ক্লাসরুমে মুক্তপৃথিবী গড়েছিলেন যে অধ্যাপক

ছাত্রছাত্রীদের কাছে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন প্রবাদপ্রতিম। আজ শিক্ষকদিবসে তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য

বাংলা সাহিত্যের স্পেশাল ক্লাস নিচ্ছেন আপাদমস্তক এক সৌম্যকান্তি অধ্যাপক। পরণে ধোপদুরস্ত ধুতি পাঞ্জাবি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসঘরে প্রায় তিনশোজন উৎসাহী ছাত্রছাত্রী। অনেকেই বসার জায়গা পায়নি। কেউ দেওয়ালে নোটখাতা রেখে, কেউ আবার বন্ধুর পিঠে খাতা রেখে মন দিয়ে ক্লাসের পড়া লিখে নিচ্ছে। অধ্যাপক ভদ্রলোক এই দৃশ্যে স্বাভাবিক কারণেই অভিভূত। পরিহাসের ছলে ক্লাসের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, ‘আগে জানলে তো রিপোর্টারদের একটা খবর দিতাম, ছবি নিয়ে যেত’।

অধ্যাপকের নাম নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি বাংলার শিক্ষাজগতে এক উজ্জ্বল সাক্ষর রেখে গেছেন তাঁর বাগ্মিতা আর পাণ্ডিত্যের জন্যে। ক্লাসরুমে তাঁর উপস্থিতি ছিল দেবদূত-সদৃশ। নিজের কর্মজীবনে শিক্ষক কম, ছাত্রছাত্রীদের বন্ধু বেশি ছিলেন। পড়াতেন গল্প বলার মতো। অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারাও ওঁর ক্লাস করার জন্যে ভিড় জমাত।

কলকাতা সেই সময়ে রাজনৈতিক কারণে উত্তাল। চরম বিশৃঙ্খলা, যুব-অসন্তোষ, অশান্তি। চারিদিকে অনেক অপ্রিয় ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও নারায়ণবাবুর মনে তিক্ততা ছিল না, ছিল গঠনমূলক সমালোচনা। দেশের ছাত্রশক্তি, যুবশক্তির ওপর ওঁর অগাধ বিশ্বাস এক দিনের জন্যেও খর্ব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে ঢোকার সময়ে দেখলেন বাইরে পুলিশ ব্যারিকেড বানাচ্ছে। ক্লাসে ঢুকেই ছাত্রছাত্রীদের বললেন রাস্তাঘাটে গোলমাল হতে পারে, তাঁরা যেন বাড়ি চলে যায়। আশ্চর্যের ব্যাপার, একজন ছাত্র বা ছাত্রীও ক্লাস ছেড়ে বেরোল না। প্রিয় স্যারের ক্লাস করার জন্যে প্রত্যেকেই এতটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের ব্যাপারে একটি মজার ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এক দিন মোটরগাড়িতে ওঁরা কোথাও যাচ্ছিলেন। সামনের সিটে চালকের পাশে সুনীলবাবু বসেছেন, পেছনের সিটে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীলবাবু সিগারেট খাওয়ার জন্যে অনেকক্ষণ উসখুস করে শেষমেশ থাকতে না পেরে নিজের স্যারের কাছে সরাসরি অনুমতি চাইলেন। সদাহাস্য নারায়ণবাবু ছাত্রকে বললেন ‘নিশ্চয়ই! তোমার ষোল বছর বয়স হয়ে গেছে অনেকদিন! এখন আর ওসব কী!’

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিশক্তি ছিল অবিশ্বাস্য। শুধুমাত্র বইয়ের রেফারেন্স বা কোনও গল্প-কবিতার লাইন নয়, বহু বছর আগেকার ছাত্রছাত্রীর মুখ ও নামও অনায়াসে মনে রাখতে পারতেন। এই প্রেক্ষিতে একটা ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ক্লাসে উনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প 'অগ্রদানী' নিয়ে আলোচনা করছেন। সেদিন প্রায় দেড়শো ছেলেমেয়ের কারোর কাছেই বই ছিল না। তখন নারায়ণবাবু খানিকক্ষণ মাথা চুলকে ক্লাসের উদ্দেশ্যে বললেন 'দেখি, মনে করতে পারি কিনা'। এর পরে সকলকে স্তম্ভিত করে, তিনি গোটা গল্পটাকেই, প্রত্যেকটা যতিচিহ্নসহ হুবহু স্মৃতি থেকে উচ্চারণ করেছিলেন।

