
৩০ বছর ধরে একটি ফটোগ্রাফি বিষয়ক পত্রিকা রয়েছে এই দলের
পরের দিনই ছিল দোল। নন্দন চত্বরে তাই সেদিন রঙের ছড়াছড়ি। হলুদ শাড়ি, পাঞ্জাবি, মাথায় ফুলের সাজ, আট থেকে আশি সব বয়সের ভিড়ে সেদিন পা ফেলা দায়। তার সঙ্গে রয়েছে ‘সেলফি’ কিংবা ‘ডিপি’ তোলার হিড়িক। সে এক বিষম অবস্থা।
আজ থেকে ৩০ বছর আগে যখন কলকাতা শহরে ফটোগ্রাফি বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি, তখন থেকে যাত্রা শুরু করে ‘ফটোগ্রাফি চর্চা’ পত্রিকাটি।
আগে ‘বসন্ত’ মানে ছিল কেবল রং মেখে ভূত সাজা কিংবা আলেকালে শান্তিনিকেতন ভ্রমণ। এখন অবশ্য বসন্ত উৎসব ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায়। নন্দন চত্বর হল কলকাতার প্রাণভোমরা। যেকোনো উৎসব মানেই সেখানে জমজমাট আসর। শুধু নন্দন নয় কলকাতা শহরের দিকে দিকে চলছে বসন্তের আয়োজন।

ফটো ফেস্টিভ্যাল
নন্দন থেকে বেরিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তেই রয়েছে মোহরকুঞ্জ। তারই গেটের ওপর বড়ো বড়ো করে লেখা ‘ফটো ফেস্টিভ্যাল’। যদিও মেলা ছবির হলেও শব্দ বলছে অন্য কথা। ভিতরে তখন “নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগলো” গানের সঙ্গে মঞ্চে চলছে অনুষ্ঠান। বাহারি সাজ, বাতাসে আবিরের গন্ধ সব মিলিয়ে যেন অন্যরকম আমেজ তৈরি হয়েছে সেখানে। মঞ্চ থেকে চোখ খানিক বামদিকে সরাতেই পরপর সার দিয়ে রয়েছে অনুষ্ঠানের আসল রসদ।

মোহরকুঞ্জ প্রাঙ্গণ
পাখির ছবি দিয়ে শুরু, বিমূর্ত ছবি দিয়ে শেষ। গ্যালারি ভর্তি অসংখ্য অসাধারণ নিদর্শন। আর এই সব কর্মকাণ্ডের অন্তরালে রয়েছেন যে মানুষটি, তিনি হলেন শিল্পী অরূপ সাধু। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত এই মানুষটির সঙ্গে আলাপ জমে উঠতেই জানলাম এই উৎসবের নানা কাহিনি। অরূপ বাবু বললেন, “এটাই প্রথম বছর নয়, এই নিয়ে পাঁচ বছর ধরে আমরা এই উৎসব করছি। এবছর যেহেতু বইমেলা দেরিতে হল তাই আমাদেরও ফটোগ্রাফির উৎসবের দিন পিছিয়ে দিতে হল। ভাবলাম যদি বসন্ত উৎসব আর ছবি মেলা একসঙ্গে করা যায়, তাহলে বোধ হয় মন্দ হয় না।”

বসন্তের আবাহন
বসন্তের নামেই আসে নানান ফুল, নানান পাখি, নানান দৃশ্যকল্প। বসন্ত আর ফটোগ্রাফির মধ্যে আসল সাদৃশ্য হল ওই রঙেই। একদিকে বসন্তের আবিরের রঙ, অন্যদিকে ছবির দুনিয়ার লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙ, দুইয়ে মিলেমিশে মোহরকুঞ্জ প্রাঙ্গণে যেন রঙিন মহল তৈরি করেছিল।
পাখির ছবির গ্যালারিতে বসন্তবৌরি, নীলকণ্ঠ, কাঠ শালিখ, কাঠঠোকরা, মাছরাঙা, বি-ইটার ইত্যাদি রং-বেরঙের সব পাখিরা। পাশের গ্যালারিটা বন্যপ্রাণীদের। চিতা, সিংহ, বাঘ, হাতি থেকে শুরু করে বনবিড়াল সবই রয়েছে সেখানে। এছাড়াও রয়েছে দেশ বিদেশের নানা প্রাকৃতিক নিদর্শন।

১

২

৩
অরুপ সাধু একা নন, তাঁর সঙ্গে রয়েছে আস্ত একটা দল। দলের নাম ‘ফটোগ্রাফি চর্চা’। সারাবছরই চলে তাঁদের ছবির জার্নি। “আমরা শুধুই যে ছবি তুলে বেড়াই তা নয়, আমাদের ফটোগ্রাফি বিষয়ক একটি পত্রিকা আছে।” আজ থেকে ৩০ বছর আগে যখন কলকাতা শহরে ফটোগ্রাফি বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি, তখন থেকে যাত্রা শুরু করে ‘ফটোগ্রাফি চর্চা’ পত্রিকাটি।
বসন্তের আবাহনে ছবির দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে তিলোত্তমার বুকে ৩ দিনের সফর করেছিল দল ‘ফটোগ্রাফি চর্চা’। উৎসব, শিল্প, আবেগ এসবের পাশাপাশি ছিল খাবারের স্টল। ফুচকা, চাট, চা ছাড়াও সেই স্টলে ছিল ভরপেট খাবারের ব্যবস্থাও। দলের এক সদস্যা তনিমার কথায়, “আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি আমাদের এই বার্ষিক মিলন উৎসবের জন্য। প্রতিবছর এই অনুষ্ঠানে আলাপ হয় অনেক মানুষের সঙ্গে। তাঁদের অনেকেই আবার নিজেদের ফটোগ্রাফি নিয়েও এগিয়ে আসেন আমাদের এই দলে।”

৪

৫

৬
আজকের জেনারেশনের গলায় নানান নতুন মডেলের ক্যামেরা, আর তার মধ্যে রয়েছে নতুন নতুন নানান ফিল্টার। ঘরে ঘরে এখন ‘ডি.এস.এল.আর’ কেনার চল। কিন্তু আজ থেকে ৩০ বছর আগে বাংলার মানুষের কাছে ফটোগ্রাফি নিয়ে চর্চা করা মানে ছিল বিলাসিতা। আর সেই বিলাসিতা নিয়েই সেদিন কাজ শুরু করেছিলেন আলোকচিত্রী অরূপ সাধু। আজ অবশ্য তাঁর পায়ের তলার মাটি অনেক শক্ত। আজ তিনি কলকাতার ছবির মহলে পরিচিত মুখ। কিন্তু সেদিনের সেই ছক ভাঙার জেদ আজও একই রকম রয়েছে তাঁর। রয়েছে ফটোগ্রাফি নিয়ে বিস্তর স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দিয়েই তাঁর ছবি মেলা একদিন পৌঁছে যেতে পারবে আরও নতুন কোনোও আলোর দিগন্তে, এমনটা আশা করাই যায়।
ছবি – প্রতিবেদক
