরু করেন। আদিবাসীদের মধ্যে হইচই শুরু হয়। তারপর সেখান থেকে ২০১০ সালে শিলিগুড়ি মাটিগাড়ার যীশু আশ্রমের পাশে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখানোর স্কুল খুলে বসেন। এর মধ্যে অনেক আগেই অবশ্য তিনি সেখানকার যীশু সমাজের ফাদার হয়েছেন। পদ্ম ভূষণ ছুন্নুলাল মিশ্র মাটি গাড়া এসে তাদের সেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখানোর স্কুল উদ্বোধন করেন। সেই স্কুল দশজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে শুরু হলেও আজ তার ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। ফাদার কল্যাণ জানান, তাঁদের মাটিগাড়া যীশু আশ্রম লাগোয়া কেন্দ্র ছাড়াও নকশালবাড়ির কাছে হাতিঘিসায় তাঁরা এখন সপ্তাহে দুই দিন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছেন। সেই প্রশিক্ষণ শিবিরে কিরণচন্দ্র চা বাগান, গুমগুমা চা বাগান, জাবরা, হাতিঘিসা চা বাগান থেকে ছেলেমেয়েরা এসে সঙ্গীত শিখছেন। বেশির ভাগই আদিবাসী মেয়ে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ছাড়া তারা লোক গানও শিখছে। বেশি প্রাধান্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে। অনেকে ভারতনাট্যম এবং কত্থক শিখছে। যারা শিখছে তাদের মধ্যে স্নেহলতা খালকো, সিমরন চিকবরাইক, কৃতিকা টপ্পোর নাম উল্লেখ করার মতো।

চা বাগানে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। যুগ যুগ ধরে আদিবাসীরা মাদল, ধামসা, ঢোলক নিয়ে তাদের সংস্কৃতির করম, সরহুল, সাইলো প্রভৃতি করে আসছে। এই সংস্কৃতি তাদের মধ্যে ছিলই। কিন্তু ইদানিং ডিজে বা পশ্চিমি সংস্কৃতি তাদের ঐতিহ্যের সংস্কৃতিকে ধাক্কা দেওয়া শুরু করেছে। অনেক আদিবাসী যুবক পশ্চিমের গান বাজনা শিখতে চাইছে। সেই ধাক্কা সামলাতে তাদের দাওয়াই এখন ভারতনাট্যম, কত্থক। তার সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। ফাদার এডওয়ার্ড রাজ তাঁদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। শিল্পী কল্যাণ বলেন, চা বাগানের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মেয়েরা তাদের কেন্দ্রে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতে আসছে। আর এটা শেখার ফলে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা তাদের মাদল, ধামসার সুরে নতুন সুর আনছে। যেমন তাদের তাল আর মাত্রাজ্ঞান হচ্ছে, তেমনই ক্ল্যাসিক্যাল শিখে তাদের মাদল আর ধামসায় নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। বাঁশির নানারকম সুরের সঙ্গে শিল্পী কল্যাণ একটি ব্যান্ডও তৈরি করে ফেলেছেন। তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রয়াস’। সেই প্রয়াসে মাদল, ধামসা, ঢোলকের মতো পুরানো বাদ্য যন্ত্রের সঙ্গে ড্রাম সেট, কি বোর্ড, ইলেকট্রনিক গিটার সহ আধুনিক আরও বাদ্য যন্ত্র মিশে নতুন সুর, নতুন পরিবেশ তাঁরা তৈরি করছেন উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলোতে।

Developed by DXDasia