মধ্য চল্লিশের দশক থেকেই সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় দ্রুত শিক্ষামহলে প্রবাদপ্রতিম হয়ে যান। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা কোনখানে পৌঁছেছিল, তা বর্তমান সময়ে অনুমান করা কঠিন। শুধু দর্শন, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতির ছাত্রছাত্রীরা নয়, বিজ্ঞান শাখার ছেলেমেয়েরাও তাঁর ক্লাস করার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিত।

কীভাবে একজন শিক্ষক প্রকৃত অর্থে অভিভাবক হয়ে যান ছাত্রছাত্রীদের কাছে? ভাগ করে নেন সুখ, দুঃখ, প্রথাগত শিক্ষার বাইরের যাপনগুলো? ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের সাথে মুক্ত ভাবনাচিন্তা আদানপ্রদানের একটা আন্তরিক আবহাওয়া এসব অনেকটাই সম্ভব করে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় জানতেন কীভাবে পাঠ্যপুস্তক থেকে জীবনবোধ হৃদয়ঙ্গম করাতে হয়। তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি ছিল অমায়িক এবং স্বতন্ত্র। প্রচলিত ধারণার বাইরে বক্তব্য রাখার অবকাশ থাকত ছাত্রছাত্রীদের। তাঁর সিগনেচার পড়ানোর রীতিতে এনেছিলেন সিদ্ধান্ত-বিরোধিতা, এক অর্থে open-ended বিচারধারা।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃতি ছাত্রদের সংখ্যা কম নয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। তাঁদের অনেকের মনেই নারায়ণবাবুর ‘স্পেশাল টিউটোরিয়াল ক্লাস’ গভীর ছাপ ফেলেছে। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময়ে অত রেফারেন্স বই বা সাহায্যপুস্তিকা ছিল না। উনি যত্ন সহকারে সব পড়াই প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দিতেন। সাধারণত যে-বিষয় তিনি নিজে ক্লাসে পড়াতেন সে-বিষয় ছাত্রছাত্রীদের লিখতে দিতেন না। পরীক্ষা নেওয়া নয়, পড়ানোর আনন্দই ছিল ওঁর শিক্ষকতার মূল মন্ত্র।

শেষ জীবনে ওঁর নতুন ভাষা শেখার আগ্রহ হয়েছিল। ফরাসি ভাষা ভালোই জানতেন। তবে নতুন শিক্ষালাভের ইচ্ছে ওঁর শিক্ষকতায় কখনোই কোনও প্রভাব ফেলেনি। নিজের উজ্জ্বল দীপ্তি আর প্রাজ্ঞতা সম্বল করে তিনি অসীম গুরুত্ব নিয়ে নিরলস উৎসাহে পড়িয়ে গেছেন। অবশেষে একটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। একবার নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাটেন্ডেন্স নিচ্ছেন। একজন ছাত্রী অনুপস্থিত। ভুলবশত একাধিক ছাত্রী সেই ছাত্রীটির প্রক্সি দিয়ে ফেলে। তখন নারায়ণবাবু নিজের স্বভাবোচিত কৌতুকে বলে উঠলেন – ' আমি এই ছাত্রীটির বন্ধুভাগ্যকে ঈর্ষা করি'।

প্রায় অর্ধদশক হল নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই। আমরা ঈর্ষা করি তাঁর সেই সময়ের ছাত্রছাত্রীদের যারা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন, যারা তাঁর চৌম্বকীয় ক্লাসে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও অর্জন করেছে প্রভূত মূল্যবোধ। আজ শিক্ষক দিবসে কমবয়সী একটি সরল কলেজছাত্রের মতনই অনেকের মনে হয় নারায়ণবাবু যদি তাদেরও মাস্টারমশাই হতেন।

আজও তর্ক ওঠে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব কোনখানে? পণ্ডিত গবেষক হিসেবে, সাহিত্যিক হিসেবে নাকি শিক্ষক হিসেবে? নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর সাহিত্যে বুঁদ হয়েও পক্ষ নেন শিক্ষক নিরায়ণের দিকেই। মনে পড়ে, 'ভাঙা চশমা' গল্পের সেই পাগল হয়ে যাওয়া স্কুল মাস্টারের কথা? ছাত্র নেই, স্কুল ভেঙে গেছে। তবুও, দম-আটকনো রাতে সেই পৃথিবীতেই আটকে থাকা মানুষটা পড়িয়েই যাচ্ছেন ইংরেজি গ্রামার। একজন শিক্ষক লিখছেন আরেকজন স্বপ্নভঙ্গ শিক্ষকের গল্প। হয়তো এত ভালো করে শিক্ষকতার স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস আর বুনতেই পারতেন না অন্যকেউ।

তথ্য ঋণ – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় মাস্টারমশাই (গ্রন্থ)

Developed by DXDasia